গান যখন সরকারবিরোধী অস্ত্র

টেডি আফ্রো ইথিওপিয়ার সরকারগুলোর জন্য সবসময়ই ঝামেলার কারণ ছিলেন।
যে দেশে সরকারের বিরুদ্ধে কথা বললেই ভয় থাকে জেল-জুলুমের, সেখানে এক গায়ক সরাসরি সরকারের সমালোচনা করে গান লিখে করেছেন তোলপাড়। ইথিওপিয়ার সবথেকে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী টেডি আফ্রো তার নতুন গানে সরকারের কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন, যা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে চলছে আলোচনা।
গত বৃহস্পতিবার টেডি আফ্রো মুক্তি দিয়েছেন তার নতুন গান ‘দাস তাল’ যার আক্ষরিক অর্থ তাঁবু খাটাও। গানটি মুক্তি পাওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ইউটিউবে ৭০ লাখের বেশি মানুষ দেখে ফেলেছেন। ইথিওপিয়ার মতো দেশে কোনো গান নিয়ে এমন মাতামাতি আগে দেখা যায়নি কখনো।
গানের নাম ‘দাস তাল’ বা ‘তাঁবু খাটাও’ রাখা হয়েছে একটি বিশেষ কারণে। ইথিওপিয়ার ঐতিহ্য অনুযায়ী তাঁবু খাটানো হয় কারও মৃত্যু হলে শোক পালনের জন্য। গায়ক তার গানে বুঝিয়েছেন, তিনি শোক পালন করছেন তার হারানো দেশের জন্য। শিল্পী তেওড্রোস কাসাহুন (টেডি আফ্রো) গেয়েছেন যে, তিনি যে দেশে বড় হয়েছেন, আজ সেখানেই নিজেকে তার মনে হচ্ছে বিদেশি।
গানটি মুক্তির আগে রাজধানী আদ্দিস আবাবায় সাংবাদিকদের নিয়ে একটি অনুষ্ঠান করার কথা ছিল। কিন্তু অস্পষ্ট কোনো এক কারণে কর্তৃপক্ষ হতে দেয়নি সেই অনুষ্ঠানটি। তাতেও লাভ হয়নি, বরং ইন্টারনেটে গানটি ছড়িয়ে পড়ার পর তা হয়ে উঠেছে আরও বেশি জনপ্রিয়।
টেডি আফ্রো সবসময়ই সরকারের জন্য এক আতঙ্কের নাম। প্রায় ২০ বছর আগে একটি সড়ক দুর্ঘটনার মামলায় তাকে জেলে থাকতে হয়েছিল ১৬ মাস। শিল্পী তখন দাবি করেছিলেন যে, সরকারের সমালোচনা করার কারণেই তাকে ফাঁসানো হয়েছিল রাজনৈতিকভাবে। ২০১৭ সালেও তার একটি অ্যালবাম সরকার আটকে দিয়েছিল, যদিও সেটি ছিল বিশ্বখ্যাত বিলবোর্ড চার্টের শীর্ষে।
গায়ক টেডি আফ্রো সবসময় ভালোবাসার পক্ষে। তিনি বিখ্যাত মার্টিন লুথার কিং এর কথা মনে করিয়ে দিয়ে জানান, ঘৃণা দিয়ে ঘৃণা মেটানো যায় না, ভালোবাসা দিয়েই সব জয় করতে হয়। কিন্তু বর্তমানে দেশের পরিস্থিতি তাকে বাধ্য করেছে গান গেয়ে প্রতিবাদ করতে।
ইথিওপিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ ক্ষমতায় আসার সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন দেশে ঐক্যের জোয়ার আনার। টেডি আফ্রো নিজেও শুরুতে তাকে সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু গত কয়েক বছরের গৃহযুদ্ধ আর লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু দারুণভাবে ব্যথিত করেছে শিল্পীকে। সরকারের ওপর থেকে তিনি হারিয়ে ফেলেছেন বিশ্বাস।
তিনি মনে করছেন, ইথিওপিয়ায় বর্তমানে বিভিন্ন জাতির মধ্যে বিভেদ বা গোত্রবাদ যা-ই বলা হোক তা ধারণ করেছে চরম আকার। মানুষ নিজের দেশীয় পরিচয়ের চেয়ে জাতিগত পরিচয়কে বড় করে দেখছে। তার ২০২২ সালের গানেও এই উদ্বেগের কথা ফুটে উঠেছিল, যা এবারের গানে আরও স্পষ্ট হয়েছে।
আগামী জুনেই দেশটিতে সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ বারবার দাবি করছেন যে, তিনি দেশের ঐক্যের জন্য কাজ করছেন। কিন্তু নির্বাচনের ঠিক আগে আগে টেডি আফ্রো এর এই প্রতিবাদী গান সরকারের ভাবমূর্তিকে বেশ সংকটে ফেলেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এখন দেখার বিষয়, এই গানের জনপ্রিয়তা আসন্ন নির্বাচনে ইথিওপিয়ার সাধারণ মানুষের মনে কোনো প্রভাব ফেলে কি না।



