মার্কিন নির্বাচন কেন নভেম্বরের নির্দিষ্ট দিনেই হয়?

ছবি: রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি চার বছর পর পর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আর সাধারণ নির্বাচনের দুই বছর পর অনুষ্ঠিত হয় মধ্যবর্তী নির্বাচন। তবে সাধারণ ও মধ্যবর্তী—উভয় নির্বাচনই অনুষ্ঠিত হয় নভেম্বরের প্রথম সোমবারের পরের মঙ্গলবারে। কেন একটি নির্দিষ্ট দিনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়? কখন থেকে এই নিয়ম চালু হয়েছে? এমন প্রশ্ন অনেকেরই।
সাধারণ নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট, প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫ জন সদস্য এবং সিনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে ভোট হয় না।
যুক্তরাষ্ট্রে মঙ্গলবার নির্বাচন আয়োজনের নিয়মটির শিকড় অনেক গভীরে। ঊনবিংশ শতাব্দীর কৃষিভিত্তিক জীবনধারা, রবিবার গির্জায় প্রার্থনায় অংশ নেওয়ার রীতি এবং তৎকালীন সমাজের অন্যান্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয় বিবেচনায় নিয়েই নির্ধারণ করা হয়েছিল এই দিনটি।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র মূলত একটি কৃষিপ্রধান সমাজ ছিল। তখন জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম ছিল এবং অধিকাংশ আমেরিকানই ছিলেন কৃষক। তাদের অনেকেই ভোটকেন্দ্র থেকে দূরে বসবাস করতেন। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে নিকটস্থ ভোটকেন্দ্রে পৌঁছাতে এবং ভোট দিয়ে ফিরে আসতে অনেক সময় এক দিনেরও বেশি লাগত।
এ ছাড়া, ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা অনেক সমাজে সপ্তাহের নির্দিষ্ট কিছু দিন উপাসনার জন্য নির্ধারিত থাকত। তাই রবিবার নির্বাচন আয়োজন করা ছিল অনুপযুক্ত। সোমবার নির্বাচন হলে অনেক ভোটারকে রবিবারই যাত্রা শুরু করতে হতো, যা ধর্মীয় রীতিনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারত। অন্যদিকে, বুধবার নির্বাচন আয়োজন করাও সুবিধাজনক ছিল না। কারণ এদিন অনেক কৃষক তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে বাজারে যেতেন।
সব দিক বিবেচনায় মঙ্গলবারই ছিল সবচেয়ে সুবিধাজনক দিন। ভোটাররা সোমবার যাত্রা করে মঙ্গলবার ভোট দিতে পারতেন এবং বুধবারের বাজার বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজের আগেই নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে আসতে পারতেন।প্রতি চার বছর অন্তর সাধারণ নির্বাচন
মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, প্রতি চার বছর অন্তর প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। অন্যদিকে, প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫ জন সদস্যের মেয়াদ দুই বছর। ফলে প্রতি দুই বছর অন্তর প্রতিনিধি পরিষদের সব আসনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে মোট আসন ১০০টি। প্রতিটি অঙ্গরাজ্য থেকে দুজন করে সিনেটর নির্বাচিত হন। সিনেটরদের মেয়াদ ছয় বছর। তবে সব সিনেটরের নির্বাচন একই সময়ে হয় না। প্রতি দুই বছর অন্তর সিনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণত ৩৩ বা ৩৪টি আসনে নিয়মিত নির্বাচন হয়। এ ছাড়া, কোনো আসন শূন্য হলে সেখানে বিশেষ নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হতে পারে।
একটি নির্দিষ্ট মঙ্গলবার
বিশ্বের অনেক দেশে ছুটির দিনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনের দিন হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে নভেম্বর মাসের প্রথম সোমবারের পরবর্তী মঙ্গলবারকে। অর্থাৎ, নভেম্বরের প্রথম মঙ্গলবার নয়; বরং নভেম্বরের প্রথম সোমবারের পরদিনই মার্কিন নির্বাচনের নির্ধারিত দিন।
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ৩ নভেম্বর, মঙ্গলবার। ২০২৮ সালের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ৭ নভেম্বর, মঙ্গলবার। আর ২০৩২ সালের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২ নভেম্বর, মঙ্গলবার।
২০২৬ সালের ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা কংগ্রেসের দুই কক্ষের সদস্য নির্বাচনে ভোট দেবেন। প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। পাশাপাশি, সিনেটের নিয়মিত নির্বাচনের জন্য নির্ধারিত ৩৩টি আসন এবং বিশেষ নির্বাচনের কারণে আরও কিছু আসনে ভোট হতে পারে। তবে এ নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট বা ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে ভোট হবে না। কারণ, এটি মধ্যবর্তী নির্বাচন।
অন্যদিকে, সাধারণ নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্টের পাশাপাশি প্রতিনিধি পরিষদের সব আসন এবং সিনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর সঙ্গে তার রানিং মেট বা নির্বাচনী সঙ্গী হিসেবে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীও নির্বাচনে অংশ নেন। যেমন, ২০২৪ সালের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট এবং তার রানিং মেট জেডি ভ্যান্স ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০২৮ সালের নির্বাচনে আবারও প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে ভোট অনুষ্ঠিত হবে।
২৮তম কংগ্রেসের আইন
যুক্তরাষ্ট্রের ২৮তম কংগ্রেস ১৮৪৫ সালের ২৩ জানুয়ারি একটি আইন পাস করে। আইনটির নাম ছিল ‘অ্যান অ্যাক্ট টু এস্টাবলিশ আ ইউনিফর্ম টাইম ফর হোল্ডিং ইলেকশনস ফর ইলেক্টরস অব প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড ভাইস প্রেসিডেন্ট ইন অল স্টেটস অব দ্য ইউনিয়ন’। বাংলায় এর অর্থ দাঁড়ায়, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সব অঙ্গরাজ্যে প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য নির্বাচক বাছাইয়ের অভিন্ন সময় নির্ধারণসংক্রান্ত আইন।’এই আইন যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলোতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য নির্বাচক বাছাইয়ের সময়সূচিতে অভিন্নতা আনে। এর মাধ্যমে নভেম্বর মাসের প্রথম সোমবারের পরবর্তী মঙ্গলবারকে নির্বাচনের দিন হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। আইনটি আজও কার্যকর রয়েছে।
১৮৪৫ সালের এই আইন পাস হওয়ার আগে অঙ্গরাজ্যগুলো ডিসেম্বরের প্রথম বুধবারের আগের ৩৪ দিনের মধ্যে নিজেদের সুবিধামতো যেকোনো দিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য ভোট আয়োজন করতে পারত। ওই সময়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জনগণ সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতেন না; বরং তারা নির্বাচক বা ইলেক্টর বাছাই করতেন। পরে ইলেক্টোরাল কলেজের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতেন।
এই ব্যবস্থায় আগে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া অঙ্গরাজ্যগুলো তাদের ফলাফল প্রকাশ করে দিতে পারত। ফলে পরবর্তী সময়ে যেসব অঙ্গরাজ্যে ভোট অনুষ্ঠিত হতো, সেখানকার ভোটাররা আগের ফলাফল সম্পর্কে জেনে প্রভাবিত হতে পারতেন। এতে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
নির্বাচনের জন্য একটি নির্দিষ্ট দিন নির্ধারণের ফলে অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে সময়ের এই ব্যবধান কমে আসে এবং আগের নির্বাচনের ফলাফল পরবর্তী অঙ্গরাজ্যগুলোর ভোটকে প্রভাবিত করার সুযোগ সীমিত হয়। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, কৃষিভিত্তিক জীবনযাপন এবং ধর্মীয় রীতিনীতির বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েই মঙ্গলবারকে নির্বাচনের দিন হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল।
কৃষি ও ধর্মের জন্যই নভেম্বরে নির্বাচন?
কৃষিভিত্তিক জীবনধারার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই নির্বাচনের মাস হিসেবে নভেম্বরকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। বসন্তকাল বা গ্রীষ্মের শুরুতে নির্বাচন আয়োজন করলে তা ফসল রোপণের মৌসুমে বিঘ্ন ঘটাতে পারত। আবার গ্রীষ্মের শেষ দিকে বা শরতের শুরুতে নির্বাচন হলে তা ফসল তোলার সময়ের সঙ্গে মিলে যেত।অন্যদিকে, নভেম্বরের শুরুতে সাধারণত ফসল তোলার কাজ অনেকটাই শেষ হয়ে যেত। একই সঙ্গে শীতের তীব্রতা তখনো পুরোপুরি শুরু হতো না। ফলে কৃষকদের জন্য এ সময়ে ভোট দেওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ ছিল। এ কারণেই নভেম্বরকে নির্বাচনের উপযুক্ত মাস হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ফেডারেল আইনটি যখন প্রণয়ন করা হয়, তখন যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাই ফসল রোপণ ও কাটার মৌসুমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নভেম্বরের একটি দিন নির্বাচন করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে নভেম্বর মাস ও মঙ্গলবার নির্ধারণের পেছনে কৃষিকাজের পাশাপাশি তৎকালীন যাতায়াতব্যবস্থা, ধর্মীয় রীতিনীতি এবং সামাজিক বাস্তবতাও ভূমিকা রেখেছিল।
জনগণের সরাসরি ভোটে সিনেটর নির্বাচন
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটররা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন। তবে শুরুতে এই ব্যবস্থা ছিল না। মার্কিন সংবিধানের মূল বিধান অনুযায়ী, প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের আইনসভা তাদের দুজন সিনেটর নির্বাচন করত।
এই ব্যবস্থার পরিবর্তন আসে সংবিধানের ১৭তম সংশোধনীর মাধ্যমে। ১৯১৩ সালে সংশোধনীটি অনুমোদিত হওয়ার পর সিনেটর নির্বাচনে জনগণের সরাসরি ভোটের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯১৪ সালে প্রথমবারের মতো এই সংশোধনীর অধীনে নিয়মিত সিনেট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
তথ্যসূত্র : ওভারসিজ, উইকিপিডিয়া ও উওন






