ইরানে ফের হামলায় প্রস্তুত পেন্টাগন, ট্রাম্পের দ্বিধা কেন?

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফাইল ছবি: রয়টার্স
ইরানে আবার হামলা চালাতে পেন্টাগন প্রস্তুত হলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বার বার তা বাতিল করে দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বৃহস্পতিবার সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তিনি ইরানের ওপর হামলা চালাবেন না। এটাও বলেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ‘ফলপ্রসূ আলোচনা’ চলছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধ পুনরায় শুরু করার বিষয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হলেও মার্কিন সামরিক বাহিনী কর্মকর্তারা বলছেন, বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর বিকল্পগুলো প্রস্তুত করছেন তারা।
শিগগিরই মধ্যপ্রাচ্যে তিনটি বিমানবাহী রণতরি মোতায়েন করা হবে। ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডার, জ্বালানি স্থাপনা ও অন্যান্য সামরিক ঘাঁটিতে হামলার পরিকল্পনাও করছে পেন্টাগন।
কিন্তু ট্রাম্প বারবারই ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এমনকি তেলবাহী ট্যাঙ্কারের ওপর ইরানের হামলার পরও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রতিক্রিয়া বেশ সংযত ছিল।
রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলছেন, ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে ট্রাম্প চাপের মধ্যে রয়েছেন। অজনপ্রিয় ইরান যুদ্ধের কারণে তার জনপ্রিয়তা এখন তলানিতে। তার কারণেই এই নির্বাচনে রিপাবলিক্যান পার্টি হারতে বসছে। নির্বাচনের মাত্র ২৫ দিন আগে নতুন করে যুদ্ধ জড়িয়ে তিনি দলের সর্বনাশ ডেনে আনতে চান না।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা দল এবং পেন্টাগন ইরান এবং ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযানের জন্য পাঁচটি প্রস্তাব পেশ করেছে। প্রতিবারই ট্রাম্প সেই পরিকল্পনাগুলোতে বাতিল করেছেন।
তবে ট্রাম্প হামলার বিকল্পগুলো প্রস্তুত করার নির্দেশ দিয়েছেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে জাতীয় নিরাপত্তার শীর্ষ কর্মকর্তারা গত শুক্রবার ক্যাম্প ডেভিডে আয়োজিত এক বৈঠকে এসব পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
প্রস্তাবটি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের মতে, পরিকল্পনাগুলো মূলত প্রায় তিন দিনব্যাপী একটি সংক্ষিপ্ত ও তীব্র অভিযানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে।
এই হামলাগুলো মূলত ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভাণ্ডারকে লক্ষ্য করে চালানো হবে। যার একটি বড় অংশ যুদ্ধের শুরুর দিকের পর্যায় থেকে ইরানের ‘ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর’ পুনরায় গড়ে তুলেছে। অন্যান্য লক্ষ্যের মধ্যে ইরানের জ্বালানি স্থাপনা এবং রেভোলিউশনারি গার্ডের কমান্ড পোস্ট ও সদর দপ্তরও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে চলমান কূটনৈতিক আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে বলে ডোনাল্ড ট্রাম্প যে মূল্যায়ন করেছেন, কর্মকর্তারা তাতে সমর্থন জানিয়েছেন।
তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে এখনো অচলাবস্থা রয়ে গেছে। মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বা কর্মসূচি নিয়ে আগে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চান, অন্যদিকে ইরানি আলোচকরা জোর দিয়ে বলছেন যে ওই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা সবার শেষে হওয়া উচিত।
গত কয়েক মাসে সামরিক কৌশল উন্নত করার ফলে ইরান আরও শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের শুরুর দিকের তুলনায় এখন ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে অনেক বেশি ইন্টারসেপ্টর (প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্র) প্রয়োজন হচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের মজুদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
গোয়েন্দা তথ্য সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের মতে, চীনা কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে পাওয়া স্যাটেলাইট চিত্র ব্যবহার করে ইরান এখন মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে আরও কার্যকরভাবে লক্ষ্যবস্তু করতে সক্ষম হয়েছে।
বৃহস্পতিবার এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন যে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রবাহিত কোনো তেলই ইরান থেকে আসছিল না। তবে গোয়েন্দা প্রতিবেদন সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের মতে, এ বিষয়টি বিতর্কসাপেক্ষ। ইরান এমন কিছু জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দেয়, যারা ফি বা মাশুল পরিশোধ করেছে অথবা যেগুলোতে সম্ভবত তাদের তেল পরিবহন করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ৩৮ বিলিয়ন ডলার ক্ষতি
গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানে হামলা শুরুর পর গত ৮ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ৮১টি সামরিক উড়োজাহাজ ধ্বংস কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৩৮ বিলিয়ন ডলার।
গত সোমবার ‘কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস’ (সিবিও) এর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এই পরিসংখ্যান উঠে এসেছে। সিবিও হলো একটি স্বাধীন সরকারি সংস্থা, যা আইনসভার জন্য বাজেট—সংক্রান্ত গবেষণা ও তথ্য সরবরাহ করে থাকে।
প্রতিবেদনে ক্ষতিগ্রস্ত বিমানগুলোর তালিকায় রয়েছে ১২টি এফ—১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান, একটি এফ—৩৫এ লাইটনিং—২ জেট এবং সাতটি কেসি—১৩৫ স্ট্র্যাটোট্যাঙ্কার আকাশপথে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান। প্রতিবেদনে চিহ্নিত ৮১টি বিমানের মধ্যে ৪৫টিই ছিল এমকিউ—৯ রিপার ড্রোন।
সরকারি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘কিলোয়েন গ্রুপ’ এর চেয়ারম্যান ও সাবেক নৌ কর্মকর্তা হারলান উলম্যান বলেন, ‘যুদ্ধের অসম প্রকৃতি এটাই প্রমাণ করে যে, ছোট সামরিক বাহিনী ও সীমিত সক্ষমতার দেশগুলোও বিশ্বের সেরা সামরিক বাহিনীর ব্যাপক ক্ষতিসাধন করতে পারে।’
তিনি আলজাজিরাকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সরঞ্জাম ও ঘাঁটির ক্ষতি করার ক্ষেত্রে ইরান কিছুটা হলেও সফল হয়েছে।
উলম্যান ব্যাখ্যা করেন, ‘ইরানের সামনে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক লক্ষ্যবস্তু রয়েছে। একটি ছোট ড্রোনও যে কোনো বড় সামরিক সম্পদের কতটা ক্ষতি করতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। এই সংঘাত চলাকালে উপসাগরীয় দেশগুলোতে আমরা তার উদাহরণ দেখেছি।’
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান খরচের বিষয়টি ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপও সৃষ্টি করেছে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তার প্রশাসন ২০২৭ অর্থবছরের জন্য রেকর্ড ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলার প্রতিরক্ষা ব্যয়ের প্রস্তাব করেছিল, যা ছিল ইতিহাসের সর্বোচ্চ প্রতিরক্ষা বাজেট।
তবে ব্যয়ের এই বিশাল অংক কংগ্রেসের সদস্যদের মধ্যে বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি করেছে।
গত মাসে ৪৫ জন ডেমোক্র্যাট সিনেটর এবং একজন স্বতন্ত্র সিনেটর প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের কাছে একটি খোলা চিঠি লিখে যুদ্ধের খরচের স্বচ্ছ হিসাব দাবি করেন। তারা যুক্তি দেন যে, কংগ্রেসের পক্ষ থেকে আরও অতিরিক্ত অর্থায়নের বিষয়টি বিবেচনা করার আগে খরচের একটি বিস্তারিত বিবরণ জানা প্রয়োজন।
সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত একটি পৃথক প্রতিবেদনে ‘কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস’ হিসাব দেখিয়েছে যে, ১ আগস্ট পর্যন্ত ইরানের সাথে এই যুদ্ধের পেছনে প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় তা ৪ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা।
এই ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে যুদ্ধে ব্যবহৃত ও হারিয়ে যাওয়া গোলাবারুদ ও সরঞ্জাম প্রতিস্থাপনের খরচ, সেইসাথে জ্বালানি বাবদ বাড়তি খরচ এবং অন্যান্য কার্যক্রমের ব্যয়।
সংস্থাটি জানিয়েছে, সংঘাত আরও এক মাস চললে অতিরিক্ত ২ বিলিয়ন ডলার খরচ হবে। তবে তারা আরও উল্লেখ করেছে, যদি সংঘাতের তীব্রতা বেড়ে জুলাই মাসের পরিস্থিতির পর্যায়ে পৌঁছায়, তবে মাসিক খরচের পরিমাণ বেড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে।
তথ্যসূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস, আলজাজিরা




