মাংসাশী পোকার দৌরাত্ম্য ঠেকাতে যে পদক্ষেপ নিচ্ছে ট্রাম্পের দেশ

মাংসখেকো পরজীবী নিউ ওয়ার্ল্ড স্ক্রুওয়ার্ম। ছবি: রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য ও প্রাণিসম্পদ সংকট মোকাবিলায় নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। ১৯৬৬ সালের পর প্রথমবারের মতো দেশটিতে ভয়াবহ মাংসখেকো পরজীবী নিউ ওয়ার্ল্ড স্ক্রুওয়ার্ম শনাক্ত হওয়ায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু গবাদিপশুর জন্য নয়, দেশের মাংস সরবরাহ ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপরও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ঘোষণা করেছেন, গত ৬০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো একটি তিন সপ্তাহ বয়সী বাছুরের নাভির অংশে লার্ভা শনাক্ত করা হয়েছে। মেক্সিকো সীমান্ত থেকে প্রায় ৩০ মাইল দূরে টেক্সাসের লা প্রায়র শহরে এই ঘটনাটি আবিষ্কৃত হয়।
ইউএস কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ) তথ্য অনুসারে, কর্মকর্তারা ২০ কিলোমিটার প্রশস্ত একটি নিয়ন্ত্রণ অঞ্চল স্থাপন করেছেন এবং এই এলাকায় কোয়ারেন্টাইন, চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং নজরদারি বাস্তবায়ন করছেন।
স্ক্রুওয়ার্মের লার্ভা থেকে মাছি জন্মায়, যা অল্প দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে। প্রধানত মানুষের মাধ্যমেই এরা দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। ১৯৬৬ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে হাতেগোনা কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে, যখন ভ্রমণকারীরা এই কীটটি ফিরিয়ে এনেছিল , কিন্তু কোনো বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব ঘটেনি।
এখন সরকারের প্রধান কৌশল হলো কোটি কোটি জিনগতভাবে পরিবর্তিত বন্ধ্যা মাছি ছাড়ার মাধ্যমে স্ক্রুওয়ার্মের প্রজনন চক্র ভেঙে দেওয়া। তবে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমানে যে পরিমাণ বন্ধ্যা মাছি উৎপাদন ও সরবরাহ করা হচ্ছে, তা দ্রুত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট নয়। ফলে প্রাদুর্ভাব আরও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
এর পাশাপাশি দক্ষিণ সীমান্তে আক্রান্ত এলাকার চারপাশে একটি ২০ কিলোমিটার প্রশস্ত নিয়ন্ত্রণ অঞ্চল গঠন করা হয়েছে। সেখানে কঠোর কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা, পশু চলাচলে নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত নজরদারি চালানো হচ্ছে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে সংক্রমিত এলাকা শনাক্তে প্রশিক্ষিত ঘ্রাণশক্তিসম্পন্ন কুকুর ব্যবহার করা হচ্ছে।
স্ক্রুওয়ার্ম এক ধরনের পরজীবী মাছি, যার স্ত্রী মাছি জীবন্ত উষ্ণ রক্তের প্রাণীর খোলা ক্ষত বা শরীরের নরম অংশে ডিম পাড়ে। ডিম ফেটে লার্ভা বের হলে তারা ধারালো মুখাংশ দিয়ে জীবন্ত টিস্যুর ভেতরে প্রবেশ করে এবং ধীরে ধীরে মাংস খেয়ে ফেলে, যা চিকিৎসা না করলে প্রাণঘাতী হতে পারে।
ইউএসডিএ জানিয়েছে, দ্রুত বিস্তার ঠেকাতে জরুরি ব্যবস্থা হিসেবে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। যদিও স্ক্রুওয়ার্ম সাধারণত স্বল্প দূরত্বে উড়তে পারে, মানুষ ও পশু পরিবহনের মাধ্যমেই এটি দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ার প্রধান ঝুঁকি তৈরি হয়।
১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপকভাবে বন্ধ্যা মাছি ছাড়ার মাধ্যমে এই পরজীবী প্রায় নির্মূল করেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় সংক্রমণ আবার বাড়তে শুরু করেছে। ২০২২ সালে পানামায় বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়, পরে তা মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে অগ্রসর হয়।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে যুক্তরাষ্ট্রের গরুর মাংস শিল্প বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। বর্তমানে পুরো অঞ্চলজুড়ে রোগটির বিস্তার ২ হাজারেরও বেশি মানব সংক্রমণের কারণ হয়েছে বলে জানা গেছে, যদিও মানুষের জন্য ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম বলে দাবি করছে কর্তৃপক্ষ।
সূত্র: বিবিসি




