শান্তির নোবেল এবার পাবেন কে, ট্রাম্পের সম্ভাবনা কতটুকু

ট্রাম্পের হাতে প্রতীকী নোবেল পুরস্কার তুলে দিচ্ছেন ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো। ফাইল ছবি : সংগৃহীত
এবারও নোবেল শান্তি পুরস্কার পাচ্ছেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের সময় তাকে পুরস্কার দেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে তাদের দাবি, পুরস্কার কে পাবেন, তা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের প্রভাব এড়ানো কঠিন হতে পারে।
আগামী ৯ অক্টোবর নোবেল শান্তি পুরস্কারের বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হবে। পুরস্কারটি দেওয়া হয় নরওয়ের পাঁচ সদস্যের নোবেল কমিটির সিদ্ধান্তে।
গত বছর এ পুরস্কার পেয়েছিলেন ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার জন্য তখন ট্রাম্প বারবার প্রকাশ্যে প্রচার চালিয়েছিলেন। পুরস্কার পাওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর মাচাদো তার নোবেল পদক ট্রাম্পকে দিয়ে দেন। গণতান্ত্রিক ভেনেজুয়েলার জন্য নিজের প্রচেষ্টায় ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়ার লক্ষ্যেই তিনি এমনটি করেছিলেন।
অসলোভিত্তিক পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হাকন গেরলোয় মনে করেন, গত বছরের ঘটনা এবার নোবেল কমিটির সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
রয়টার্সকে তিনি বলেছেন, ট্রাম্পের চাপের মুখে পড়লে কোনো বিজয়ী তা সামলাতে পারবেন কি না, সেটিও কমিটির বিবেচনায় থাকতে পারে। কোনো ব্যক্তিকে পুরস্কার দেওয়ার পর তাতে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি হবে কি না, সেটিও ভাবতে হবে তাদের।
এ কারণে এবার এমন কাউকে পুরস্কার দেওয়ার আলোচনা চলছে, যিনি ট্রাম্পের চাপ সামলাতে পারবেন বা যার ক্ষেত্রে পুরস্কারটি আন্তর্জাতিকভাবে একটি শক্ত বার্তা দেবে।
সম্ভাব্য নামের তালিকায় রয়েছেন পোপ লিও, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি), আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এবং জাতিসংঘের অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেসকা আলবানিজ।
যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া প্রথম পোপ লিও যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলে আসছেন। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের সমালোচনা করায় ট্রাম্প তাকে ‘দুর্বল’ বলেও আক্রমণ করেছিলেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে পোপের প্রকাশিত ধর্মীয় নির্দেশনা, সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান, অভিবাসীদের প্রতি সম্মান এবং মানবিক কর্মকাণ্ড তার পক্ষে পুরস্কারের কারণ হতে পারে।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক করিম হাগাগ বলেছেন, পোপ এখন শুধু একজন ধর্মীয় নেতা নন। তিনি গুরুত্বপূর্ণ একজন চিন্তাবিদ হিসেবেও উঠে এসেছেন।
অন্যদিকে ফ্রান্সেসকা আলবানিজ ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র সমালোচনার মুখে রয়েছেন। গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং পশ্চিম তীর দখলের সমালোচনা করে তিনি আলোচনায় এসেছেন।
তবে কমিটি চাইলে বিতর্ক এড়াতেও পারে। গত বছরের ঘটনার পর ট্রাম্পকে বিরক্ত না করে তুলনামূলক নিরাপদ ও কম বিতর্কিত কাউকে বেছে নেওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
সেক্ষেত্রে সুদানের ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স রুমস’ বা সংঘাতপূর্ণ এলাকায় শিশুদের নিয়ে কাজ করা ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’ পুরস্কার পেতে পারে।
তবে নোবেল কমিটির ওপর আরেক ধরনের চাপও রয়েছে। ইতিহাসবিদ ও নোবেল শান্তি পুরস্কারবিষয়ক লেখক ওইভিন্দ স্টেনারসেন মনে করেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে এবার এমন একটি পুরস্কার দরকার, যা উদার গণতন্ত্র, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার রক্ষার পক্ষে অবস্থান নেবে।
এ কারণে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে পুরস্কার দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র যখন আদালটির ওপর বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন এমন পুরস্কার একটি শক্ত বার্তা দেবে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতকে পুরস্কার দেওয়া হলে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও শান্তিপূর্ণভাবে বিরোধ মীমাংসার পক্ষে বার্তা যাবে।
কম্বোডিয়া, ইসরায়েল ও পাকিস্তানের নেতারা ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে গেরলোয়ের মতে, ট্রাম্পের পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা ‘খুবই কম’।
ট্রাম্পের নোবেল পাওয়ার জন্য চাপ দেওয়ার ঘটনাগুলো নিয়ে নোবেলজয়ী সাংবাদিক মারিয়া রেসাও উদ্বেগ জানিয়েছেন। গত বছরের ঘটনাকে তিনি ‘ভয়াবহ’ অভিজ্ঞতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
রয়টার্সকে তিনি বলেছেন, ‘আমরা কিছু নির্দিষ্ট মানদণ্ড মেনে চলি। শক্তি থাকলেই কোনো কিছু সঠিক হয়ে যায় না।’
এবারের নোবেল শান্তি পুরস্কার তাই শুধু একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি নয়। কে পুরস্কার পাচ্ছেন, তার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, যুদ্ধ, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নেও একটি বার্তা আসতে পারে।
সূত্র : রয়টার্স





