ট্রাম্পের ছায়ায় ইরান চুক্তির মুখ হয়ে উঠেছেন জেডি ভ্যান্স

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আড়ালে ইরান চুক্তির প্রধান মুখ হয়ে উঠেছেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। বিতর্কিত এই চুক্তির পক্ষে হোয়াইট হাউসের সবচেয়ে সক্রিয় কণ্ঠস্বর এখন তিনিই। ফলে চুক্তির সাফল্য যেমন ভ্যান্সের রাজনৈতিক অর্জন হতে পারে, তেমনি তার কাঁধেই এসে পড়তে পারে ব্যর্থতার দায়ও।
পুরো সপ্তাহ ধরে চুক্তি রক্ষায় ব্যস্ত থাকলেও বারবার ট্রাম্পের ছায়া পড়েছে ভ্যান্সের বক্তব্যে। ভ্যান্স যা বলছেন, ট্রাম্প ঠিক যেন বলে দিচ্ছেন তার উল্টোটা। কখনো ইরানের ৩০০ বিলিয়ন ডলার পাওয়ার কথা বলছেন ভ্যান্স, আবার ঘণ্টা খানেক পর ট্রাম্প বলছেন ‘এটা ভুয়া খবর’! এমনকি সুইজারল্যান্ডে স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের সব আয়োজন করেও শেষ মুহূর্তে ভ্যান্সকে সেখানে যেতে দেওয়া হয়নি ট্রাম্পের নির্দেশে।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসের ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ভ্যান্স বলেছেন, ‘চুক্তি ভেঙে গেলে আমাকে দায়ী করার বিষয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য ছিল কৌতুক।’ তার ভাষ্য, ‘আমি মনে করি প্রেসিডেন্ট মজা করছিলেন।’
এসব জটিলতার মধ্যেও চুক্তির পক্ষে সরব থেকেছেন ভ্যান্স। এমনকি চুক্তি নিয়ে ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়ারও করেছেন কড়া সমালোচনা। একে সাম্প্রতিক সময়ে কঠোর বলে মনে করা হচ্ছে ট্রাম্পের বক্তব্যের চেয়েও।
ভ্যান্সের জন্য সময়টিও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক দিন আগে নিজের স্মৃতিকথা প্রকাশ করেছেন তিনি। এটি ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জল্পনা বাড়িয়েছে তার সম্ভাব্য প্রার্থিতার।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধী ‘মাগা’ সমর্থক রিপাবলিকানদের একাংশ। অন্যদিকে ইরানবিরোধী কট্টরপন্থীরা মনে করছেন তেহরানের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে হোয়াইট হাউস। ফলে দলীয় বিভক্তির মধ্যে এই চুক্তির পক্ষে অবস্থান নেওয়া সহজ হবে না ভ্যান্সের জন্য।
অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে কম চাপের মুখে রয়েছেন প্রশাসনের অন্য শীর্ষ কর্মকর্তারা। ইরান ইস্যুতে নিজেকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু থেকে দূরে রেখেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। সামরিক অভিযানের পক্ষে কথা বললেও কূটনৈতিক আলোচনায় সরাসরি জড়িত নন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ।
রিপাবলিকান কৌশলবিদ ম্যাট ম্যাকোভিয়াক বলেছেন, ‘সাধারণত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে পছন্দ করেন ট্রাম্প। কিন্তু এবার তিনি তা করেননি, যা একটি সচেতন সিদ্ধান্ত বলেই মনে হচ্ছে।’
নাম প্রকাশ না করে একজন জ্যেষ্ঠ রিপাবলিকান কর্মী অভিযোগ করেন, পুরো চুক্তির দায় ভ্যান্সের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন ট্রাম্প। তার মতে, ‘জেডি ভ্যান্সকে বলির পাঁঠা বানানো ট্রাম্পের পুরনো রাজনৈতিক কৌশলেরই অংশ।
তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি নেতিবাচক নয় ভ্যান্সের জন্য। কারণ আগামী ৬০ দিনের আলোচনার মাধ্যমে একটি চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা সম্ভব হলে দীর্ঘদিনের মার্কিন কূটনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে তার ভূমিকাকে বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হবে।
কিন্তু এখনো বাকি রয়েছে বহু জটিল কারিগরি বিষয় নিষ্পত্তির। ফলে চূড়ান্ত চুক্তি হবে কি না, কিংবা হলেও তা দেশ-বিদেশের সমালোচকদের সন্তুষ্ট করতে পারবে কি না, তা অনিশ্চিত।
সপ্তাহ জুড়ে চুক্তি নিয়ে তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তিও। গত রবিবার ট্রাম্প প্রশাসন জানায়, সমঝোতা স্মারকে সম্মত হয়েছে ইরান। কিন্তু চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশ না করায় ওঠে নানা প্রশ্ন।
পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গত সোমবার ভ্যান্স বলেছেন, ‘চুক্তির শর্ত মেনে চললে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিলে প্রবেশাধিকার পেতে পারে ইরান।’ কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই তহবিলকে ‘ভুয়া খবর’ বলে উল্লেখ করেন ট্রাম্প। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমরা ১০ সেন্টও দিচ্ছি না।’
পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত চুক্তির খসড়ায় অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন পরিকল্পনা তৈরিতে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেয়।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও ভ্যান্স দাবি করেন, এই সমঝোতা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ রোধে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম পদক্ষেপ। তবে চুক্তিতে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু উল্লেখ নেই। বিষয়টি পরবর্তী আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে।
এরই মধ্যে ভ্যান্স তার ধর্মীয় জীবন ও ক্যাথলিক ধর্মে ধর্মান্তর নিয়ে লেখা নতুন বইয়ের প্রচারণাও চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু প্রতিটি সাক্ষাৎকারেই ইরান চুক্তি নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে তাকে।
গত বুধবার ট্রাম্প আবারও রসিকতার সুরে বলেছেন, ‘চুক্তি ব্যর্থ হলে ভ্যান্সকেই দায়ী করবেন তিনি।’ একই সঙ্গে তিনি চুক্তির গুরুত্বও কিছুটা খাটো করে দেখান। পরে অবশ্য ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সঙ্গে এক নৈশভোজে ক্যামেরার সামনে চুক্তির কাগজে স্বাক্ষর করেন ট্রাম্প।
এরপর প্রশ্ন ওঠে, ভ্যান্সের আলাদা করে জেনেভায় স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের প্রয়োজন কী। পরে হোয়াইট হাউস জানায়, ইরানের সঙ্গে আলোচনার সময়সূচি ও অন্যান্য ব্যবস্থা চূড়ান্ত না হওয়ায় আপাতত স্থগিত করা হয়েছে সেই সফর।
এদিকে ট্রাম্প বিদেশ সফরে থাকাকালে চুক্তির পক্ষে অবস্থান ধরে রাখেন ভ্যান্স। তবে চুক্তির কড়া সমালোচনা করেন সিনেটে থাকা তার সাবেক সহকর্মীরা।
লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকান সিনেটর বিল ক্যাসিডি বলেছেন, ‘ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা কমেনি। বরং তারা বুঝে গেছে যে হরমুজ প্রণালি নিয়ে হুমকি কার্যকর কৌশল হতে পারে।’
অন্যদিকে সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটির চেয়ারম্যান রজার উইকার মন্তব্য করেন, এই চুক্তি প্রেসিডেন্টের ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বৃহস্পতিবারের ব্রিফিংয়ে ভ্যান্স বলেছেন, ‘চুক্তির ইতিবাচক প্রভাব এরই মধ্যে জ্বালানির দামে প্রতিফলিত হতে শুরু করেছে।’ তার মতে, ইরান প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলে এবং চূড়ান্ত শান্তি চুক্তিতে পৌঁছালে মিলবে আরও সুফল।
ভ্যান্স বলেছেন, ‘তারা যদি আচরণ পরিবর্তন করে, তাহলে বড় কিছু ঘটবে। আর যদি না করে, তাতেও আমাদের ক্ষতি নেই। যেভাবেই হোক, আমরা জিতব।’
তবে চুক্তির আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে স্পষ্ট হয়ে উঠছে শেষ পর্যন্ত সাফল্য বা ব্যর্থতার রাজনৈতিক দায়ও পড়বে তার কাঁধেই।
সূত্র: বিবিসি





