প্রয়োজনে ছিল না পাশে, ন্যাটোর ওপর ক্ষিপ্ত ট্রাম্প

দাভোসে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
বিশ্ব রাজনীতির দাবার ছকে আবারও ঝড় তুলেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরান যুদ্ধের উত্তাপ এখনও ঠান্ডা হয়নি। আর সেই আগুনেই যেন নতুন করে ঘি পড়েছে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো ঘিরে পুরানো বিতর্কে। যুদ্ধের ময়দানে যখন যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা একা দুলছিল, সহযোগী জোট ন্যাটো তখন যেন নীরব প্রহরী। ট্রাম্পের চোখে ন্যাটো এখন শুধু পিঠ ফেরানো বন্ধু। যাদের ওপর নির্ভর করে লাভ নেই।
বহুদিনের সংশয় আর অসন্তোষ মিলেমিশে যেন এখন একটাই প্রশ্নে এসে দাঁড়িয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র কি তবে ন্যাটোর ছায়া ছেড়ে একাই পথ চলবে? তবে এই পথ এতটা সহজ নয়। সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশের আশীর্বাদ ছাড়া ন্যাটো ত্যাগের পথ যেন কাঁটার বেড়া।
ট্রাম্প বহু বছর ধরেই ন্যাটোর কট্টর সমালোচক। প্রথম মেয়াদে ২০২০ সালে ট্রাম্প বলেছিলেন, যেকোনো চুক্তি থেকে সরে আসার একচেটিয়া ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের, কংগ্রেসের নয়।
আবারও ন্যাটো জোটের তীব্র সমালোচনা করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে ব্যক্তিগত বৈঠকের পর ট্রাম্প অভিযোগ করেন, ইরানের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় সমর্থন দেয়নি ন্যাটো।
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে পোস্ট করে তিনি লেখেন, ‘আমাদের যখন দরকার ছিল, তখন ন্যাটো ছিল না। ভবিষ্যতেও তারা পাশে থাকবে না।’
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মহাসচিব রুটে জানান, হোয়াইট হাউসের বৈঠকটি ছিল খোলামেলা ও স্পষ্ট। যদিও দুপক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল।
গতকাল বুধবারের বৈঠকের আগে ট্রাম্প ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহারের হুমকিও দেন। কারণ বেশ কয়েকটি ন্যাটো দেশ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার জন্য ট্রাম্পের আহ্বানে সাড়া দিতে অস্বীকৃতি জানায়। বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান মূল্য নিয়ন্ত্রণে এই প্রণালি চালু রাখা জরুরি বলে মনে করছিলেন ট্রাম্প।
হোয়াইট হাউস অবশ্য বৈঠকের বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করেনি। মহাসচিব রুটে বুধবার প্রায় দুই ঘণ্টা হোয়াইট হাউসে ছিলেন বলে জানা গেছে।
ধারণা করা হয়, এই বৈঠকের মাধ্যমে রুটে ট্রাম্পকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে ন্যাটো জোটে যুক্তরাষ্ট্র ও ট্রাম্প নিজের স্বার্থের জন্যই জরুরি। কিন্তু স্পষ্ট হয়েছে, ন্যাটো ও এর সদস্য দেশগুলোর প্রতি ট্রাম্পের গভীর অনাস্থা এখনও কাটেনি।
তিনি মনে করেন, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ (ইরানের সঙ্গে কল্পিত যুদ্ধ) শুরুর আগে ও চলাকালে ন্যাটো সদস্যরা আমেরিকাকে পর্যাপ্ত সাহায্য করেনি।
ইরান সংকটে ন্যাটোর ভূমিকা সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উদ্ধৃতি দিয়ে জানান, ন্যাটোকে পরীক্ষা করা হয়েছিল এবং তারা ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ন্যাটো দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের প্রতি পিঠ ফিরিয়ে নিয়েছে। যদিও তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্র বহন করে।
অন্যদিকে মহাসচিব রুটে বলেন, ইউরোপের বেশিরভাগ দেশ সরাসরি বাধা দেয়নি, বরং ঘাঁটি ব্যবহার, লজিস্টিক সহায়তা ও আকাশপথ ব্যবহারে সহযোগিতা করেছে। তিনি এটিকে জটিল ও সূক্ষ্ম বাস্তবতা বলে উল্লেখ করেন।
রুটে আরও দাবি করেন, ট্রাম্পের নেতৃত্বেই ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা দুর্বল হয়েছে। বর্তমান বিশ্ব আগের তুলনায় বেশি নিরাপদ। ন্যাটোর বেশিরভাগ সদস্যও এই যুদ্ধকে অবৈধ মনে করে না বলে জানান তিনি।
এদিকে ২০২৩ সালের শেষে মার্কিন কংগ্রেস একটি আইন পাস করে। যাতে বলা হয়, সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন বা কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রেসিডেন্ট একতরফাভাবে ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করতে পারবেন না।
ইরান যুদ্ধের আগেই ন্যাটোর সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। এর প্রধান কারণ ছিল গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের পরিকল্পনা। বৈঠকের পর ট্রাম্প তার পোস্টে গ্রিনল্যান্ড নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ন্যাটোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই টানাপোড়েন নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এটি ন্যাটো জোটের ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
সূত্র: বিবিসি
