বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশে দরিদ্র বাড়বে ১২ লাখ

বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ে বুধবার সকালে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে এ বছর বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হতে পারেন। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের প্রকৃত আয় কমে যেতে পারে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আয় কমে যাওয়া এবং কর্মসংস্থানের ধীরগতির কারণে এসব মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পারবে না বলে সংস্থাটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বুধবার প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনের এপ্রিল সংস্করণে বলা হয়েছে, যুদ্ধ পরিস্থিতি না থাকলে চলতি বছরে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পারতেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়াতে পারে মাত্র ৫ লাখে। ফলে প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে আটকে থাকবেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে দারিদ্র্যের হার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবার বাড়তির দিকে। ২০২২ সালে যেখানে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ, তা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে। শুধু ২০২৫ সালেই নতুন করে ১৪ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছেন। বিশ্বব্যাংক বলছে, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অস্থিরতা এই প্রবণতাকে আরও তীব্র করেছে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ বাজারে চাপ তৈরি হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের জীবনে।
এ ছাড়া বৈদেশিক খাতেও চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রবাসী আয়, রপ্তানি ও মুদ্রার বিনিময় হার সব ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। এতে চলতি হিসাবের ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা করছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নামতে পারে, যা আগে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ ধরা হয়েছিল। যদিও সরকারের লক্ষ্যমাত্রা এর চেয়ে বেশি।
বিশ্বব্যাংক আরও বলছে, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিম্ন রাজস্ব আদায়, দুর্বল ব্যাংক খাত এবং বৈদেশিক খাতে চাপ এই চারটি প্রধান ঝুঁকি আগে থেকেই ছিল। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এসব ঝুঁকিকে আরও জোরালো করে তুলেছে।
সংস্থাটির মতে, মূল্যস্ফীতি বর্তমানে সাড়ে ৮ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করছে, যা সীমিত আয়ের মানুষের জন্য বড় চাপ তৈরি করছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি ও আমদানি ব্যয় আরও বাড়তে পারে, ফলে মূল্যস্ফীতিও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে দ্রুত ও কার্যকর সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি বলছে, রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ব্যাংক খাত শক্তিশালী করা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা জরুরি।
বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা বলেছেন, দ্রুত বাড়তে থাকা কর্মশক্তিকে কাজে লাগাতে এবং প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করতে হলে ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে নীতিগত অনিশ্চয়তা কমানো এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।















