যেভাবে ‘নরকের’ কাউন্টডাউন থামাল ইসলামাবাদ

সংগৃহীত ছবি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে হামলা জোরদারের নির্ধারিত সময়সীমার মাত্র দেড় ঘণ্টা আগে ট্রুথ সোশ্যালে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। অল্প সময়ের মধ্যেই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি এই চুক্তি নিশ্চিত করেন, ফলে উত্তেজনাপূর্ণ বিশ্বে সাময়িক স্বস্তি ফিরে আসে।
তবে যুদ্ধবিরতির গুরুত্বপূর্ণ অনেক শর্ত এখনো অস্পষ্ট। ট্রাম্প জানান, ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করবে, আর তেহরান জানায়, এই চলাচল তাদের সামরিক তত্ত্বাবধানে হবে। যুদ্ধবিরতিতে লেবানন অন্তর্ভুক্ত কি না, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং ইরানের প্রস্তাবিত ১০ দফা পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন রয়ে গেছে।
তবে একটি বিষয়ে উভয় পক্ষের অবস্থান এক—মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা। ট্রাম্প বলেন, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে আলোচনার পর তিনি সামরিক পদক্ষেপ স্থগিত করেন। ইরানও একইভাবে জানায়, শরিফের অনুরোধে তারা যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। শরিফ দ্রুত চুক্তির ঘোষণা দেন এবং পরবর্তী আলোচনার জন্য উভয় পক্ষকে ইসলামাবাদে আমন্ত্রণ জানান।
২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধে ইরানে দুই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ব্যাহত হয়েছে এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। এই যুদ্ধ সাময়িকভাবে থেমেছে—যার পেছনে পাকিস্তানের কয়েক সপ্তাহের নিবিড় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা বড় ভূমিকা রেখেছে।
শুরু থেকেই সক্রিয়তা ও ভারসাম্য রক্ষা
পাকিস্তান শুরু থেকেই সক্রিয় ছিল, যদিও বেশিরভাগ কাজ হয়েছে আড়ালে। তেহরানে প্রথম হামলার সময়ই সৌদি আরবে অবস্থানরত পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ইরানের প্রতি সংহতি জানান এবং দ্রুত ইসলামাবাদকে সংলাপের স্থান হিসেবে প্রস্তাব করেন।
দেশের ভেতরেও চাপ বাড়ছিল। করাচিতে সহিংস বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ঝুঁকি বাড়ে। সেনাপ্রধান মুনির পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হস্তক্ষেপ করেন। একই সময়ে আফগান তালেবানের সঙ্গে উত্তেজনা, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্স নিয়ে উদ্বেগ—সব মিলিয়ে পাকিস্তান একাধিক চাপে ছিল।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসলামাবাদকে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়েছে—একদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখা, অন্যদিকে প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে না জড়ানো।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলার প্রাথমিক সমালোচনা তেহরানের আস্থা অর্জনে সহায়ক হয়।
যুদ্ধ তীব্র, কূটনীতি সক্রিয়
মার্চের মাঝামাঝি সংঘাত আরও তীব্র হয়। ইসরায়েলি হামলায় ইরানের শীর্ষ ব্যক্তিত্ব ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হয়, আর পাল্টা হামলায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যায়।
এই সময় পাকিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিশরকে নিয়ে একটি কূটনৈতিক কাঠামো গড়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা পরিকল্পনা ও ইরানের ১০ দফা প্রস্তাব আদান-প্রদানে পাকিস্তান প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান শুধু বার্তাবাহক ছিল না, বরং আলোচনার ধাপ ও কাঠামো নির্ধারণেও ভূমিকা রেখেছে।
মুনিরের ভূমিকা
সেনাপ্রধান আসিম মুনির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, বিশেষ করে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে। ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্ক সংকটময় মুহূর্তে সিদ্ধান্ত গ্রহণ দ্রুত করতে সহায়তা করে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ছিল প্রাতিষ্ঠানিক প্রচেষ্টা—যেখানে বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্বের সমন্বয় ছিল।
যুদ্ধবিরতির কাউন্টডাউন
সময়সীমা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনা চরমে পৌঁছে যায়। ট্রাম্প ব্যাপক ধ্বংসের হুঁশিয়ারি দেন। এমনকি ইরানে ‘নরক নেমে আসবে’ বলেও হুমকি দেন তিনি। তবে আড়ালে পাকিস্তান মধ্যস্থতা জোরদার করে। শেষ পর্যন্ত শরিফের প্রকাশ্য আহ্বান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যার পরপরই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে। তেলের দাম দ্রুত কমে এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালুর প্রস্তুতি শুরু হয়।
এরপর কী?
এই যুদ্ধবিরতি এখনো নাজুক, এটি চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি নয়। লেবাননসহ বেশ কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
তবে এই সংকটে পাকিস্তান একটি বিশ্বাসযোগ্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে—যা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তাদের ভূমিকায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, যদিও চূড়ান্ত ফলাফল এখনো অনিশ্চিত।















