‘ভালোবাসার আচঁড়-কামড়ে বিষ নেই’
- ডিসি হিলে পথপ্রাণীর ‘মা’ শংকরী দাশের এক দশকের গল্প

শংকরী দাশ। ছবি: আগামীর সময়
ঘড়ির কাঁটায় তখন পাঁচটা পেরিয়েছে। বসন্তের পড়ন্ত বেলায় পশ্চিমাকাশ আস্তে আস্তে লাল হয়ে উঠছে। ‘আয় আয়’ হাঁক দিতে দিতে এক নারী উঠে যাচ্ছেন ডিসি হিলের পাহাড়ি পথ ধরে। একহাতে খাবার ভর্তি বাক্স আর অন্যহাতে পানির জার। ডাক শুনে এক এক করে ছুটে আসছে কুকুর। প্লাস্টিকের থালায় ভাত দিয়ে তিনটাকে খেতে দিল ডিসি পাহাড়ের পূর্ব কোণায়। বাকি কুকুরের সন্ধানে প্রধান ফটকের দিকে ছুটলেন এই নারী। তার নাম শংকরী দাশ।
প্রায় এক যুগ ধরে নগরের বিভিন্ন স্থানে পথের কুকুর বিড়ালকে খাবার দিয়ে বেড়ান তিনি। ডিসি হিল, নন্দনকানন, হেমসেন লেন, চেরাগী পাহাড় এলাকার কুকুর বিড়াল তাকে দেখলেই ছুটে যায়। তিনিও পরম মমতায় প্রাণীগুলোকে খাবার ও পানি খাইয়ে দেন, ঠিক মায়ের মতো। এভাবইে তিনি হয়ে উঠেছেন বোবা প্রাণীগুলোর অতি আপনজন।
নগরের নন্দনকান এলাকার বাসিন্দা শংকরীর এক মেয়ে রয়েছেন। মেয়েটির বিয়ে হয়েছে। সংসারে আর কেউ নেই। গ্রামের বাড়ি বাঁশখালীর বাণীগ্রামে। তিনি থাকেন অপর একজনের বাড়িতে। সেখানে এক বৃদ্ধাকে দেখাশোনা করেন। সে সুবাদে কিছু টাকা পান। এ ছাড়া নিজের আপন ভাইয়েরা পূজা পার্বণে টাকা দেন। শংকরীর সব আয় বরাদ্দ থাকে কুকুর বিড়ালের জন্য।
কথা বলতে বলতে ডিসি হিলের পূর্ব দিক থেকে প্রধান ফটকের দিকে এগোলেন শংকরী। ঝরনার পাশে এক থালায় দুই কুকুরকে খেতে দিলেন। পাশে আরো দুটি পলিথিন বিছিয়ে বাকি দুটিকে দিলেন খেতে।
কেন এমন ব্যবস্থা। একসাথে সবগুলোকে খেতে দিলে সমস্যা কোথায়? এমন প্রশ্নে শংকরী দাশ মুচকি হাসলেন, ‘ওদের মধ্যে ঝগড়া আছে। তাই এক পাতে সবাই খাবে না। একটার সঙ্গে আরেকটার মিলে না। এখানে ১৪টি কুকুর রয়েছে। সবগুলোর জায়গা ভাগ আছে। দুটিকে পূর্বদিকে দিয়ে এসেছি। এগুলোকে এখানে দিচ্ছি। বাকিগুলোকে উপরের রাস্তার পাশে দেব।’
একটা কুকুর অসুস্থ। সে কিছু খাচ্ছে না গতকাল থেকে। তা নিয়েও যথেষ্ট দুশ্চিন্তায় তিনি-‘গতকাল থেকে তাকে খাওয়াতে পারছি না। অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আজ দেখতেও পাচ্ছি না কোথায় গেছে।’
এবার খাবারের মেন্যুটা একবার দেখে আসি। আজ বুধবার শংকরী কুকুরগুলোর জন্য নিয়ে এসেছেন সাদা ভাতের সঙ্গে ছিল কোরাল মাছ। বেশির ভাগ সময় মুরগীর পা, কলিজা গিলা এসব খাবার বরাদ্দ থাকে কুকুরের জন্য।
কীভাবে এমন ভালোবাসায় জড়ালেন শংকরী, তা আরেক গল্প। তিনি বলেছেন, ‘প্রথমদিকে অসহায় মানুষকে খাওয়াতাম, সাহায্য সহযোগিতা করতাম। এরপর রাস্তার এক দুটি কুকুরকে ১০-১২ বছর আগে খেতে দিতাম। পড়ে আস্তে আস্তে তা বেড়ে যায়। কুকুরের পাশাপাশি বিড়ালও জুটেছে কিছু।’
শংকরী বছর দশেক আগে আজিম গ্রুপের সুপারভাইজার পদে চাকরি করতেন। এরপর তিনি বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের বাসায় দিনযাপন করেন। তাদের ফরমাস খেটে যা টাকা পান তা ব্যয় করেন প্রাণীদের খাবারের পেছনে। তবে স্বজনেরা তার এমন প্রাণীভক্তিতে বিরক্ত। পছন্দ করেন না মেয়ে বা ভাই বোনেরা। এ নিয়ে তার কোনো আক্ষেপ নেই। এখন যে বৃদ্ধার বাসায় থাকেন সেখানে মাঝেমধ্যে কুকুরের জন্য রান্না করেন তিনি। আপত্তি উঠলে কোনো হোটেলে কিছু টাকা দিয়ে নিজ দায়িত্বে রান্না করেন শংকরী। তারপর ওই রান্না নিয়ে ছোটেন ডিসি হিল বা নন্দনকানন কিংবা হেমসেন লেনে।
শংকরী বলেছেন, ‘রাস্তার কুকুরগুলোকে আমরা খাবার না দিলে কোথায় পাবে খাবার? নিজের টুকটাক আয় কিংবা ভাইদের দেওয়া টাকা তাদের পেছনে ব্যয় করি। সঞ্চয় দিয়ে কি হবে?’
শুধু তাই নয়, তিনি প্রাণীগুলোকে নিজের সন্তানের মতো করে আগলে রাখেন। ভাবেন আগামীদিনের খাবার নিয়েও। গেল রোজার ঈদের ছুটির জন্য প্রায় সপ্তাহখানেকের জন্য দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেল। কিন্তু শংকরী কুকুরগুলোর জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন ঈদের আগে থেকেই, ‘বন্ধের আগেই মুরগীর দোকান থেকে প্রায় এক মণ পা গিলা কিনে রেখেছি। বন্ধের সময় সেগুলো খাইয়েছি। একজনের ফ্রিজে ভাড়া দিয়ে রেখেছি এগুলো।’
প্রাণীর প্রতি এমন ভালোবাসা দেখাতে গিয়ে কখনো কখনো কামড় বা আচঁড়ও খেতে হয়েছে। তবে সেটা ইচ্ছাকৃত নয়। তাতে তার কোনো দুঃখ নেই।
‘কখনো মুখে তুলে খাওয়াতে গিয়ে দাঁত লেগেছে হাতে। আমাকে ডাক্তার পরামর্শ দিয়েছিলেন জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে টিকা দিতে। আমি দিইনি। সুস্থ হয়ে গেছি। ওরা আমাকে ভালোবাসে। তারা ইচ্ছা করে কেউ আঘাত করে না। ভালোবাসার আচঁড়-কামড়ে বিষ নেই।’ -জানান শংকরী।
এমন ভালোবাসার টানে তিনি প্রতিদিন ছুটে যান প্রাণীদের কাছে। নানা নামে কুকুরগুলোকে ডাকেন। ঝড়-বৃষ্টি অসুস্থতা কিছুই তাকে দমাতে পারে না।
একবার ডিসি হিলে কুকুরকে খাওয়ানোর সময় মৌমাচির কামড় খেয়েছিলেন তিনি। এরপর শংকরীর হাত ফুলে যায়। জ্বর এবং ব্যথায় কাতর হন।
শংকরী জানান, ‘অসুস্থতা নিয়েও ছুটে আসছি। কারণ আমি জানি তারা আমার জন্য অপেক্ষা করবে। খিদায় কষ্ট পাবে।’
ডিসি হিলের পাট শেষ। এবার তিনি খালি পানির জার এবং খাবারের পাত্রটি নিয়ে ছুটলেন বিড়ালদের উদ্দেশ্যে হেমসেন লেনে। বিড়ালদের জন্য আলাদা মুরগীর পা সিদ্ধ করে রেখেছে একটা দোকানে। ওখান থেকে তা নিয়ে খাওয়াতে যাবেন।
তিনি জানান, ‘হেমসেন লেনে ১২টির মতো কুকুর ও জালাল কলোনিতে ২০টি বিড়াল রয়েছে । তারা আমার জন্য অপেক্ষা করছে এখন।’
দিন দিন এমন ভালোবাসা বেড়েই চলেছে। বাড়ছে আপন প্রাণীর সংখ্যাও। তবে কোনো মানুষকে এখন সহযোগিতা করেন না তিনি।
শংকরীর উপলব্ধীটা এরকম, ‘আপনি মানুষকে খাওয়ান, সে একদিনও মনে রাখবে না। কিন্তু বোবা প্রাণীগুলোকে দুদিন বিস্কুট খাওয়ান সে আপনার প্রতিদান কখনো ভুলবে না। আপনাকে খুঁজবে প্রতিদিন, ভালোবাসবে।’

