জাতিসংঘ অধিবেশন
‘জীবন-মরণ সিদ্ধান্ত মেশিনের হাতে নয়’, এআই নিয়ে গুতেরেস

জাতিসংঘ ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্কে উদ্বোধনী ভাষণ দেন গুতেরেস— রয়টার্স
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) লাগামহীন অগ্রগতি নিয়ে বিশ্বনেতাদের সামনে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। মানুষের জীবন-মরণের সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই মেশিনের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না বলে স্পষ্ট করেছেন তিনি। একই সঙ্গে এআইয়ের ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক নিয়ম, নিরাপত্তা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে মঙ্গলবার সকালে ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্কের উদ্বোধনী ভাষণে গুতেরেস এসব কথা বলেন। সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এআইয়ের পাশাপাশি গাজা, ইউক্রেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জলবায়ু সংকট, বৈশ্বিক বৈষম্য, আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। ৮১তম সাধারণ বিতর্ক ২২ সেপ্টেম্বর শুরু হয়ে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে।
এআই প্রসঙ্গে গুতেরেস বলেছেন, প্রযুক্তি মানুষের জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে এর বিকাশের সঙ্গে ঝুঁকিও দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে সামরিক ক্ষেত্রে এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি করা যাবে না, যেখানে মেশিন মানুষের জীবন-মরণের সিদ্ধান্ত নেবে। এআইকে নিরাপদ ও দায়িত্বশীল রাখতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর জোর দেন তিনি।
এরপর বিশ্বের যুদ্ধ ও সংঘাতের দিকে দৃষ্টি দেন জাতিসংঘ মহাসচিব। তার বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের পরিস্থিতি। তিনি বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা, মানবিক সহায়তার অবাধ প্রবেশ এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানান।
গাজা প্রসঙ্গে গুতেরেস বলেন, দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য রাজনৈতিক সমাধানের কোনো বিকল্প নেই। গাজায় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথ ধরে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন জাতিসংঘ মহাসচিব।
ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও দ্রুত যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, যুদ্ধের অবসান এবং একটি ন্যায়সংগত ও স্থায়ী শান্তির পথে যেতে জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনকে ভিত্তি করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়েও সতর্ক করেন গুতেরেস। তার বক্তব্যে জলবায়ু সংকটকে বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরা হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় আরও কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।
বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা বৈষম্য ও দারিদ্র্য নিয়েও উদ্বেগ জানান জাতিসংঘ মহাসচিব। তার মতে, উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছানো এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে গতি বাড়ানো জরুরি।
গুতেরেস একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার দুর্বলতার দিকটি তুলে ধরেন। তার মতে, বিশ্বে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে গেলেও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো সেই পরিবর্তনের সঙ্গে পুরোপুরি তাল মেলাতে পারেনি। জাতিসংঘসহ বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর ও প্রতিনিধিত্বশীল করার প্রয়োজন রয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার নিয়েও কঠোর অবস্থান জানান তিনি। জাতিসংঘ সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান ফিরিয়ে আনা এবং মানবাধিকার রক্ষাকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রে রাখার আহ্বান জানান।
এবারের অধিবেশন গুতেরেসের জাতিসংঘ মহাসচিব হিসেবে শেষ সাধারণ অধিবেশন। তার বর্তমান মেয়াদ ২০২৬ সালের শেষ দিকে শেষ হবে। বিদায়ী এই পর্যায়ে দাঁড়িয়ে তার বক্তব্যে তাই বর্তমান বিশ্বের সংকটের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার দিকনির্দেশনাও উঠে আসে।




