নাইন ইলেভেনের ২৫ বছর
এখন ঘরের ভয় তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে আমেরিকানদের

ছবি: রয়টার্স
সালটি ২০০১; যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ভয়ানক এক জঙ্গি হামলা কাঁপিয়ে তোলে গোটা বিশ্বকে। নিউ ইয়র্কের আকাশচুম্বী টুইন টাওয়ার ধসে পড়েছিল সেই হামলায়।
জঙ্গি সংগঠন আল কায়দার ১৯ জন আত্মঘাতী সদস্য চারটি বিমান ছিনতাই করে চালিয়েছিল ২০০১ সালের ৯ সেপ্টেম্বরের সেই হামলা। এর মধ্যে দুটি বিমান আঘাত হানে টুইন টাওয়ারে, তাতে নিহত হন বিশ্বের ৯০টি দেশের ২ হাজার ৭৫৩ জন নাগরিক।
সেই হামলাকারী হিসেবে যারা চিহ্নিত হয়েছিলেন, তাদের কেউ যুক্তরাষ্ট্রের ছিলেন না। বেশিরভাগই ছিলেন সৌদি আরবের নাগরিক। তাদের সঙ্গে ছিলেন মিসর, আরব আমিরাত, লেবাননিরা।
বিদেশি সন্ত্রাসীদের সেই হামলা আতঙ্কিত করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককে। ২৫ বছর গড়ালেও ভয় এখনো কাটেনি, তবে ভয়ের উৎস গেছে বদলে। এখন বিদেশি জঙ্গিগোষ্ঠীর হামলার চেয়ে নিজ দেশের ভেতরে গজিয়ে ওঠা উগ্রবাদীদেরই বেশি ভয় পাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ।
রয়টার্স/ইপসসের সাম্প্রতিক এক জরিপে এমন চিত্রই ফুটে উঠেছে। গত ২৮ থেকে ৩১ আগস্ট পরিচালিত ওই জরিপে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, সাধারণ আমেরিকানদের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি কোনটি?
তাতে ৩৩ শতাংশ উত্তরদাতা ‘দেশীয় সন্ত্রাসবাদ’কে সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে দেখার কথা বলেছেন। বিদেশি সন্ত্রাসবাদকে সবচেয়ে বড় হুমকি বলেছেন ২০ শতাংশ। আর ৪২ শতাংশের মতে, বন্দুক হামলার মতো নির্বিচার সহিংসতা সবচেয়ে বড় শঙ্কা।
অথচ এক দশক আগেও চিত্রটি ছিল ভিন্ন। ২০১৩ সালের মাঝামাঝি রয়টার্স/ইপসসের জরিপে ২৮ শতাংশ আমেরিকান বিদেশি সন্ত্রাসবাদকে সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে দেখেছিলেন। সেখানে দেশীয় উগ্রবাদীদের বড় হুমকি বলেছিলেন ২১ শতাংশ। তখনও সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিল নির্বিচার সহিংসতা, ৫১ শতাংশ মানুষ সেটিকেই বলেছিলেন প্রধান হুমকি।
চিন্তা-ভাবনার ধরনে এই পরিবর্তন বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হবে সেই ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সকালে। সেদিন যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের কাছে ‘বিদেশি সন্ত্রাসবাদ’ আর দূরের কোনো ভূরাজনৈতিক হুমকি ছিল না।
সেদিন সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে ছিনতাই করা আমেরিকান এয়ারলাইনসের যাত্রীবাহী বিমান ফ্লাইট ১১ নিউ ইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর টাওয়ারে আঘাত হানে। ৯টা ৩ মিনিটে, দ্বিতীয় বিমানটি আঘাত করে দক্ষিণ টাওয়ারে।
আর এর পরের ১০২ মিনিটে বদলে দেয় যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস। দুই টাওয়ারই ধসে পড়ে। ছিনতাই করা আরেকটি বিমান আঘাত হানে পেন্টাগনে সকাল ৯টা ৩৭ মিনিটে।
আর সকাল ১০টা ৩ মিনিটে ইউনাইটেড এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ৯৩ পেনসিলভানিয়ার একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়। যাত্রীদের প্রতিরোধের কারণে বিমানটি হোয়াইট হাউজের দিকে পৌঁছাতে পারেনি বলে ৯/১১ কমিশনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু নাইন-ইলেভেন নামে পরিচিত এই ঘটনা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এর আগে আল-কায়েদা ১৯৯৮ সালে কেনিয়া ও তানজানিয়ায় মার্কিন দূতাবাসে বোমা হামলা চালিয়েছিল। ২০০০ সালে ইয়েমেনের এডেন বন্দরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস কোল-এ হামলায় ১৭ মার্কিন নাবিক নিহত হন।
এসব হামলার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা সংস্থাগুলোর কাছে ২০০১ সালের আগেই আল-কায়েদার হুমকির বিষয়ে একাধিক সতর্কবার্তা পৌঁছেছিল। কিন্তু বাণিজ্যিক বিমানকে আত্মঘাতী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে একই সকালে একাধিক হামলা চালানোর মতো পরিস্থিতি হতে পারে, তা চিন্তা করতে পারেনি দেশটির নিরাপত্তা সংস্থাগুলো।
সেদিনের হামলা আমেরিকার নিরাপত্তা-ভাবনাকে আমূল বদলে দেয়। বিমানবন্দর থেকে গোয়েন্দা নজরদারি, সব ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। আকাশপথের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। বিমানবন্দরে যাত্রীদের তল্লাশি ও নিরাপত্তা পরীক্ষা আরও কঠোর হয়। একই সঙ্গে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে ওঠে।
নাইন-ইলেভেনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে তাদের ‘ওয়ার অন টেরর’ নামে খ্যাত সামরিক অভিযান শুরু করে। কারণ, হামলার মূল পরিকল্পনাকারী আল-কায়েদার নেতারা আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের আশ্রয়ে ছিল।
এরপর শুরু হয় দীর্ঘ যুদ্ধ। কয়েক বছরের মধ্যে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে অভিযান চালায়।
এই দুই যুদ্ধই শেষ পর্যন্ত ৯/১১-পরবর্তী আমেরিকায় সবচেয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করে। দুই দশকেরও বেশি সময় পরও যুদ্ধগুলোর মূল্য নিয়ে মার্কিন সমাজে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
রয়টার্স/ইপসসের সাম্প্রতিক জরিপে ৪৮ শতাংশ আমেরিকান বলেছেন, আফগানিস্তান যুদ্ধের যে মূল্য চুকাতে হয়েছে, তা সার্থক ছিল না। বিপরীতে ২১ শতাংশ মনে করেন, সেটি সার্থক ছিল। ইরাক যুদ্ধের ক্ষেত্রেও ৫১ শতাংশ মানুষ অসন্তোষ জানিয়েছেন, আর সমর্থন করেছেন ২১ শতাংশ।
অর্থাৎ নাইন-ইলেভেনের পর যে নিরাপত্তাভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘ যুদ্ধের দিকে নিয়ে গিয়েছিল, ২৫ বছর পর সেই নীতির ফল নিয়েই এখন দেশটির মানুষের বড় অংশের মধ্যে তৈরি হয়েছে সংশয়।
যুদ্ধে বিশাল খরচের বোঝা টানতে হচ্ছে মার্কিনদের। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের সহিংসতার অভিজ্ঞতাও।
গত দুই দশকে দেশটি একের পর এক অভ্যন্তরীন ব্যাক্তি বা গোষ্ঠীর হামলার সাক্ষী হয়েছে। ২০১৬ সালে ফ্লোরিডার একটি সমকামী নাইটক্লাবে বন্দুক হামলায় ৪৯ জন নিহত হন। কৃষ্ণাঙ্গ, লাতিনো ও ইহুদি সম্প্রদায়ের ওপরও বিভিন্ন সময়ে উগ্রবাদী হামলা হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেও একাধিক হত্যাচেষ্টার মুখে পড়েছেন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে উটাহতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সামনে বক্তব্য দেওয়ার সময় গুলিতে নিহত হন রক্ষণশীল কর্মী চার্লি কার্ক।
ফলে আমেরিকানদের কাছে সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞাতেও পরিবর্তন এসেছে। সাম্প্রতিক জরিপে ৬১ শতাংশ মানুষ বলেছেন, মতাদর্শ-প্রণোদিত হামলার ক্ষেত্রে দেশের ভেতরের উগ্রপন্থীরাই বড় হুমকি।
এর অর্থ এই নয় যে নাইন-ইলেভেনের স্মৃতি মুছে গেছে। বরং স্মৃতিটি এখনো মার্কিন সমাজে গভীর দাগ হিসেবে রয়ে গেছে। জরিপে ১০ জনের প্রায় ছয়জন বলেছেন, তারা মাঝেমধ্যে নাইন-ইলেভেনের হামলার কথা ভাবেন। একই সংখ্যক মানুষ বলেছেন, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে আবার বড় ধরনের হামলা হলে তারা সামরিক জবাবকে সমর্থন করবেন।
নিরাপত্তার প্রশ্নে নাইন-ইলেভেন পরবর্তী কিছু পরিবর্তনের প্রতি তাই মানুষের সমর্থন এখনও শক্তিশালী। প্রায় ৬০ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন, হামলার পর মার্কিন সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে হামলা ঠেকাতে অন্তত কিছুটা কার্যকর হয়েছে।
বিমানবন্দরের বাড়তি নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও দেশটির বড় দুই দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মনে করেন, ভ্রমণে বাড়তি ঝামেলা হলেও এই ব্যবস্থা রাখা সফল। ডেমোক্র্যাটদের ৭১ শতাংশ এবং রিপাবলিকানদের ৭৫ শতাংশ এ মত দিয়েছেন।
কিন্তু নিরাপত্তা আর ব্যক্তিস্বাধীনতার সীমারেখা নিয়ে একই ধরনের ঐকমত্য নেই। ২০০১ সালের পর মার্কিন গোয়েন্দা নজরদারি ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়েছিল। এখন ৬৫ শতাংশ আমেরিকান কোনো পরোয়ানা ছাড়াই মার্কিন নাগরিকদের ইলেকট্রনিক যোগাযোগ নজরদারির সুযোগ দেওয়ার বিরোধিতা করেন।
এখানেই নাইন-ইলেভেনের ২৫ বছর পরের আমেরিকার একটি বড় বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দেশটিকে এক মুহূর্তে ঐক্যবদ্ধ করা সেই হামলার পর নেওয়া দীর্ঘমেয়াদি সামরিক ও নিরাপত্তা নীতির সবকিছুকে এখন আর একইভাবে দেখা হচ্ছে না।
জরিপে ৭৫ শতাংশ আমেরিকান বলেছেন, নাইন-ইলেভেন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। ২০০৭-০৯ সালের আর্থিক সংকটের বড় প্রভাব ছিল বলে মনে করেন ৪১ শতাংশ।
আল কায়দা এখন অনেকটাই ভঙ্গুর। দলটির শীর্ষনেতা ওসামা বিন লাদেন ২০১১ সালে পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ডোদের এক অভিযানে নিহত হন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রবাসীর ভয় এখনও রয়ে গেছে। শুধু বদলেছে ভয়ের প্রকৃতি। ২০০১ সালে আমেরিকানদের চোখ ছিল দেশের বাইরে, আফগানিস্তানের ঘাঁটিতে থাকা আল-কায়েদা, আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্ক এবং বিদেশ থেকে আসা হুমকির দিকে। এখন ঘরে চোখ রাখতে হচ্ছে তাদের।





