আমেরিকানদের ৫ হাজার ডলার করে দেবেন ট্রাম্প, কী বলছেন সমর্থকরা

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ডালাসে রিপাবলিকান ন্যাশনাল মিডটার্ম কনভেনশনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
নির্বাচনে টাকার ছড়াছড়ি বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। ভোট এলে প্রায়ই ভোটারদের মন জিততে প্রার্থীদের টাকা বিতরণ করতে দেখা যায়। সেই ধারায় হাঁটতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও! ভোটারদের অর্থের লোভ দেখিয়ে ট্রাম্প বললেন, প্রত্যেক প্রাপ্ত বয়স্ক নাগরিককে তিনি পাঁচ হাজার ডলার করে দেবেন, যদি তার দল পুনরায় মধ্যবর্তী নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। তবে এ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে খোদ ট্রাম্প ভক্তরাই সন্দিহান।
যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় গত বুধবার ডালাসে রিপাবলিকান জাতীয় কনভেনশনে ট্রাম্প টাকা দেওয়ার এ ঘোষণা দিয়ে সবাইকে চমকে দেন। একসময় রিয়েলিটি টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব থাকার কারণে মানুষের মন জয় করার কৌশল তিনি ভালোই জানেন। তবে নানা কারণে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা দেশটিতে এখন পড়তির দিকে।
যুক্তরাষ্ট্রে নভেম্বরে হতে যাচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচন। তার আগে ভোটারদের মন জোগাতে ট্রাম্পের দেওয়া এ ঘোষণা বিতর্কের পাশাপাশি অবাক করেছে তার শিবিরকেও। তার কট্টর সমর্থকরাও এ প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দিহান।
ট্রাম্প বলেছেন, যদি রিপাবলিকানরা হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভ ও সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারে তাহলে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মার্কিনিকে ৫ হাজার ডরার করে দেওয়া হবে।
‘রিপাবলিকানরা যদি জিতে তাহলে আপনারাও জিতবেন’, যোগ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ট্রাম্পের এ উদ্যোগের পেছনে খরচ হতে পারে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার। যা মার্কিন অর্থনীতিতে চাপ বাড়াবে। উসকে দিতে পারে মুদ্রাস্ফীতিকেও। মূলত উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে এটি নিয়েই।
কীভাবে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবেন ট্রাম্প সে বিষয়ে যদিও স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। তবে কীভাবে খরচ করতে হবে তা বলে দিয়েছেন। বলেছেন, অর্থ অবশ্যই খরচ করতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই।
ট্রাম্পের ভাষণের পরপরই তার মিত্র সিনেটর বার্নি মোরেনো সেই প্রতিশ্রুতিকে আইনি রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে একটি বিল উত্থাপনের অঙ্গীকার করেছেন। যদিও সেই বিল পাসের সম্ভাবনা ক্ষীণ।
তবে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি বললেন, ট্রাম্প আসলে তার শুল্ক নীতির ফলে চাঙ্গা হওয়া ‘মার্কিন কর্মীদের জন্য এক ধরনের লভ্যাংশ’-এর কথাই বোঝাতে চেয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট মূলত যা বলছেন তা হলো—আপনারা যদি আমাদের ওপর আস্থা রাখেন, আমাদের ক্ষমতায় বহাল রাখেন এবং কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেন, তবে যুক্তরাষ্ট্রে আমরা যে বিপুল সম্পদ সৃষ্টি করছি, তার সুফল আপনারা নিজেরাও পাবেন।’
এ উদ্যোগকে অবশ্য ভ্যান্স বিতর্কিত ধারণা বলেও মনে করেন না।
তবে রাজনৈতিক মহলে ট্রাম্পের এ প্রতিশ্রুতি নিয়ে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ। এই লভ্যাংশ দেওয়ার বিষয়টি ফেডারেল আইন লঙ্ঘন করবে কি না তা নিয়েও অনেকে শঙ্কিত।
গাবি মাইকেলিস ডালাসের একজন রিসিপশনিস্ট। যিনি অন্য অনেকের সঙ্গে গতকাল বৃহস্পতিবার সম্মেলনস্থলের বাইরে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন। তার ভাষ্য, ‘আমার প্রথম ভাবনা ছিল ঘুষ দেওয়া তো বেআইনি।’
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুর দিকের একটি প্রতিশ্রুতির দিকে ইঙ্গিত করে এ তরুণী বললেন, তিনি আগেও এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে তা বাস্তবায়িত হয়নি।
প্রতিশ্রুতিতে বলা হয়েছিল, ফেডারেল সরকারের ব্যয়-সংকোচন থেকে প্রাপ্ত অর্থ মার্কিন নাগরিকদের নগদ অর্থ হিসেবে দেওয়া হবে।
টেক্সাসের রাইস শহরের বাসিন্দা স্টিভেন রবার্টস। তিনি অবসরপ্রাপ্ত টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ার। ট্রাম্পের ঘোষণায় তার মূল্যায়নও কিছুটা গাবির মতো। মৃদু হেসে তিনি বললেন, এটা অনেকটা ঘুষের মতো।
‘তিনি যদি এটা সফলভাবে করে দেখাতে পারেন, তবে আমার মতে সেটি দারুণ হবে’, যোগ করেন তিনি।
তবে এ ধরনের ঘোষণা কতটা বৈধ তা এখনও ধোঁয়াশাপূর্ণ। ট্রাম্পের সমর্থকরা একে অভিহিত করছেন, একটি সাধারণ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে। কিন্তু সমালোচকরা একে হালকাভাবে নিচ্ছেন না। বলছেন, এটি গণ্য হতে পারে ভোটকে প্রভাবিত করার একটি বেআইনি প্রচেষ্টা হিসেবে।
এদিকে ট্রাম্পের এ ‘ঘুষ’ দেওয়ার চেষ্টার নিন্দা করেছেন ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্রেট গভর্নর গ্যাভিন নিউসম। তার মতে, এটি করদাতাদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত অর্থ দিয়ে ভোট কেনার চেষ্টা।
৭৭ বছর বয়সী পিটার বোয়েন ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক। তিনি মনে করছেন, এই প্রতিশ্রুতি রিপাবলিকানদের সেই আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, যা সরকারি অনুদান বা সহায়তা নেওয়া বর্জন করে।
এ পরিকল্পনা যদি বৈধও হয় তবুও তিনি একে ‘ডেমোক্রেটদের মতো ধূর্ত প্রচেষ্টা’ হিসেবেই দেখবেন বলে জানান। তার ভাষ্য, কারণ তারা এটাই করে।
তবে টাকা দিলে তিনি নেবেন, এমনটাই জানিয়েছেন বোয়েন। তার কথা হলো, ‘যখন বিষয়টি শুনলাম তখন আমি হোহো করে হেসে ফেলেছি। তবে টাকা দিলে নিতে আমার কোনো সমস্যা নেই।’
বিক্ষোভে অ্যান্ডি ম্যাকউইলিয়ামস নামের একজন এসেছেন মিসৌরির কানসাস সিটি থেকে। ৬৪ বছর বয়সী এ মার্কিনির বিশ্বাস, ট্রাম্পের এ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হবে না।
তবে যদি টাকা দেওয়া হয় তাহলে এরজন্য যুক্তরাষ্ট্রকে চড়ামূল্যও দিতে হবে বলে সতর্ক করেছেন ম্যাকউইলিয়ামস।
ট্রাম্পের ভোটার ৫৫ বছর বয়সী রন্ডা ল। তিনি টেক্সাসের লুবকের বাসিন্দা। তিনি অংশ নিয়েছেন রিপাবলিকান পার্টির সম্মেলনে। কিন্তু ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতির বিষয়ে তার সামান্যই আস্থা আছে। এমনকি নভেম্বরে তিনি ডেমোক্রেটদের ভোট দেওয়ার কথা ভাবছেন বলে জানান।
৪৯ বছর বয়সী রিয়েল এস্টেট ব্রোকার বেকি রেনসিং সম্মেলনে চমৎকার বক্তব্যের জন্য ট্রাম্পকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন। কিন্তু টাকা দেওয়ার আলাপে তিনি সন্দিগ্ধ। তার মতে, ‘আমি এর পক্ষে নই। আমার মনে হয় না আমাদের পাঁচ হাজার ডলারের প্রয়োজন আছে।’
‘আমাদের প্রয়োজন জীবনযাপনের মৌলিক বিষয়গুলো। পাশাপাশি জীবনযাত্রার খরচ কমে আসা’, যোগ করেন বেকি।
সূত্র: আলজাজিরা



