ল্যাবেই তৈরি হবে সোনা!
- ফিউশন প্রযুক্তিতে সোনা উৎপাদনের দাবি স্টার্টআপের
- বছরে হাজার হাজার কেজি তৈরির সম্ভাবনা

সোনা তৈরির জন্য কি একদিন খনিতে যাওয়ার প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে? পরীক্ষাগারেই কি তৈরি হবে বহুমূল্য এই ধাতু? শত শত বছর ধরে মানুষের কল্পনায় থাকা এমন সম্ভাবনাই নতুন করে আলোচনায় এনেছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান।
সানফ্রান্সিসকোভিত্তিক স্টার্টআপ ম্যারাথন ফিউশনের দাবি, তারা পারদ থেকে স্থিতিশীল সোনা তৈরির পরীক্ষামূলক সাফল্য পেয়েছে। গত ২১ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটি এ ঘোষণা দেয়। তাদের ভাষ্য, গত সেপ্টেম্বরে ফিউশন বিক্রিয়ার নিউট্রন ব্যবহার করে এ পরীক্ষা চালানো হয়।
তবে ঘোষণাটিকে এখনই নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক সাফল্য বলা যাচ্ছে না। প্রতিষ্ঠানটি পরীক্ষার কিছু বর্ণনা ও বিকিরণ-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করলেও কতটুকু সোনা তৈরি হয়েছে, তার বিশুদ্ধতা কত এবং উৎপাদনে কী পরিমাণ ব্যয় হয়েছে, তা স্পষ্ট করেনি। স্বাধীন গবেষকরাও এখন পর্যন্ত ফলাফলটি নিশ্চিত করেননি।
কীভাবে পারদ থেকে তৈরি হবে সোনা?
পারদ ও সোনা দুটি আলাদা রাসায়নিক মৌল। সাধারণ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় পারদকে সোনায় রূপান্তর করা সম্ভব নয়। কারণ দুটি মৌলের পরমাণুর নিউক্লিয়াসে প্রোটনের সংখ্যা আলাদা। একটি মৌলকে অন্য মৌলে রূপান্তর করতে হলে নিউক্লিয়াসের গঠন বদলাতে হয়। এ প্রক্রিয়ার নাম পারমাণবিক রূপান্তর।
ম্যারাথন ফিউশনের প্রস্তাবিত প্রযুক্তিতে ব্যবহার করা হবে পারদ-১৯৮ নামের একটি নির্দিষ্ট আইসোটোপ। ফিউশন বিক্রিয়ায় উৎপন্ন উচ্চশক্তির নিউট্রন পারদ-১৯৮-এর নিউক্লিয়াসে আঘাত করলে তা পারদ-১৯৭-এ পরিণত হতে পারে। এরপর তেজস্ক্রিয় পারদ-১৯৭ প্রায় ৬৪ ঘণ্টার অর্ধায়ুতে ক্ষয় হয়ে স্থিতিশীল সোনা-১৯৭ তৈরি করতে পারে।
এ প্রক্রিয়ার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে কম্পিউটারভিত্তিক মডেল ও নিউট্রন বিক্রিয়ার হিসাব তুলে ধরেছিল। নতুন দাবি হলো, তারা সে ধারণার ভিত্তিতে পরীক্ষামূলকভাবে সোনা তৈরির প্রমাণ পেয়েছে। কিন্তু পরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ তথ্য ও স্বাধীন যাচাই ছাড়া সাফল্যের মাত্রা নির্ধারণ করা কঠিন।
বছরে হাজার হাজার কেজি সোনা তৈরির হিসাব
প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে আলোচিত দাবি উৎপাদনের সম্ভাব্য পরিমাণ নিয়ে। তাদের মডেল অনুযায়ী, ভবিষ্যতে বৃহৎ আকারের ফিউশন বিদ্যুৎকেন্দ্রে এই প্রযুক্তি যুক্ত করা গেলে বছরে কয়েক হাজার কেজি সোনা তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
২০২৫ সালের গবেষণাপত্রে প্রতি গিগাওয়াট তাপীয় ক্ষমতার ফিউশন কেন্দ্রে বছরে প্রায় দুই হাজার কেজি সোনা উৎপাদনের হিসাব দেওয়া হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা ধরে প্রতিষ্ঠানটি এর চেয়েও বেশি উৎপাদনের সম্ভাবনার কথা বলেছে। তবে এগুলো মডেলভিত্তিক হিসাব, বাস্তব বাণিজ্যিক উৎপাদনের ফল নয়।
সোনা তৈরির ঘটনা কি এই প্রথম?
না। পারমাণবিক প্রক্রিয়ায় সোনা তৈরির ঘটনা আগেও ঘটেছে। ইউরোপীয় পারমাণবিক গবেষণা সংস্থা সার্নের বিজ্ঞানীরা লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারে সিসার নিউক্লিয়াসের সংঘর্ষের মাধ্যমে অতি সামান্য পরিমাণ সোনার নিউক্লিয়াস তৈরির ঘটনা শনাক্ত করেছিলেন।
সার্নের ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫-১৮ সালের মধ্যে ওই পরীক্ষায় মোট প্রায় ২৯ পিকোগ্রাম সোনা তৈরি হয়েছিল। ১ গ্রাম সোনার তুলনায় এই পরিমাণ এতই নগণ্য যে, তা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করার কোনো সুযোগ ছিল না। সংঘর্ষের ফলে তৈরি সোনার নিউক্লিয়াসও দ্রুত ভেঙে যেত।
ম্যারাথন ফিউশনের দাবি এ কারণে আলোচনায় এসেছে, তাদের লক্ষ্য স্থিতিশীল সোনা তৈরি এবং উৎপাদনের হার বাড়ানো। প্রতিষ্ঠানটি সার্নের আগের রেকর্ডের তুলনায় ১০ গুণ বেশি উৎপাদন হারের দাবি করেছে।
সোনার বাজারে কি বড় পরিবর্তন আসবে?
প্রযুক্তিটি সফল হলে সোনা উৎপাদনের নতুন পথ খুলতে পারে। তবে এখনই খনিতে উত্তোলিত সোনার চাহিদা কমে যাবে; কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ধসে পড়বে, এমন ধারণার ভিত্তি নেই।



