যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে টাকার খেলা
- মাস্কের ৩৬৬, ট্রাম্পের ৪০০, ব্লুমবার্গের ৮০ মিলিয়ন ডলার!
- দুই দলের প্রচারে বিপুল অর্থ ব্যয়!
- প্রচারণা কার্যত শেষ হবে ভোটের দিন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আর দুই সপ্তাহও বাকি নেই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের চেয়ে কোনো অংশে কম নয় এর গুরুত্ব। এদিনের ভোটেই নির্ধারিত হবে কার নিয়ন্ত্রণে থাকবে কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট। আর এই নিয়ন্ত্রণ নিয়েই টাকার খেলায় মেতেছেন রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাটরা। রিপাবলিকানদের পক্ষে এরই মধ্যে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বিপুল অর্থ ব্যয়ের ঘোষণা করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইলন মাস্ক দিচ্ছেন ৩৬৬ মিলিয়ন ডলার। বিপরীতে ডেমোক্র্যাটদের প্রচারে ৮০ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ দিচ্ছেন মাইকেল ব্লুমবার্গ।
মাস্কের রাজনৈতিক অনুদান
চলতি নির্বাচনী প্রচারণায় ইলন মাস্কের রাজনৈতিক অনুদানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬৬ মিলিয়ন ডলারে। এর মধ্যে ২৭৬ মিলিয়ন ডলার দেওয়া হয়েছে রিপাবলিকান প্রার্থীদের সমর্থনে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনকে।
জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থীদের সমর্থক ‘সিনেট লিডারশিপ ফান্ডে’ মাস্ক ১৫৮ মিলিয়ন ডলার দেন। তার ‘আমেরিকা প্যাক’ও (পিএসি) নির্বাচনী প্রচারে অর্থ ব্যয় করছে। প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে সংগঠনটি ৭৬ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। এর মধ্যে ৩৫ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলার গেছে মাঠপর্যায়ে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগের কর্মসূচিতে।
জুলাইয়ের শেষ দিকে আমেরিকা পিএসিকে আবার সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সংগঠনটির কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলা, অনলাইন বিজ্ঞাপন এবং ডাকযোগে প্রচারসামগ্রী পাঠানো। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য রক্ষণশীল ভোটারদের নির্বাচনে অংশ নিতে উৎসাহিত করা।
ট্রাম্পের ৪০০ মিলিয়নের বাজি
গত মঙ্গলবার ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প জানিয়েছেন, নির্বাচনের দিন পর্যন্ত তার রাজনৈতিক তহবিল থেকে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ হবে। ৩০০ মিলিয়নের বেশি এরই মধ্যে খরচ হয়েছে বলে তার দাবি। বিজ্ঞাপন, ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ, সমাবেশ, ফোনভিত্তিক প্রচার ও ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে নেওয়ার কর্মসূচিতে এই অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। তবে কোন অঙ্গরাজ্যে বা আসনে কত যাবে, তার হিসাব তিনি দেননি। এই অর্থের বড় অংশ আসছে ট্রাম্পসমর্থিত সুপার প্যাক ‘ম্যাগা ইনকরপোরেটেড’ থেকে। আগস্ট শেষে সংস্থাটির হাতে প্রায় ৪১৫ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলার ছিল।
ডেমোক্র্যাটদের পাশে ব্লুমবার্গ
নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন (গত মঙ্গলবার) অনুযায়ী, নিউ ইয়র্কের সাবেক মেয়র মাইকেল ব্লুমবার্গ সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে ডেমোক্র্যাট তহবিলে দিচ্ছেন ৮০ মিলিয়ন ডলার। এই বিপুল অর্থের মধ্যে অন্তত ৫০ মিলিয়ন ডলার খরচ করা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের আসনগুলোতে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের জয় নিশ্চিত করতে। ডেমোক্র্যাটরা যেন প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে বা সংখ্যাগরিষ্ঠতা বাড়াতে পারে, সেটিই তার প্রধান লক্ষ্য।
২৪ মিলিয়ন পাবে বন্দুক নিয়ন্ত্রণের পক্ষের সংগঠন ‘এভরিটাউন ফর গান সেফটি’। আর ‘হাউজ মেজরিটি প্যাক’ পাবে ১৬ মিলিয়ন ডলার।
প্রচারণা কবে শুরু, কবে শেষ
কিছু অঙ্গরাজ্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরেই শুরু। যেমন নর্থ ক্যারোলাইনায় প্রার্থী নিবন্ধনের সময় ছিল ১ থেকে ১৯ ডিসেম্বর। সিনেট ও হাউজের প্রাইমারি ৩ মার্চ শুরু হয়ে ১৯৬ দিন পর ডেলাওয়্যারে শেষ হয়। এর মাধ্যমে দুই দল নিজেদের প্রার্থী বেছে নিয়েছে।
ভার্জিনিয়ায় আগাম ভোট শুরু হয়েছে, যা ভোটের শেষ ছয় সপ্তাহের সূচনা। ক্যালিফোর্নিয়ার কিছু কেন্দ্রে ৫ অক্টোবর থেকে আগাম ভোট শুরু হয়েছে, আর টেক্সাসে শুরু হয়েছে ১৯ অক্টোবর। প্রচারণা কার্যত শেষ হবে ৩ নভেম্বর নির্বাচনের দিন। কিছু অঙ্গরাজ্যে আগাম ভোট তার আগেই শেষ হবে।
অর্থ ব্যয় হচ্ছে কোথায়?
নির্বাচনী প্রচারের অর্থ সাধারণত বিজ্ঞাপন, প্রচারকর্মীদের মজুরি, ফোনকল, টেক্সট বার্তা, প্রচারপত্র ছাপানো, ডাকযোগে চিঠি পাঠানো এবং ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগে ব্যয় হয়। প্রার্থী ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলো নিজেদের কৌশল এবং নির্বাচনী এলাকার পরিস্থিতি অনুযায়ী অর্থ বরাদ্দ করে। বিপুল অর্থ ব্যয় প্রচারের পরিসর বাড়াতে পারে; কিন্তু তা নিজে থেকেই ভোটে জয় নিশ্চিত করে না। কোন এলাকায় অর্থ ব্যয় হচ্ছে, প্রচারের বার্তা কতটা কার্যকর হচ্ছে এবং ভোটারদের প্রধান উদ্বেগ কী— এসব বিষয়ও ফলাফলে ভূমিকা রাখতে পারে।
টাকা কি ভোটারদের হাতে দেওয়া হচ্ছে?
রাজনৈতিক প্রচারের অর্থ সরাসরি ভোটারদের নগদ দেওয়ার জন্য ব্যবহার হচ্ছে না। সাধারণত এসব অর্থ ভোটারদের কাছে রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছানো এবং তাদের ভোট দিতে উৎসাহিত করার কাজে ব্যয় করা হয়। প্রচারণায় নিয়োগ করা কর্মীরা তাদের কাজের জন্য মজুরি পান। এটি ভোট দেওয়ার বিনিময়ে ভোটারকে অর্থ দেওয়ার সমতুল্য নয়। যুক্তরাষ্ট্রে ভোটের বিনিময়ে ঘুষ দেওয়া আইনত নিষিদ্ধ।
নির্বাচনের গুরুত্ব
মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে ভোট হয় না। তবে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ বদলে গেলে প্রেসিডেন্টের বাকি মেয়াদের রাজনৈতিক সমীকরণে পরিবর্তন আসতে পারে। কোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ বিরোধী দলের হাতে গেলে আইনপ্রণয়ন, বাজেট এবং প্রশাসনের ওপর কংগ্রেসের নজরদারির ক্ষেত্রে নতুন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
গত মঙ্গলবার প্রকাশিত এক জরিপ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে ট্রাম্পের কাজের প্রতি সমর্থন ৩১ শতাংশে নেমে আসার কথা বলা হয়েছে। অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও অভিবাসননীতি ভোটারদের আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে। তবে জনমত জরিপের ফল সময়, নমুনা ও পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে; একে নির্বাচনের ফলাফলের নিশ্চিত পূর্বাভাস হিসেবে দেখা যায় না।
মাস্ক, ট্রাম্প ও ব্লুমবার্গের অর্থায়ন নির্বাচনী প্রচারের আর্থিক দিকটি সামনে এনেছে। তবে এই অর্থ ভোটের ফল কতটা বদলাবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সরকারি নীতি, প্রার্থীদের অবস্থান, স্থানীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতাসহ একাধিক বিষয় ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। নিউ ইয়র্ক টাইমস, রাইটার্স, ট্রুথ সোশ্যাল



