ট্রাম্পে মোহভঙ্গ তরুণ-লাতিনোদের চাপে রিপাবলিকানরা!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘আমি যে আশা নিয়ে ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলাম, তার কিছুই পূরণ হয়নি। তিনি বলেছিলেন, আমেরিকানদের অগ্রাধিকার দেবেন, কর্মসংস্থান বাড়াবেন এবং অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবেন। বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখিনি। তাই আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ভোট দেওয়ার কথা ভাবছি না।’
আগামীর সময়কে দেওয়া মার্কিন নাগরিক জর্জের এ বক্তব্যে উঠে এসেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি হতাশার কথা। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন তিনি। প্রত্যাশা ছিল, নতুন প্রশাসনের অধীনে চাকরির সুযোগ বাড়বে, নিত্যপণ্যের খরচে স্বস্তি আসবে এবং সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক চাপ কমবে। নিজের অভিজ্ঞতায় সেই পরিবর্তন না দেখে এবার ভোটের সিদ্ধান্ত বদলানোর কথা বলছেন জর্জ।
ট্রাম্পকে ভোট দিয়ে পরে অনুতপ্ত হওয়া মানুষের মধ্যে অসন্তোষের ইঙ্গিত মিলেছে সাম্প্রতিক কয়েকটি জরিপেও। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে অর্থনীতি, চাকরির বাজার ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে হতাশা দেখা যাচ্ছে। লাতিনো ভোটারদের মধ্যেও ট্রাম্পের কাজের অনুমোদন কমেছে। এই মনোভাব আগামী ৩ নভেম্বর মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে।
তরুণদের মধ্যে অনুশোচনা
গবেষণা প্রতিষ্ঠান নেভিগেটর রিসার্চের ১৬ অক্টোবর প্রকাশিত ‘বায়ার্স রিমোর্স: জেনজি অন ট্রাম্প’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া জেন-জি ভোটারদের ৩৫ শতাংশ এখন নিজেদের সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুতপ্ত। মিলেনিয়ালদের মধ্যে এই হার ২৪, জেন-এক্সের মধ্যে ১৬ এবং বেবি বুমারদের মধ্যে ৮ শতাংশ।
তরুণদের প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতার ব্যবধান এখানে গুরুত্বপূর্ণ। চাকরির বাজারে প্রবেশের প্রতিযোগিতা, বাসা ভাড়া ও অন্যান্য দৈনন্দিন ব্যয় তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। নির্বাচনী প্রচারণায় অর্থনৈতিক স্বস্তি ও কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি যাদের আকৃষ্ট করেছিল, তাদের একাংশ এখন সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব ফল খুঁজছে।
আইটি খাতে চাকরি নিয়ে প্রশ্ন
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক ও ইঞ্জিনিয়ার ইফতেখার আলমও কর্মসংস্থান নিয়ে হতাশার কথা জানিয়েছেন আগামীর সময়ের এ প্রতিবেদককে। ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে আমেরিকান কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়া এবং চাকরির সুযোগ বাড়ানোর প্রত্যাশা কাজ করেছিল বলে জানিয়েছেন তিনি।
ইফতেখার বললেন, ‘আমরা যারা ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলাম, তাদের অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা ছিল, তিনি আমেরিকানদের অগ্রাধিকার দেবেন। বিশেষ করে চাকরির বাজারে আমেরিকানদের সুযোগ বাড়াবেন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবেন। বরং হাজার হাজার মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। তাই আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সময় এসব বিষয় অবশ্যই আমার বিবেচনায় থাকবে।’
পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতার উদ্বেগ
অভিবাসননীতিও কিছু ভোটারের হতাশার আরেকটি কারণ। বিশেষ করে পরিবারের সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রে আনার অপেক্ষায় থাকা নাগরিকদের কাছে ভিসা প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ব্যক্তিগত ও পারিবারিক অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক নাজমুল হোসেন আগামীর সময়কে বললেন, তিনি মার্কিন নাগরিক হিসেবে স্ত্রীর জন্য অভিবাসনের আবেদন করেছেন। দুই বছর ধরে স্ত্রীর সাক্ষাৎকারের অপেক্ষায় রয়েছেন। একবার সাক্ষাৎকারের তারিখ নির্ধারণ করা হলেও নির্ধারিত দিনের মাত্র ১০ দিন আগে তা বাতিল করা হয়।
যুদ্ধ ও মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব
নেভিগেটর রিসার্চের সেপ্টেম্বরের জরিপে ট্রাম্পকে ভোট দিয়ে পরে অনুতপ্ত হওয়া ভোটারদের কাছে তাদের অসন্তোষের কারণ জানতে চাওয়া হয়। তাদের ৪৫ শতাংশ ইরান যুদ্ধ ও পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্তের কথা বলেছেন। ৪৩ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয়কে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। স্বাস্থ্যসেবায় কাটছাঁট এবং প্রশাসনের অগ্রাধিকার নিয়েও উদ্বেগ উঠে এসেছে।
এই ফলাফল থেকে বোঝা যায়, অনুতপ্ত ভোটারদের অসন্তোষ একক কোনো বিষয়ে সীমাবদ্ধ নয়। পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আপত্তির পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনের খরচ তাদের মূল্যায়নে জায়গা করে নিয়েছে।
লাতিনো ভোটারদের সমর্থনে ভাটা
২০২৪ সালের নির্বাচনে লাতিনো ভোটারদের একটি অংশের সমর্থন ট্রাম্পের জয়ের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু তার দ্বিতীয় মেয়াদে কাজের মূল্যায়নে এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের ১৬ অক্টোবর প্রকাশিত জরিপ অনুযায়ী, নিবন্ধিত লাতিনো ভোটারদের ২৪ শতাংশ ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজের অনুমোদন দিয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই হার ছিল ৩৮ শতাংশ।
অসন্তোষ মানেই দলবদল নয়
ট্রাম্পের কাজ নিয়ে অসন্তোষ বাড়লেও তার সাবেক সমর্থকরা সবাই যে ডেমোক্র্যাটদের দিকে চলে গেছে, জরিপে এমন চিত্র নেই। পিউ রিসার্চ সেন্টারের সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া হিস্পানিকদের ৬৫ শতাংশ এখনো তাদের কংগ্রেসীয় আসনে রিপাবলিকান প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার কথা বলেছে। ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে সমর্থনের কথা বলেছে ১১ শতাংশ। বাকিদের কেউ অন্য প্রার্থীকে সমর্থন করেছে, কেউ এখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
৩ নভেম্বরের পরীক্ষায় কী হবে
মধ্যবর্তী নির্বাচনে তরুণ ও লাতিনো ভোটারদের মনোভাব বিশেষ করে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। অর্থনীতি, চাকরি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ যদি ভোটের সিদ্ধান্তে রূপ নেয়, তাহলে রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য তা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তবে জরিপের ফল দিয়ে নির্বাচনের ফল নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
ভোটারদের উপস্থিতি এবং শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্তও ফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে।
ট্রাম্পের জন্য তাই প্রশ্ন শুধু তার আগের সমর্থকরা এখন তাকে কতটা পছন্দ করেন, তা নয়। সেই অসন্তোষ কংগ্রেস নির্বাচনে দলীয় ভোটের হিসাব বদলায় কি না, সেটিই হবে ৩ নভেম্বরের বড় পরীক্ষা।



