ভেনেজুয়েলার অর্ধেক তেল এখন যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে
- তেল বিক্রির অর্থ জমা ওয়াশিংটনে
- জমা অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন

ভেনেজুয়েলার মারাকাইবো শহরের দক্ষিণে মারাকাইবো হ্রদের পশ্চিম তীরে বাজো গ্রান্দে টার্মিনালে ভোরের আলোয় তেলবাহী ট্যাংকার। ছবি : রয়টার্স
ভেনেজুয়েলা বর্তমানে যে পরিমাণ তেল উৎপাদন করছে, তার প্রায় অর্ধেকই যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হচ্ছে। দেশটির মোট দৈনিক উৎপাদন প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল। এর মধ্যে ৫ লাখের বেশি ব্যারেল যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে।
চলতি বছরে শুরুতে কারাকাসের নিজ বাসভবন থেকে গভীর রাতে বিশেষ এক অভিযানে সমাজতান্ত্রিক নেতা নিকোলাস মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে তুলে আনা হয়। মার্কিন আধিপত্যবাদ বিরোধী এ নেতাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর কয়েক মাস পর এমন খবর সামনে আসল।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে এক জ্বালানি শিল্পবিষয়ক অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানিয়েছেন দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী কাইল হস্টভেইট।
তিনি বলেছেন, ভেনেজুয়েলার তেল এমন কিছু শোধনাগারে যাচ্ছে, যেগুলো বিশেষভাবে এই ধরনের অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের জন্য তৈরি।
ভেনেজুয়েলার তেল ভারী ও সালফারযুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় উপকূলের বেশ কিছু শোধনাগার এই ধরনের তেল পরিশোধনের জন্য তৈরি। ফলে ভেনেজুয়েলা থেকে আবার তেল আমদানি শুরু হওয়ায় এসব শোধনাগার সরাসরি লাভবান হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার তেলের মজুত বিশ্বের সবচেয়ে বড়। দেশটিতে আনুমানিক ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল তেল রয়েছে। এটি বিশ্বের মোট প্রমাণিত মজুতের প্রায় ১৭ শতাংশ।
তবে দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ ঘাটতি ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির উৎপাদন অনেক কমে গিয়েছিল। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহে ভেনেজুয়েলার অংশ ছিল প্রায় ১ শতাংশ।
২০২৫ সালের শেষ দিকে দেশটি দৈনিক প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করছিল। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছিল প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার ব্যারেল।
হস্টভেইট বলেছেন, ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বাড়াতেও যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা করছে। এর অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রতিদিন ১ লাখের বেশি ব্যারেল ন্যাফথা ভেনেজুয়েলায় পাঠানো হচ্ছে। ভারী অপরিশোধিত তেলের সঙ্গে এটি মিশিয়ে ব্যবহার করা হয়।
এই ব্যবস্থাকে ‘সুন্দর জ্বালানি অংশীদারত্ব’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন হস্টভেইট। তার দাবি, এই বাণিজ্যের মাধ্যমে দুই দেশই লাভবান হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে ভেনেজুয়েলার কর্মকর্তারাও উৎপাদন আরও বাড়ানোর আশাবাদ জানিয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএর ভাইস প্রেসিডেন্ট জোভান্নি মার্টিনেজ বলেছেন, আগস্টের শেষ নাগাদ দেশটির দৈনিক তেল উৎপাদন ১২ লাখ ৪৫ হাজার ব্যারেলে পৌঁছাবে। চলতি বছরে তেল রপ্তানি বেড়েছে ১৯ দশমিক ৭ শতাংশ।
একই সময়ে জ্বালানি উৎপাদন বেড়েছে ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি সরবরাহও বেড়েছে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ।
মার্টিনেজ বলেছেন, ‘আমরা জ্বালানি খাতে বড় ধরনের সংস্কারের চেষ্টা করেছি। এখন আমরা উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাস্তব ফল দেখতে চাই।’
তিনি আরও বলেছেন, ভেনেজুয়েলার শোধনাগারগুলো উন্নত, আধুনিক ও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। ভারী অপরিশোধিত তেলের জন্য প্রয়োজনীয় তরলীকরণ উপাদানও দেশে উৎপাদন করা দরকার।
ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বাড়তে শুরু করেছে এমন এক সময়ে, যখন দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পর যুক্তরাষ্ট্র বলেছিল, তারা ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ ব্যবস্থাপনা করবে।
গভীর রাতে আকস্মিক অভিযানে মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রে তুলে আনার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ভেনেজুয়েলার তেল থেকে পাওয়া অর্থ তার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এই অর্থ ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের স্বার্থে ব্যবহারের কথা বলেছিলেন তিনি।
পরে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মার্কিন কংগ্রেসকে জানিয়েছিলেন, ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রির অর্থ এমন একটি হিসাবে জমা হবে, যেটির ওপর যুক্তরাষ্ট্র নজরদারি করবে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, কারাকাস প্রতি মাসে ওই হিসাব থেকে অর্থ ব্যবহারের জন্য বাজেট চাইবে। কোন খাতে ওই অর্থ ব্যবহার করা যাবে না, সেটিও আগেই নির্ধারণ করে দেবে ওয়াশিংটন।
জুলাইয়ে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছিল, চলতি বছর ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ১৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি রাজস্ব পেয়েছে।
২৭ জুলাই এ প্রতিবেদন নিয়ে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, প্রকৃত অর্থের পরিমাণ আরও বেশি।
তবে ওই অর্থের কী হয়েছে, সে বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন এখনো বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
এপ্রিল মাসে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা কংগ্রেসকে জানিয়েছিলেন, ভেনেজুয়েলার জন্য প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস জুনে বলেছিল, ট্রাম্প প্রশাসন বারবার দাবি করছে যে ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানির নিয়ন্ত্রণ দুই দেশেরই উপকার করছে।
কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির মতে, যুক্তরাষ্ট্র কত তেল বিক্রি করেছে, কত রাজস্ব পেয়েছে এবং সেই অর্থ কীভাবে ব্যবহার করেছে—এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
ভেনেজুয়েলার সোনা ও অন্যান্য খনিজ সম্পদ থেকে পাওয়া অর্থের ক্ষেত্রেও একই ধরনের স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে।
কারাকাসের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজকে আলোচনার বাইরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বর্তমানে মাদুরোর ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেসলি রদ্রিগেজের নেতৃত্বে ওই অন্তর্বর্তী সরকার চলছে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস বলেছে, জবাবদিহির ব্যবস্থা ও স্পষ্ট গণতান্ত্রিক রোডম্যাপ না থাকলে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় একটি দুর্নীতিগ্রস্ত উত্তরসূরি সরকারকে আরও শক্তিশালী করে তোলার ঝুঁকি তৈরি করছে।
এদিকে ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলগুলোও নিজেদের রাজনৈতিক রোডম্যাপ সামনে এনেছে। নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদোসহ বিরোধী নেতারা মে মাসে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের একটি নতুন পরিকল্পনায় সম্মত হয়েছেন।
সূত্র : আলজাজিরা







