অভিবাসী শিশুদের মুক্তির দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে আইনজীবীদের লড়াই
- ১৯০০ শিশুর পাশে ৫০টির বেশি আইনি সংগঠন

যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন হেফাজতে থাকা প্রায় ১ হাজার ৯০০ শিশুর মুক্তির দাবিতে সরাসরি আইনি লড়াইয়ে নেমেছেন দেশটির আইনজীবীরা। ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসন নীতির মধ্যে শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি হেফাজত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ৫০টির বেশি আইনি সংগঠন, আইন কার্যালয় ও অধিকারকর্মী সংগঠন।
শিশুদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে করা হচ্ছে একের পর এক ফেডারেল মামলা। আইনজীবীদের এই সমন্বিত উদ্যোগের নাম ‘চিলড্রেনস ডিউ প্রসেস প্রজেক্ট’। প্রকল্পটির আওতায় অভিবাসন হেফাজতে থাকা শিশুদের পক্ষে বিনা পারিশ্রমিকে মামলা পরিচালনা করা হচ্ছে।
প্রকল্পটি ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে নীরবে যাত্রা শুরু করে। এরপর গত কয়েক মাসে এতে অংশ নেওয়া আইনি সংগঠনের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে।
আইনজীবীদের প্রধান হাতিয়ার হেবিয়াস করপাস আবেদন। এর মাধ্যমে তারা আদালতের কাছে প্রশ্ন তুলছেন—আইনি কারণ ছাড়াই দীর্ঘ সময় ধরে শিশুদের সরকারি হেফাজতে রাখা হচ্ছে কি না।
৮ জুন ২০২৬-এ আমেরিকান বার অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে দীর্ঘমেয়াদি অফিস অব রিফিউজি রিসেটেলমেন্ট(ওআরআর) হেফাজতে থাকা অভিবাসী শিশুদের নিয়ে ফেডারেল মামলার কৌশল বিষয়ে একটি প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ‘চিলড্রেনস ডিউ প্রসেস প্রজেক্ট’-এ প্রো-বোনো আইনজীবীদের যুক্ত করার প্রক্রিয়া এগোয়।
৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত এই আইনি উদ্যোগে ৫০টির বেশি সংগঠন যুক্ত হয়েছে। লক্ষ্য—হেফাজতে থাকা প্রতিটি শিশুর জন্য আইনি প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং সম্ভব হলে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের শেষ দিকে প্রায় ১ হাজার ৯০০ অভিভাবকহীন অভিবাসী শিশু ফেডারেল সরকারের হেফাজতে ছিল। তাদের অনেকেই সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র অথবা দীর্ঘমেয়াদি পালক পরিচর্যায় রয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে হেফাজতের মেয়াদ নিয়ে। তথ্য অনুযায়ী, এসব শিশুর হেফাজতে থাকার গড় সময় প্রায় ১৮৩ দিন—অর্থাৎ প্রায় ছয় মাস।
আইনজীবীদের দাবি, অনেক শিশুর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে যাচাই করা স্বজন বা সম্ভাব্য অভিভাবক থাকা সত্ত্বেও তাদের হেফাজত থেকে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে না। এ কারণে ফেডারেল আদালতে হেবিয়াস করপাস আবেদন করা হচ্ছে।
আইনজীবীদের যুক্তি, নিরাপদ পারিবারিক আশ্রয় এবং উপযুক্ত অভিভাবক যাচাই হয়ে যাওয়ার পরও শিশুদের সরকারি হেফাজতে রাখার আইনি ভিত্তি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
এদিকে অভিবাসন অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন নীতিতে শিশুদের পরিবার বা সম্ভাব্য অভিভাবকের কাছে হস্তান্তর প্রক্রিয়া আরও কঠিন হয়েছে।
বিশেষ করে তথ্য আদান-প্রদানের বিষয়টি নতুন জটিলতা তৈরি করেছে। আইনজীবীদের আশঙ্কা, শিশুদের দায়িত্ব নিতে এগিয়ে আসা স্বজন বা সম্ভাব্য অভিভাবকদের ব্যক্তিগত তথ্য অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছাতে পারে। এতে তাদের বিরুদ্ধে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইস) পদক্ষেপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ফলে একদিকে শিশুদের মুক্তির জন্য আইনি চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে পরিবারগুলোর মধ্যে তৈরি হচ্ছে অভিবাসন কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ।
প্রশাসনের অবস্থান—শিশুদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই মুক্তি ও পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু আইনজীবীদের পাল্টা প্রশ্ন, নিরাপত্তার নামে উপযুক্ত অভিভাবক যাচাই হয়ে যাওয়ার পরও কতদিন একটি শিশুকে সরকারি হেফাজতে রাখা যাবে?
ইতোমধ্যে কয়েকটি মামলায় ফেডারেল বিচারকেরা শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি হেফাজতের কারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
ফলে বিষয়টি এখন শুধু শিশুদের মুক্তির মামলা নয়; এটি ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতি, ফেডারেল সরকারের হেফাজত ক্ষমতা এবং শিশুদের পারিবারিক পুনর্মিলনের অধিকার—তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে একই আদালতে এনে দাঁড় করিয়েছে।
৫০টির বেশি আইনি সংগঠনের সমন্বিত লড়াইয়ে এখন নজর ফেডারেল আদালতের দিকে। প্রশ্ন—কঠোর অভিবাসন নীতির আওতায় শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি হেফাজতের বৈধতা কতটা টেকে।
সুত্র: দ্য গার্ডিয়ান ,আমেরিকান বার অ্যাসোসিয়েশন ,যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগ (এইচএইচএস) / অফিস অব রিফিউজি রিসেটেলমেন্ট (ওআরআর)





