সৌদিতে হুতিদের হামলা প্রবাসীদের কপালে ভাঁজ

সৌদি আরবের রিয়াদের দক্ষিণে অবস্থিত আরামকো তেল শোধনাগারে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর অগ্নিকাণ্ডের ফলে ধোঁয়া উড়ছে। ছবিটি ৩ অক্টোবরের। ছবি: রয়টার্স
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধের আগুন এবার সরাসরি আঘাত হানল সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রাণ হারালেন তিন সৌদি নাগরিক, আহত হলেন কয়েকজন বিদেশি। ক্ষতিগ্রস্ত হলো সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান সংস্থা সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের একটি উড়োজাহাজ। এ নিয়ে পরপর দুই দিন সৌদি আরবের বিমানবন্দরে হামলায় ছয়জন মারা গেলেন। এসব হামলার পরপরই বিমান চলাচলে বিপর্যয়, ইয়েমেনে পাল্টা বিমান হামলা এবং সৌদি আকাশসীমায় ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সতর্কতা— সব মিলিয়ে সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, ইরানকে ঘিরে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ কি এখন গোটা উপসাগরীয় অঞ্চলকে আরও গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে? আর সেই অস্থিরতার অর্থনৈতিক ও মানবিক অভিঘাত কতটা এসে পড়তে পারে বাংলাদেশে? এরইমধ্যে সৌদি আরবে থাকা কয়েকজন বাংলাদেশি প্রবাসী সেখানে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তার কথা জানিয়েছেন।
সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের বরাতে আলজাজিরা ও এপি জানিয়েছে, স্থানীয় সময় গত বৃহস্পতিবার দেশটির রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের স্থাপনা এবং সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের একটি উড়োজাহাজে হামলা হয়। এতে তিন সৌদি নাগরিক নিহত হন এবং বিভিন্ন দেশের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। প্রথম হামলায় বিমানবন্দরের স্থাপনা এবং দ্বিতীয় হামলায় সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের একটি উড়োজাহাজকে লক্ষ্যবস্তু হয়।
আগামীর সময়ের সৌদি আরব প্রতিনিধি জানিয়েছেন, হামলায় নিহতদের মধ্যে দেশটির জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থা সৌদিয়া এয়ারলাইন্সের ক্যাপ্টেন হামুদ বিন আলী আল-কালথামিও ছিলেন। ক্ষতিগ্রস্ত উড়োজাহাজটিতে হামলার সময় কোনো যাত্রী ছিলেন না বলে সৌদিয়া জানিয়েছে। হামলার কারণে উল্লেখযোগ্য বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতি হলেও পরে বিমানবন্দরের কার্যক্রম আবার চালু করা হয়।
এক শোকবার্তায় সৌদিয়া জানিয়েছে, জাতীয় বিমান সংস্থায় কর্মজীবনজুড়ে ক্যাপ্টেন হামুদ বিন আল-কালথামির অবদান গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করা হবে। সহকর্মীদের মনে তার রেখে যাওয়া স্মৃতির কথাও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
ইয়েমেনভিত্তিক ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিরা হামলার দায় স্বীকার করেছে। তাদের দাবি, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে রিয়াদের বিমানবন্দরকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তবে হামলার প্রতিটি পর্যায়, ব্যবহৃত অস্ত্রের ধরন এবং ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ বিবরণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ঘটনাটির গুরুত্ব শুধু প্রাণহানি বা অবকাঠামোগত ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর একটি দেশের যোগাযোগ, বাণিজ্য, পর্যটন ও জরুরি পরিবহনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেখানে হামলা হলে সামরিক সংঘাতের প্রভাব দ্রুত সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ে।
রিয়াদে হামলার পর সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায়। ইয়েমেনের রাজধানী সানায় রাতভর বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। হুতি-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্রের দাবি, কয়েকটি হামলায় অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। এসব দাবির সবকিছু স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরব ও তার মিত্রদের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযানের পর হুতিদের হামলা আরও তীব্র হয়েছে। ফলে এক পক্ষের আক্রমণের জবাবে অন্য পক্ষের পাল্টা আঘাতের একটি চক্র তৈরি হচ্ছে।
এখানে বড় উদ্বেগ হলো, সংঘাতটি শুধু সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে কি না। ইরানকে ঘিরে বৃহত্তর যুদ্ধ, উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক তৎপরতা এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা—সবকিছু এখন পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। নতুন কোনো পক্ষ সরাসরি যুদ্ধে জড়ালে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তবে এই মুহূর্তে সংঘাতের পরবর্তী বিস্তার নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
এদিকে রিয়াদে হামলার পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের এভিয়েশন সেফটি এজেন্সি (ইএএসএ) সৌদি আরবের আকাশসীমা নিয়ে সতর্কতা আরও বিস্তৃত করেছে। সংস্থাটির ৩০ সেপ্টেম্বর জারি করা এবং পরে হালনাগাদ করা সংঘাত-সংক্রান্ত নির্দেশনায় বলা হয়েছে, হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ভৌগোলিক পরিসর বেড়েছে। রিয়াদসহ সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ এলাকায় হামলার সক্ষমতা ও প্রতিশোধের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ইএএসএ-এর উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে বেসামরিক উড়োজাহাজের নিরাপত্তা। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের গতিপথ, সেগুলো প্রতিহত করার সময় আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যক্রম এবং আকাশ থেকে পড়া ধ্বংসাবশেষ—সবকিছুই যাত্রীবাহী উড়োজাহাজের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এক্ষেত্রে ভুল শনাক্তকরণের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এ কারণে সংস্থাটি নির্দিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় উড়োজাহাজ পরিচালনা না করার সুপারিশ করেছে এবং অন্য এলাকায় চলাচলের ক্ষেত্রে সতর্কতা, নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়ন ও বিকল্প পরিকল্পনা রাখার কথা বলেছে। এটি সৌদি আরবের সব আকাশসীমা বন্ধের ঘোষণা নয়; বরং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিমান পরিচালনা নিয়ে একটি নিরাপত্তা নির্দেশনা।
এই সতর্কতা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যুদ্ধের প্রভাব এখন শুধু সামরিক স্থাপনা বা সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই। বিমানবন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো ও বাণিজ্যিক পরিবহনব্যবস্থাও ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
বাংলাদেশের ওপর কী প্রভাব
সৌদি আরবে বিমানবন্দরসহ বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হুতিদের হামলার নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ। এ ধরনের হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘সৌদি আরবে বিমানবন্দরসহ বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হুতিদের সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় বাংলাদেশ তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে। এ ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং তা নিরপরাধ মানুষের জীবন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।’
সৌদি আরবে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশে তার প্রভাব বেশ কয়েকভাবে পড়তে পারে— এর মধ্যে অন্যতম প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা। সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত। বিমানবন্দর, জ্বালানি স্থাপনা বা অন্যান্য বেসামরিক অবকাঠামোর আশপাশে হামলা বাড়লে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হবে। কর্মস্থলে যাতায়াত, নিয়মিত কাজ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে স্থানান্তরের ব্যবস্থাও জটিল হতে পারে।
রিয়াদে প্রায় এক যুগ ধরা কাজ করা লক্ষ্মীপুর রামগঞ্জের বাসিন্দা মোক্তার হোসেন আগামীর সময়কে বলেছেন, কিছুদিন ধরে রিয়াদ ও আশপাশের এলাকায় হামলা বাড়ছে। এতে শুধু বাংলাদেশি শ্রমিকই নয়, এখানে থাকা প্রায় সব দেশের শ্রমিকদের মধ্যেই নিরাপত্তাহীনতা কাজ করছে। এর আগে সৌদি আরবে ইরানের এক হামলায় বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
আরেক প্রবাসী ফারুক বললেন, ‘বাসা থেকে কাজে বের হলে আগে এসব নিয়ে ভাবতে হত না। কিন্তু ইদানিং যেভাবে হামলা হচ্ছে, কখন কী হয় বলা যায় না। সব সময়ই ভয়ে ভয়ে থাকি। এখানে জীবীকার তাগিদে এসে যদি দুর্ঘটনার শিকার হলে দেশে থাকা পরিবার বিপদে পড়ে যাবে।’
তাই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, দূতাবাসের নির্দেশনা অনুসরণ এবং জরুরি যোগাযোগের ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ছাড়া সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলো আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তীব্র হলে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। এর সঙ্গে হরমুজ প্রণালি বা লোহিতসাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।



