যুদ্ধ-খরার ধাক্কায় বিশ্বজুড়ে কমছে খাদ্য মজুদ, বাড়ছে মূল্যস্ফীতি

মিসরের কায়রোয় ১৩ অক্টোবর ক্রেতার সন্ধানে বাজারে কলাভর্তি ঠেলাগাড়ি ঠেলে নিয়ে যাচ্ছেন এক বিক্রেতা— রয়টার্স
যুদ্ধ, জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ও খরার প্রভাবে বিশ্বজুড়ে খাদ্য সরবরাহে চাপ বাড়ছে। এতে চাল, গম, চিনি ও ভোজ্যতেলের দাম বেড়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন দরিদ্র মানুষ। পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জাকার্তার কেন্দ্রীয় এলাকায় পার্কিংয়ের দায়িত্বে থাকা ৬৩ বছর বয়সী মুহাম্মদ ইয়াসিন বলছেন, নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় খাবার কেনা তার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। তাই খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছেন তিনি।
পার্কিং করা মোটরসাইকেলগুলোর দেখাশোনা করেন ইয়াসিন। সেই জায়গার পাশের একটি মিনিমার্কেটের কাছে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, ‘আগে ৭ হাজার থেকে ৮ হাজার রুপিয়ায় (০.৩৯ থেকে ০.৪৪ ডলার) চাল, টেম্পে ও টোফু কিনতে পারতাম। এখন লাগে ১৫ হাজার রুপিয়া।’ সপ্তাহে তার আয় ২ লাখ থেকে ৩ লাখ রুপিয়া।
বিশ্বজুড়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি আগামী কয়েক মাসে আরও বাড়তে পারে এবং ২০২৭ সালের অনেকটা সময়জুড়েই তা উচ্চপর্যায়ে থাকতে পারে। যুদ্ধের কারণে পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন এবং এল নিনোর প্রভাবে খরার কারণে শস্যের সরবরাহ কমে যাওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। এতে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মানুষের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে। চার সন্তানের বাবা ইয়াসিন তাদেরই একজন।
ইন্দোনেশিয়ায় বৃষ্টিপাত দেরিতে শুরু হওয়ার পূর্বাভাসের মধ্যে চালের দাম ইতিমধ্যে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। মিসরে রুটির দাম বেড়েছে এক-চতুর্থাংশ। আর এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল মৌসুমি বৃষ্টিপাতের কারণে উৎপাদন কমে যাওয়ায় ভারতে চিনির দাম সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো বলেন, ‘এসব কারণে পুরো ব্যবস্থার ওপর যথেষ্ট চাপ তৈরি হয়েছে।’
তিনি আরও বললেন, ‘বছরের শেষ দিকে, আগামী বছরের শুরুতে এবং সম্ভবত পুরো আগামী বছরজুড়েই এর প্রভাব আরও বেশি দেখা যাবে।’
মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও এশিয়ার নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে খাদ্যের দাম দ্রুত বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বিশ্বের দরিদ্রতম ভোক্তারা। এসব অঞ্চলের পরিবারগুলোর মোট ব্যয়ের বড় অংশই খাবারের পেছনে খরচ হয়।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটি যে ১৫০টি দেশ বিশ্লেষণ করেছে, তার মধ্যে ২২ শতাংশ দেশে গত সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে খাদ্য মূল্যস্ফীতি সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে ছাড়িয়ে গেছে। আগের প্রান্তিকে এই হার ছিল ১৪ শতাংশ।
খাদ্যের দাম বাড়ায় সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলো রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে, যা সংকট আরও বাড়িয়ে তুলবে।
সরবরাহে একাধিক ধাক্কা
কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে শস্য পরিবহনের অবকাঠামোয় হামলার কারণে গমের চালান ব্যাহত হয়েছে। ফলে বড় আমদানিকারক মিসর ও ইন্দোনেশিয়াকে বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ খুঁজতে হচ্ছে। অন্যদিকে, লোহিত সাগরের নিরাপত্তাহীনতার কারণে জাহাজগুলোকে আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পথে চলাচল করতে হচ্ছে।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে সার রপ্তানিতে বিঘ্ন ঘটিয়েছে। এতে কৃষি উৎপাদনের ব্যয় বেড়েছে। একই সময়ে এল নিনোর প্রভাবে শুষ্ক আবহাওয়া ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে।
২০২৬ সালে গমের দাম ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বিপুল মজুত থাকা সত্ত্বেও এশিয়ার প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোতে চালের দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১৩ শতাংশ। ইরান যুদ্ধের শুরুর দিকে সারের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল। পরে কিছুটা কমলেও এখনো তা বেশি।
নেসলে ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনীশ তিওয়ারি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি, বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে চলা এখন বাস্তবতা।’ পণ্যের বাড়তি দামের কারণে পরিস্থিতি ‘চ্যালেঞ্জিং’ হয়ে উঠেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মিসরে ভর্তুকিবিহীন বড় একেকটি রুটির দাম জুলাইয়ের চার মিসরীয় পাউন্ড থেকে বেড়ে প্রায় পাঁচ পাউন্ডে উঠেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে রান্নার তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাম তেল উৎপাদনকারী দেশ ইন্দোনেশিয়াতেও এ বছর ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে ৭ শতাংশ।
উৎপাদন ঘাটতির কারণে ভারতে সেপ্টেম্বরে চিনি, পেঁয়াজ ও ডালের দাম আগের মাসের তুলনায় ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
কায়রোর কেন্দ্রস্থলে বেকারি পরিচালনা করেন সায়েদ আবদেল হামিদ মোহাম্মদ। তিনি জানান, শুধু ময়দার দামই বাড়েনি।
তিনি বলেন, ‘দক্ষ কর্মী নিয়োগ করতেও এখন অনেক খরচ হয়। বিদ্যুৎ, পানি, ইস্ট এবং ভোক্তাদের জন্য রুটি তৈরিতে ব্যবহৃত সব উপকরণের দামই বেড়েছে।’
বেকারির ক্রেতা তারেক আজাব বলেন, গত কয়েক বছরে দাম ক্রমাগত বেড়েছে—‘একবার, দুবার বা তিনবার নয়।’
তেলের দাম ও যুদ্ধজনিত বাড়তি ঝুঁকির কারণে কৃষ্ণসাগর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক রুটে পণ্য পরিবহনের খরচ প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।
মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা
২০২৫ সালের শেষ দিক থেকেই খাদ্যের দাম বাড়ছে। এখন স্থানীয় বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়া এবং পণ্যের বাড়তি ব্যয় ভোক্তাপর্যায়ে পৌঁছানোয় মূল্যস্ফীতি আরও দ্রুত বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার যেসব বড় আমদানিকারক দেশ স্থানীয়ভাবে ভালো ফলন হওয়ায় এত দিন আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কেনাকাটা কমিয়ে রেখেছিল, তাদের এখন আবার বিশ্ববাজারে ফিরতে হচ্ছে। এতে চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে।
লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক শস্য পরিষদের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ আলেকজান্ডার কারাভাইতসেভ বলেন, ‘কয়েক মাসের মধ্যে আমদানিকারকেরা বাজারে ফিরে এলে চাহিদার নতুন একটি বড় ঢেউ তৈরি হতে পারে।’
এফএওর তোরেরো বলেন, বিশ্বজুড়ে শস্যের রেকর্ড মজুতের কারণে যে সুরক্ষা তৈরি হয়েছিল, তা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, ‘আগের মৌসুমগুলোর মজুত ও ভালো ফলন আমাদের সুরক্ষা দিয়েছে। কিন্তু সেই সুরক্ষাব্যবস্থা এখন চাপে পড়তে শুরু করেছে। এর অর্থ, পণ্যের দাম আরও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে।’
খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত তিন থেকে ছয় মাসের চুক্তিতে কাঁচামাল কেনে। এখন এসব চুক্তি নবায়ন করতে গিয়ে তাদের বেশি দাম দিতে হচ্ছে। স্থানীয় মুদ্রার দরপতনও ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ইন্দোনেশিয়ার বৃহত্তম খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান পিটি ইন্দোফুডের পরিচালক ফ্রান্সিসকুস ওয়েলিরাং বলেন, ‘পরিবহন খরচও বেড়েছে। ইন্দোনেশীয় রুপিয়ায় হিসাব করলে মুদ্রার দরপতনের কারণে এর প্রভাব আরও বেড়ে যায়।’
ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহ করতেও সমস্যায় পড়ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
জাকার্তাভিত্তিক একটি ময়দা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে গমের চালান কমে যাওয়ায় ইন্দোনেশিয়ার কয়েকটি গমকল তাদের উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে পারছে না। গণমাধ্যমে কথা বলার অনুমতি না থাকায় ওই কর্মকর্তা নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি।
এখন পর্যন্ত সয়াবিন ও ভুট্টার মজুত পর্যাপ্ত রয়েছে। তবে ভবিষ্যতে এসব পণ্যের সরবরাহ নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ আমেরিকার উৎপাদনের ওপর। জ্বালানির দাম বাড়ায় সয়াবিন ও ভুট্টার দামও সমর্থন পাচ্ছে, কারণ জৈব জ্বালানি উৎপাদনে এসব ফসলের ব্যবহার বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক শস্য পরিষদের কারাভাইতসেভ বলেন, দক্ষিণ গোলার্ধে গমের ভালো ফলন প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তবে অস্ট্রেলিয়া ও আর্জেন্টিনার মতো রপ্তানিকারক দেশে উৎপাদন কমে গেলে তা দামের ওপর নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি করতে পারে।
তিনি বললেন, ‘দাম আরও অনেকটা বেড়ে যাওয়ার যথেষ্ট ঝুঁকি রয়েছে।’







