ফের ইরানের হামলা
ইসরায়েলের কঠোর হুঁশিয়ারি, শান্ত থাকার আহ্বান ট্রাম্পের

প্রতীকী ছবি
ইসরায়েলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা পেয়েছে নতুন মাত্রা। তবে সংঘাত আরও বিস্তৃত না করতে ইসরায়েলকে পাল্টা হামলা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তার দাবি, ইরানের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে ওয়াশিংটন।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সরাসরি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে সংযত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন ট্রাম্প। তার মতে, ইরানের সাম্প্রতিক হামলায় কেউ হতাহত হয়নি এবং নতুন করে পাল্টা আঘাত হানলে আরও দীর্ঘায়িত হবে সংঘাত। এ-তথ্য নিশ্চিত করেছে অ্যাক্সিওস এবং ইসরায়েলের চ্যানেল ১২-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।
ট্রাম্পের ভাষ্য, ‘ইরানের হামলায় কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। আশা করি ইসরায়েল প্রতিশোধ নেবে না। যদি আবার হামলা চালান, তাহলে গত ৪৭ বছর কিংবা গত ৩ হাজার বছরের মতোই এই সংঘাত চলতেই থাকবে।’
এমনকি ব্রিটিশ দৈনিক ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক মন্তব্যে তিনি জানান, নেতানিয়াহুর সামনে চুক্তি মেনে নেওয়া ছাড়া অন্য কোনো পথও নেই। তিনি আরও বলেন, ইরানের হামলা সত্ত্বেও সমঝোতায় পৌঁছানোর ইচ্ছায় কোনো পরিবর্তন আসেনি।
এর আগে ফক্স নিউজকে দেওয়া আরেক সাক্ষাৎকারে ইরানকে আবারও আলোচনার টেবিলে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চলমান কূটনৈতিক আলোচনার জন্য হতে পারে ক্ষতিকর।
তিনি বলেন, ‘যথেষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ হয়েছে, এখন আলোচনার টেবিলে ফিরে গিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো উচিত।’
এছাড়াও ট্রাম্প জানান, বৈরুতে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলা নিয়েও সন্তুষ্ট নন তিনি।
যদিও এর আগে এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে আরও ‘নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক’ হামলার আহ্বান জানিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তিতে লেবানন সংঘাত অন্তর্ভুক্ত করার দাবি করছেন না তিনি।
ইরানি হামলায় ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া
ইরানের হামলার পর ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। এর আগে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ইরান দেশটির দিকে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। পরে তারা দাবি করে, সব ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে। হামলার পর হাইফাসহ উত্তর ইসরায়েলের বিভিন্ন এলাকায় সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে ওঠে।
ইরানের পদক্ষেপকে ‘গুরুতর ভুল’ বলে অভিহিত করেছেন ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র এফি ডেফ্রিন। তিনি বলেন, পরিস্থিতি মূল্যায়ন করছেন সেনাপ্রধান। ভবিষ্যৎ পদক্ষেপের পরিকল্পনা অনুমোদন করছেন তিনি। তার ভাষ্য, ‘পুরো লেবাননজুড়ে অভিযান অব্যাহত রাখবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। যেকোনো নতুন হামলার সম্ভাবনার জন্য আমরা প্রস্তুত।’
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর গাজার সঙ্গে সংযোগকারী সব সীমান্ত ক্রসিংও বন্ধ করে দিয়েছে ইসরায়েল। দেশটির সরকারি সমন্বয় সংস্থা জানিয়েছে, নিরাপত্তাজনিত কারণে কেরেম শালোম ও রাফাহসহ গাজায় প্রবেশের সব পথ পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।
এর আগে ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, ‘অবশ্যই আজ রাতে তেহরানে আগুন জ্বলবে!’
লেবাননে অব্যাহত রয়েছে ইসরায়েলি হামলা
রবিবার লেবাননের জাতীয় বার্তাসংস্থা জানিয়েছে, নাবাতিয়েহ জেলার জিফতা ও আল-নামিরিয়ার মধ্যবর্তী সড়কে হায়দার ভবনে ইসরায়েলি বিমান হামলায় দুইজন নিহত ও দুইজন আহত হয়েছেন। একই জেলার দুয়েইর এলাকায় নিজ বাড়িতে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন হাসান আলি হোতাইত নামের এক তরুণ। এছাড়া আল-শারকিয়া, তালাত আল-রাহাব, হারুফ-তুল এলাকা এবং আশপাশের বিভিন্ন স্থানে চালানো হয়েছে বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণ। কফার তেবনিত এলাকায় আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ ফসফরাস গোলা ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে।
এছাড়াও গাজা সিটিতেও ইসরায়েলি হামলায় প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা বলছে, আল-নাসর এলাকার আল-বুরাক স্কুলের কাছে একটি বেসামরিক যানবাহন ও পথচারীদের লক্ষ্য করে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় অন্তত চার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আল-শিফা হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছে, আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা বেশ আশঙ্কাজনক।
কী বলছে ইরান?
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) দাবি, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে উত্তর ইসরায়েলের হাইফা শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রামাত ডেভিড বিমানঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে তারা। আইআরজিসির ভাষ্য, দক্ষিণ লেবানন ও বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরে পরিচালিত হামলার উৎস ছিল এই বিমানঘাঁটি।
ইরানি সামরিক বাহিনীর খাতাম আল-আম্বিয়া সদর দপ্তরের কমান্ডারের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পূর্ববর্তী সতর্কতা সত্ত্বেও বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরে হামলা চালিয়ে এবং দক্ষিণ লেবাননে আক্রমণ বাড়িয়ে ‘সব বিপদসীমা’ অতিক্রম করেছে ইসরায়েল। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমরা আগে সতর্ক করেছিলাম, বৈরুতের উপশহরে অপরাধমূলক হামলা হলে, দখলকৃত ভূখণ্ডের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানব আমরা।’ আরও বলা হয়, দক্ষিণ লেবানন ও বৈরুতের উপশহরে হামলা বন্ধ করতে হবে ইসরায়েলি বাহিনীকে। নয়তো পড়তে হবে ‘আরও কঠোর ও দুঃখজনক আঘাতের’ মুখে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচির দাবি, ইসরায়েলের পক্ষ থেকে লেবাননে যুদ্ধবিরতি ‘বারবার লঙ্ঘনের’ জবাবে এমন ‘প্রতিক্রিয়া’ দেখিয়েছে ইরান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে তিনি আরও জানিয়েছেন, ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এবং পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সঙ্গে কথা হয়েছে তার।
এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরান ও লেবাননের পতাকা পাশাপাশি থাকা একটি ছবিও শেয়ার করেছিলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠী কাতাইব হিজবুল্লাহ। সংগঠনটি বলেছে, ইরান ও ইসরায়েলের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করলে ইরাক ও বৃহত্তর অঞ্চলের মার্কিন ঘাঁটি এবং স্বার্থ সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো হবে তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু।
এর আগে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সতর্ক করে বলেছিলেন, ইসরায়েলের অব্যাহত হামলার পরিপ্রেক্ষিতে ইরান ‘শুধু আলোচনার পথ বন্ধ করবে না, বরং শত্রুর মুখোমুখি হবে সরাসরি’। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমালোচনা করে বলেছেন, ‘না যুদ্ধবিরতিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ তারা, না সংলাপে বিশ্বাসী।’
বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে আকাশসীমা
হামলা চালানোর পর, ইরানের পশ্চিমাঞ্চলের আকাশসীমা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম।
এছাড়াও আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে ইরাক। সেইসাথে স্থগিত করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল। এ তথ্য নিশ্চিত করেছে দেশটির বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। একই সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিরিয়াও। দক্ষিণাঞ্চলের আকাশপথ বন্ধ এবং দামেস্ক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম ১২ ঘণ্টার জন্য স্থগিত করেছে দেশটির সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ।
সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে লেবানন
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে লেবানন। বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরে ইসরায়েলি হামলার পরই ইরান সরাসরি প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়েছে। এর আগে তেহরান সতর্ক করেছিল, বৈরুত বা দক্ষিণ লেবাননে নতুন হামলা হলে তার জবাব দেওয়া হবে।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক রস হ্যারিসন আল-জাজিরাকে জানিয়েছে, লেবাননকে ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কূটনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ইসরায়েল ও ইরান উভয়ই। তার ভাষ্য, এমন একটি শান্তি চুক্তি ঠেকাতে চায় ইসরায়েল, যেটিকে সময়ের আগেই সম্পন্ন হওয়া সমঝোতা বলেই মনে করছে তারা। অন্যদিকে ওয়াশিংটনকে বোঝাতে চাইছে ইরান, যে এই সংঘাতের সমাপ্তি কীভাবে হবে, সেই সিদ্ধান্তে তাদেরও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
তার ভাষ্য, মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার লক্ষ্য নিয়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে উভয় পক্ষ।
বিশ্লেষকদের ধারণা, আগামী কয়েক ঘণ্টা পরিস্থিতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ইসরায়েল নতুন করে ইরানে হামলা চালায় কি না এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখায়, তার ওপরই নির্ভর করবে এই সংঘাতের পরবর্তী গতিপথ।







