গিলগিট-বালতিস্তান নির্বাচন
ফল প্রকাশে অনিয়মের অভিযোগ পিপিপি ও পিটিআইয়ের

সংগৃহীত ছবি
পাকিস্তানের গিলগিট-বালতিস্তান (জিবি) আইনসভার ২৪টি সাধারণ আসনের ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে শান্তিপূর্ণভাবে। কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে রবিবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলেছে এ ভোটগ্রহণ। তবে ভোট শেষে ফল প্রকাশে অনিয়ম, ফরম-৪৫ ও ফরম-৪৬ না দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) ও পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)।
জিবি আইনসভার মোট আসন ৩৩টি। এর মধ্যে ২৪টি সাধারণ আসন নির্বাচিত হয় সরাসরি ভোটে, নারীদের জন্য ছয়টি এবং টেকনোক্র্যাট ও পেশাজীবীদের জন্য রয়েছে তিনটি সংরক্ষিত আসন। এবারের নির্বাচনে অংশ নেন মোট ৩৯৬ জন প্রার্থী। তাদের মধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন ২৬৬ জন। নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন মাত্র আটজন। অঞ্চলটির ১০ জেলায় মোট ভোটার ৯ লাখ ৬৩ হাজার ৩৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৯৭ জন এবং নারী ৩ লাখ ৯৬ হাজার ৯৩৭ জন।
ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর পিপিপির মহাসচিব নায়্যার হুসেইন বুখারি অভিযোগ করেন, তাদের প্রার্থীদের ফরম-৪৫ সরবরাহ করা হচ্ছে না। তিনি জানান, বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে।
ফরম-৪৫ দিতে বিলম্ব হওয়াকে অগ্রহণযোগ্য উল্লেখ করেন পিপিপির মুখপাত্র শাজিয়া মাররি। তার ভাষ্য, নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকায় পরিবর্তন এবং কিছু ভোটকেন্দ্র স্থানান্তরের ঘটনা নির্বাচনী কারচুপির ইঙ্গিত দেয়।
পিপিপি আরও দাবি করে, আস্তোর-২ আসনের বুনজি এলাকার বালাচি ভোটকেন্দ্র রাতারাতি সড়কসংলগ্ন স্থান থেকে পাহাড়ের চূড়ায় সরিয়ে নেওয়া হয়। দলটির মতে, ওই এলাকায় তাদের শক্তিশালী ভোটব্যাংক থাকায় ভোটারদের নিরুৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে এই সিদ্ধান্ত। এ ঘটনার প্রতিবাদে স্থানীয়রা গিলগিট-স্কার্দু সড়ক অবরোধ করেন বলেও দাবি করা হয়।
অন্যদিকে পিটিআই-এর দাবি, প্রাথমিক ও অনানুষ্ঠানিক ফলাফলে এগিয়ে ছিলেন তাদের সমর্থিত প্রার্থীরা। দলটির অভিযোগ, সন্ধ্যা ৭টার পর কিছু কেন্দ্র থেকে অস্বাভাবিকভাবে ৮০ শতাংশের বেশি ভোট পড়ার তথ্য আসতে শুরু করে এবং কিছু ব্যালট বাক্সে ৭০০ থেকে ৮০০ ভোট পাওয়া যায়, যা সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।
পিটিআই আরও অভিযোগ করে, তাদের পোলিং এজেন্টদের ফরম-৪৬ দেওয়া হয়নি। দলটির দাবি, এটি নির্বাচন আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং ফলাফল নিয়ে কারসাজির আশঙ্কা বাড়িয়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি এলাকায় জাল ব্যালটপেপারসহ অন্য দলের কর্মীদের আটক করার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ তোলে দলটি।
এদিকে পিপিপির নেতা নাদিম আফজাল অভিযোগ করেন, প্রশাসনের ওপর প্রভাব খাটিয়ে নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন কেন্দ্রীয় সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী। তার মতে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আমির মুকাম ও আলিম খানের নির্বাচনী তৎপরতা সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ভোটগ্রহণ চলাকালে বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করেন গিলগিট-বালতিস্তানের প্রধান নির্বাচন কমিশনার রাজা শাহবাজ খান। তিনি জানান, নিরাপত্তা ব্যবস্থা সন্তোষজনক ছিল এবং নারী ভোটারদের অংশগ্রহণও ছিল উল্লেখযোগ্য। তার মতে, শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছে সব রাজনৈতিক দল।
বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শন করেন অন্তর্বর্তীকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ আলী বেগও। তিনি জানান, সামগ্রিক পরিবেশ ছিল শান্তিপূর্ণ। কোথাও কোথাও সামান্য অনিয়ম দেখা গেলেও দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এ নির্বাচনে অংশ নেন পিপিপি ২৩ জন, পিএমএল-এন ২২ জন, ইস্তেহকাম-ই-পাকিস্তান পার্টি ১৫ জন এবং অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। প্রতীক হারানোর কারণে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করেন পিটিআই প্রার্থীরা। মজলিসে ওয়াহদাতুল মুসলিমিনের (এমডব্লিউএম) সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে মাঠে নামে তারা।
মুখ্যমন্ত্রী পদে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন পিপিপির অ্যাডভোকেট আমজাদ হুসেইন এবং পিএমএল-এনের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী হাফিজ হাফিজুর রহমান। আমজাদ হুসেইন গিলগিট-১ এবং হাফিজুর রহমান গিলগিট-২ আসন থেকে করছেন প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
নির্বাচনের আগে খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহাইল আফ্রিদির চিঠির পর নির্বাচন কমিশনকে অবাধ, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিতের নির্দেশ দেন গিলগিট-বালতিস্তান সুপ্রিম আপিলেট কোর্ট। জবাবে নির্বাচন কমিশন আদালতকে জানায়, সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য নেওয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা।
গিলগিট-বালতিস্তানকে সাংবিধানিক অধিকার এবং সম্ভাব্য পঞ্চম প্রদেশের মর্যাদা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন নির্বাচনী প্রচারে পিপিপি চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো। অন্যদিকে উন্নয়ন প্রকল্প, সড়ক নির্মাণ, গণপরিবহন ব্যবস্থা ও সুশাসনের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন হাফিজ হাফিজুর রহমান।
নির্বাচন উপলক্ষে মোতায়েন করা হয় ৬ হাজার পাঞ্জাব পুলিশ এবং ২ হাজার ইসলামাবাদ পুলিশ সদস্য। অঞ্চলজুড়ে স্থাপন করা হয় মোট ১ হাজার ৩৯১টি ভোটকেন্দ্র। এর মধ্যে ৫৫১টি কেন্দ্রকে অতি সংবেদনশীল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সবচেয়ে বেশি অতি সংবেদনশীল কেন্দ্র ছিল দিয়ামির জেলায়।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালের নির্বাচনে পিটিআই জয়ী হয়েছিল। তবে ২০২৩ সালে ভুয়া ডিগ্রি সংক্রান্ত মামলায় দলটির মুখ্যমন্ত্রী খালিদ খুরশিদ খান অযোগ্য ঘোষিত হলে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। এরপর জোট সরকারের মাধ্যমে হাজি গুলবার খান নির্বাচিত হন নতুন মুখ্যমন্ত্রী।




