বাণিজ্যচুক্তির প্রভাব কি এবার জাহাজভাঙা শিল্পে?

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য সহযোগিতা চুক্তি নিয়ে দেশে অনেক আলোচনা হচ্ছে। প্রায় সবাই বলছেন, এতে বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়েছে। এখন দেখা দরকার, এ চুক্তির প্রকৃত অভিঘাত কতদূর পর্যন্ত যেতে পারে?
চুক্তিটি পড়তে গিয়ে আমার মনে হয়েছে, এর উত্তর শুধু রপ্তানিবাণিজ্য বা শুল্ক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর কিছু ধারা এমনসব খাতকেও স্পর্শ করতে পারে, যেগুলোর সঙ্গে প্রথম দেখায় এ চুক্তির কোনো সম্পর্কই নেই বলে মনে হয়। বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্প তার একটি উদাহরণ হতে পারে।
বিষয়টিতে শুরুতে খটকা লাগতে পারে। কিন্তু সম্প্রতি হংকংভিত্তিক একটি কোম্পানির মালিকানাধীন মেইমেই (MAYMEI) নামের জাহাজের ঘটনা সেই প্রশ্নটি সামনে এনেছে।
দেশের জাহাজভাঙা শিল্পকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মূলত ‘গ্রিন কমপ্লায়েন্স’-এর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতো। কিন্তু মেইমেইর ঘটনা দেখাচ্ছে, সেই তালিকায় হয়তো এখন ‘স্যাংশনস কমপ্লায়েন্স’ও যুক্ত হতে যাচ্ছে
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ভাঙার জন্য আনা প্রায় ৬১ কোটি টাকা মূল্যের এ কেমিক্যাল ট্যাংকারটি বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছানোর কয়েক দিনের মধ্যেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে। ফলে জাহাজটি এখন ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান।
এটিকে নিছক একটি বাণিজ্যিক দুর্ঘটনা বলে মনে হলেও এর ভেতরে আরও কিছু প্রশ্ন রয়েছে। জাহাজটি ইরানের পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য পরিবহনের অভিযোগে ২৮ মে নিষিদ্ধ হলো। কিন্তু তার মাত্র কয়েক দিন আগেই সেটি স্ক্র্যাপ হিসেবে বাংলাদেশে চলে এলো কেন? এটি কি নিছক কাকতালীয় কোনো ঘটনা? নাকি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে থাকা পুরনো জাহাজগুলোকে দ্রুত স্ক্র্যাপ বাজারে সরিয়ে ফেলার কোনো পরিচিত প্রবণতার অংশ?
মেইমেই কোনো সাধারণ জাহাজ নয়। নথি অনুযায়ী, জীবদ্দশায় এটি একাধিকবার নাম পরিবর্তন করেছে। এমনকি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আগেই এটি ইরান-সংশ্লিষ্ট তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোরও নজরে ছিল।
প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পে কি ক্রমেই বিশ্বের বিতর্কিত, নিষেধাজ্ঞা-ঝুঁকিপূর্ণ বা শ্যাডো ফ্লিটের জাহাজগুলো আগে আসেনি বা আসতে পারবে না? প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মেইমেই-ই প্রথম নয়। আন্তর্জাতিক শিপিংবিষয়ক বিভিন্ন প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা বা নিষেধাজ্ঞা-ঝুঁকিপূর্ণ আরও কিছু জাহাজ চট্টগ্রাম উপকূলে এসে আটকে পড়েছিল।
তবে আমার কৌতূহল অন্য একটি জায়গায়। বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যচুক্তিতে স্যাংশনস ও এক্সপোর্ট কন্ট্রোল-সংক্রান্ত সহযোগিতার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সেখানে পরিষ্কার বলা হয়েছে, এমন সব বাণিজ্যিক লেনদেন সীমিত বা বন্ধ করতে হবে, যা আমেরিকায় ঘটলে মার্কিন আইন অনুযায়ী নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতো।
প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পে আন্তর্জাতিক ‘স্যাংশনস কমপ্লায়েন্স’ বা নিষেধাজ্ঞা প্রতিপালন কি এখন থেকে শুধু একটি ব্যবসায়িক ভদ্রতা? নাকি এটি ক্রমেই একটি আইনি বাধ্যবাধকতায় পরিণত হতে চলেছে? সহজ ভাষায়, একটি জাহাজের দাম বা স্ক্র্যাপ মূল্যের পাশাপাশি তার মালিকানা, বাণিজ্যিক ইতিহাস, পূর্ববর্তী কার্গো এবং নিষেধাজ্ঞা-ঝুঁকিও কি এখন থেকে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে?
মেইমেইর ঘটনাটি অন্তত সেই প্রশ্নটি সামনে নিয়ে এসেছে। যদি সত্যিই দেখা যায় যে, নিষেধাজ্ঞা-ঝুঁকিপূর্ণ বা বিতর্কিত জাহাজগুলোর একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার, বিশেষ করে বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পে এসে পৌঁছাচ্ছে, তবে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার এ নতুন বাস্তবতা আমাদের এই শিল্প খাতকে কীভাবে প্রভাবিত করবে, সেটিও এখন বিবেচনার দাবি রাখে।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নতুন কিছু নয়। কিন্তু মেইমেইর ঘটনার পর বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আর শুধু আন্তর্জাতিক রাজনীতির খবরে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ধীরে ধীরে আমাদের অর্থনীতি, বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তেরও অংশ হয়ে উঠতে পারে!
বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়ার আরও একটি বড় কারণ রয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জাহাজভাঙা দেশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক জাহাজ পুনর্ব্যবহার শিল্পে বাংলাদেশের অংশ প্রায় ৪০ শতাংশ বা তারও বেশি ছিল বলে বিভিন্ন গবেষণা ও শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের ইস্পাত শিল্পের কাঁচামালের বড় একটি অংশ আসে এই খাত থেকে। কয়েক লাখ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ জীবিকাও এর সঙ্গে জড়িত।
নিঃসন্দেহে এই শিল্প নিয়ে বহু সমালোচনাও রয়েছে। পরিবেশবাদী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রশ্ন নতুন নয়। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও বাস্তবতা যে, দেশের শিল্প অর্থনীতির একটি বড় অংশ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল।
বহু বছর ধরে বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মূলত ‘গ্রিন কমপ্লায়েন্স’-এর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতো। কিন্তু মেইমেইর ঘটনা দেখাচ্ছে, সেই তালিকায় হয়তো এখন ‘স্যাংশনস কমপ্লায়েন্স’ও যুক্ত হতে যাচ্ছে!
এ অর্থে বিষয়টি আর শুধু একটি জাহাজ ঘিরে থাকছে না। বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প খাতের ভবিষ্যতের সঙ্গেও এটি জড়িয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক এ বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে দেশে নানা বিতর্ক চলমান রয়েছে। কিন্তু চুক্তি যেহেতু হয়ে গেছে, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে, এর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা। বিশেষ করে যেসব শিল্প খাত দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও কাঁচামাল সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত, সেগুলোর স্বার্থরক্ষায় সরকারকে আরও বেশি সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।
বাংলাদেশ কোনো সামরিক জোটের অংশ নয়, কোনো বৈশ্বিক সংঘাতেরও পক্ষ নয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতায় দেশের শিল্প খাতকে অপ্রয়োজনীয় চাপের মুখে না ফেলে কীভাবে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা যায়, সেই প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
বিদেশি জাহাজটি হয়তো অচিরেই আমাদের বন্দর ছেড়ে চলে যাবে, কিন্তু তার রেখে যাওয়া প্রশ্নগুলোর উত্তর এবং সংকটগুলোর সমাধান খুঁজতে হবে বাংলাদেশকেই।
লেখক: কানাডায় কর্মরত অনুসন্ধানী সাংবাদিক






