শেষ পর্যন্ত এই বিরক্তিকর শহরটাই ভালোবাসার বাড়ি

পুব আকাশে আলোর রেখা তখনো পরিষ্কার করে ফোটেনি। সিটি করপোরেশনের কর্মীরা কেবল রাস্তা পরিষ্কার করার কাজটা শেষ করেছেন।
আমিনবাজার ব্রিজের গোড়ায়, পর্বত সিনেমা হলের পাশে দোকানপাটগুলো খোলার কোনো লক্ষণ নেই। কেবল কয়েকটা রেস্টুরেন্ট তাদের প্রাত্যহিক সকালের কাজ শেষ করছে। কয়েকটা চা-সিগারেটের দোকান করছে খুলি খুলি। এর মধ্যেই সাঁই করে একটা বিলাসবহুল গাড়ি এসে তাদের কাউন্টারের সামনে দাঁড়াল।
হঠাৎ করে জীবনব্যস্ততা ফিরে এলো। কয়েক মিনিটের ব্যবধানেই দৃশ্যটা একদম বদলে গেল। যে জায়গাটা একটু আগে নীরব ছিল, সেই জায়গাটা ৫০-৬০ জন মানুষের কোলাহলে ভরে উঠল। দুটি রেস্টুরেন্টে তখন বসার জায়গা পাওয়া ভার। চা-সিগারেটের দোকানগুলো হঠাৎ করে ব্যস্ত হয়ে উঠল। লোকগুলো ফিরে এসেছেন; ঢাকায় ফিরে এসেছেন।
ঢাকায় যে কয়েক কোটি মানুষ বসবাস করেন, তার বেশিরভাগই স্থানীয় নন। তারা পরিযায়ী মানুষের মতো এ শহরটাকে ঠিক নিজের শহর বলে মুখে স্বীকৃতি দেন না। এ শহরের জ্যাম, ভিড়, গন্ধ, আত্মীয়হীনতা; সবকিছু নিয়ে তাদের বিরক্তি। কিন্তু এরকম বড় ছুটিগুলোর পর যখন তারা ঢাকায় ফেরেন, তখন তাদের মুখগুলো বলে দেয়— এটাই আসলে তাদের হোমকামিং; শেষ পর্যন্ত এ বিরক্তিকর শহরটাই তাদের ভালোবাসার বাড়ি।
ঢাকা প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠেছে বেশ লম্বা ঈদের ছুটির পর। গত সপ্তাহেই কাগজে-কলমে ঢাকার অফিস-আদালত সব খুলে গেছে; তবে আসল প্রাণচাঞ্চল্য শুরু হচ্ছে এ সপ্তাহে। সেই সময়টায় ঢাকার সব বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট সবই প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠেছে।
এ চিত্রটা সম্ভবত অন্য যেকোনো জায়গার চেয়ে গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে কম নয় বা অন্ততপক্ষে সমান। গাবতলী বাস টার্মিনালে পুরো উত্তরবঙ্গ এবং দক্ষিণবঙ্গের খানিক অংশের লোকরা এখনো ঈদের শেষে সেই বাড়ি ফেরার আনন্দ নিয়ে ফিরে আসেন।
যেমন গোপাল; গোপাল কর্মকার। তার আজই অফিস। পর্বত সিনেমা হলের সামনে নেমে সে তাড়াহুড়ো করছে একটা পাবলিক বাস পাওয়া যায় কি না। সাভার থেকে আসা পাবলিক বাস দাঁড়াচ্ছে, লোকজন উঠছে, গোপাল ওঠার সুযোগ পাচ্ছে না। সে শেষ পর্যন্ত একটু বেশি টাকা দিয়ে একটা মোটরসাইকেল ভাড়া করে নিল মতিঝিলের উদ্দেশে।
একটা খাঁচায় দুটি লাভবার্ড নিয়ে বাস থেকে নেমে এলো সামিয়া আর রোশনি, দুই বোন। একজন ক্লাস থ্রিতে পড়ে, একজন ক্লাস ওয়ানের ছাত্রী। দুজনের হাতে পাখির খাঁচাটায় কলাপাতা রঙের দুটি পাখি কিচিরমিচির করে চলেছে। তারা ঈদের ছুটিতে গিয়েছিল নানাবাড়ি। সেখানে গিয়ে গরমের সময় আম-কাঁঠালের মজা তো করেছেই, সঙ্গে দুটি পাখিও উপহার পেয়েছে মামার কাছ থেকে। এখন তাদের আর কালকে থেকে স্কুলে যেতে ইচ্ছে করছে না। তাদের ইচ্ছে বাসায় গিয়ে এ দুটি পাখি নিয়েই সারাটা দিন কাটাবে।
সে উপায় আছে? পাশ থেকেই মা ধমক দিচ্ছেন, ‘সামিয়া, রোশনি, দুজনই তাড়াতাড়ি গাড়িতে ওঠো, আমাদের বাসায় ফিরতে হবে, বিকালে টিচার আসবে, কাল থেকে স্কুল।’
এ শহরের জ্যাম ভিড়, গন্ধ আত্মীয়হীনতা; সবকিছু নিয়ে তাদের বিরক্তি। কিন্তু এরকম বড় ছুটিগুলোর পর যখন তারা ঢাকায় ফেরেন, তখন তাদের মুখগুলো বলে দেয়— এটাই আসলে তাদের হোমকামিং
মুখ কালো, রাগারাগি কয়েক গজ বাদে বাদেই চলছে। বিশেষ করে বেশি তোপটা যাচ্ছে স্ত্রীদের ওপর থেকে। যেমন এক ভদ্রলোক ভয়ানক ক্ষুব্ধ তার স্ত্রীর ওপর, কেন দুই বস্তা ভরে বাড়ির শাক, সবজি, মাছ, নানা কিছু নিয়ে এসেছেন তিনি। বারবার বলছেন, ‘এসব জিনিস কি ঢাকায় পাওয়া যায় না? এসব জিনিস কেন বাড়ি থেকে আনতে হবে? এখন এসব নিয়ে আমি কী করে বাসে উঠি? এ নিয়ে বাসায় যেতে গেলে একটা পুরো সিএনজি ভাড়া করতে হবে, কে ভাড়া দেবে?’
ভদ্রমহিলা তেমন কোনো উত্তর করছিলেন না। একবার মিনমিন করে বললেন, ‘আর যাই হোক, বাড়ির জিনিস তো, বাড়ির জিনিসের স্বাদ আলাদা।’
টেকনিক্যালের দিকে একটু এগিয়ে একটা কাউন্টারের সামনে বেশ জটলা জমে গেছে। এক বৃদ্ধা ‘সোনা বাবা’ বলে চিৎকার করছেন। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, ভদ্রমহিলা হয়তো তার নাতিকে হারিয়ে ফেলেছেন। বাচ্চা নাতি, যেজন্য চিৎকার করছেন।
বারবার আশপাশের লোককে জিজ্ঞাসা করছেন, ‘আমার সোনা বাবাটা কই গেল? আমার সোনা বাবাটা কই গেল?’
পাশের গলি থেকে বিশালদেহী এক ভদ্রলোক বেরিয়ে এসে বললেন, ‘মা, আমি এই তো। তুমি চেঁচাচ্ছ কেন?’ সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন যে, সোনা বাবা একেবারে ছোট নয়। সোনা বাবার বয়সও চল্লিশ পার হয়েছে। তিনি আস্তে আস্তে এসে মায়ের গায়ে হাত রাখলেন।
বললেন, ‘একটু এদিক-ওদিক গেলেই এরকম পাগল হয়ে যাও কেন? আমি আছি তো। চলো, বাসায় যাই।’ মায়ের মুখে তখন সোনা বাবাকে নিয়ে বাসায় ফেরার আনন্দ। এই হচ্ছে হোমকামিং।





