অপেক্ষায় প্রহর গোনে ঢাকার ডাকবাক্স

মহুবার রহমান
তন্নতন্ন করে খুঁজে হাতেগোনা কয়েকটি ডাকবাক্সের দেখা মিলল রাজধানীতে। একটা সময় ছিল যখন মানুষ চিঠির প্রতীক্ষায় দিন গুনত, এখন অবস্থা এমন হয়েছে যে, ডাকবাক্সগুলো যেন নিজেরাই চিঠির অপেক্ষায় প্রহর গোনে। সেই বদলে যাওয়ার গল্প লিখেছেন শম্পা বিশ্বাস
‘কত যে বেনামে চিঠি এসেছে... বড় ভাইয়ের হাতেও পড়েছে... সাহস করে স্তাবক শ্রেণির কেউই নাম লিখে উঠতে পারেনি চিঠিতে।... এখনো আসে তবে খুব কম... বেশিরভাগই চাকরি-বাকরি কিংবা ভিসাসংক্রান্ত।’ চিঠি নিয়ে এমন স্মৃতিচারণ লায়লা সুলতানার। থাকেন রামপুরার মহানগর প্রজেক্টে।
৫৮ বছরের এ নারীর বাসার সামনে এখনো চোখে পড়ে লেটারবক্স, যা আজ দুর্লভ। চিঠিপত্র আসে কালেভদ্রে। তবুও একসময়ের তুমুল আবেদন সৃষ্টি করা ডাকের চিঠি পাওয়ার লোভ সামলাতে পারেন না। বাসার সামনে রেখেছেন লেটারবক্সটি। ভুল করে হলেও যদি একটি চিঠি আসে সেই স্তাবক শ্রেণির কারও কাছ থেকে! আজ হয়তো তারা আর বেনামে লিখবেন না! এমন ভাবনা কি লায়লা সুলতানাকে ভাবায়? হেসে জবাব, ‘না, না... চিঠি আসে দু-একটা। আমার স্বামীও লিখতেন মাঝেমধ্যে।’
তার স্বামী প্রায় দুই দশক সৌদি আরবে থেকেছেন। প্রবাস থেকে চিঠি পাঠাতেন। আজও সেই চিঠি সুগন্ধি মেখে বাক্সে পুরে রেখেছেন লায়লা সুলতানা। আক্ষেপ, আজকাল তো সবাই ফোনেই খোঁজখবর নেয়। তাই ব্যক্তিগত চিঠি আর আসে না।
ডাক বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে সারা দেশে মোট ডাকঘরের সংখ্যা ৯ হাজার ৮৮৬টি, যা ৫টি পোস্টাল সার্কেলে বিন্যস্ত
লায়লা সুলতানার মতো আরেক বাসিন্দা অলোকনন্দা শেখর। দুজনের কোনো যোগসূত্র না থাকলেও চিঠি নিয়ে তাদের মাতামাতি ঠিক একইরকম। পুরনো খাতা খুলে যে চিঠি তিনি দেখাতে দেখাতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন, তার শেষ লাইন দুটি এরকম— ‘তুমি ফোন করো না চিঠি লিখো, কাগজে তোমার গন্ধ পাই।’
এ তো গেল চিঠির সঙ্গে প্রাপকের সম্পর্কের সমীকরণ। কিন্তু চিঠির সঙ্গে যার সম্পর্ক আরও নাড়ির, সেই লাল পিলার ডাকবাক্স! যে অন্যের সব খবরই তার অন্ধকার লাল বাক্সের ভেতর লুকিয়ে রাখত। নিশ্চয়ই প্রেমিক-প্রেমিকার গোপন কথোপকথনও তাদের বিনা অনুমতিতে পড়ে ফেলত ডাকবাক্স। কত মানুষের কত কত কথা; দুঃখ, সুখের গাথার সাক্ষী এ বাক্সটি। কিন্তু আজ কি তার কেউ খোঁজ রাখে? বোধহয় না। প্রয়োজন ফুরিয়েছে, তাই পিলার ডাকবাক্স হারিয়েছে তার জৌলুস।
তন্নতন্ন করে খুঁজে হাতেগোনা কয়েকটি ডাকবাক্সের দেখা মিলল রাজধানীতে। যদিও ডাক বিভাগের দেওয়া তথ্য বলছে, ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় মোট পিলার ডাকবাক্স আছে ১৩১টি। তবে তথ্যের সম্ভার হলেও বাস্তবে মানুষের চোখে ডাকবাক্স খুব একটা পড়ে না। এর কারণ নানা স্থাপনা আর দোকানপাট ঢেকে ফেলেছে এ বাক্সটিকে।
যাই হোক, অনেক খুঁজে যে কয়েকটি পিলার ডাকবাক্স ঢাকার রাস্তায় দেখা গেছে, তার মধ্যে একটি এফডিসি থেকে সাতরাস্তার দিকে যেতে বামে। আজকাল বাক্সটি মোটামুটি খালিই পড়ে থাকে। একা একা রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে নিশ্চয়ই সে বাসে, মোটরসাইকেল বা প্রাইভেট কারে চলে যাওয়া যাত্রীর জীবনের ব্যস্ততা দেখে আর ভাবে একসময়ে তারও এমন ব্যস্ততম দিন গেছে। ডাকে সিল মারার শব্দ আর লোকজনের আনাগোনায় মুখরিত থাকত ডাক অফিসগুলো।
আরেকটির দেখা মিলল বাংলা মোটর থেকে শাহবাগ যেতে হাতের বামে। এ ডাকবাক্সটি লাগোয়া দুটো চায়ের দোকান। কলার খোসা আর চিপসের প্যাকেটের জঞ্জালে যেন শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে বাক্সটির। আশপাশের কয়েকজন জানালেন, এটি এক দিন পরপর খোলা হয়। তবে ব্যক্তিগতভাবে কাউকে দেখা যায় না চিঠি ফেলতে।
ডাক বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে সারা দেশে মোট ডাকঘরের সংখ্যা ৯ হাজার ৮৮৬টি, যা ৫টি পোস্টাল সার্কেলে বিন্যস্ত। এর মধ্যে জিপিও (জেনারেল পোস্ট অফিস) ৪টি। এ ছাড়া এ-গ্রেড প্রধান ডাকঘর রয়েছে ২৩টি, বি-গ্রেড প্রধান ডাকঘর ৪৫টি, উপজেলা পোস্ট অফিস ৪২০টি, বিভাগীয় উপ-ডাকঘর ৯২৩টি, গ্রামীণ জনপদে সেবা দেওয়া শাখা ডাকঘর ৮ হাজার ৪৬০টি। এর বাইরেও রয়েছে ১১টি। তবে তথ্যপ্রযুক্তির এ সময়ে ডাকঘরগুলো এখন গ্রামীণ ও সাধারণ মানুষের সঞ্চয়ের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। সঞ্চয়পত্র এবং মেয়াদি আমানতসহ পোস্টাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সও বেশ জনপ্রিয়। এ ছাড়া মোবাইল ও ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুত ও কম খরচে টাকা পাঠানোর কাজটিও ডাকঘরই করে।
ডাক বিভাগের অতিরিক্ত মহাপরিচালক এস এম হারুনুর রশীদ এ বিষয়ে কথা বলেছেন আগামীর সময়ের সঙ্গে। তার মতে, ‘পিলার বা স্ট্রিট লেটারবক্স এখনো ঢাকাসহ সারা দেশে আছে। তবে এগুলো দাপ্তরিক চিঠি আদান-প্রদানে ব্যবহৃত হয়। ব্যক্তিগত ব্যবহার কমেছে প্রায় শতভাগ।’ ডাক বিভাগকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা আছে কি না, জানতে চাইলে তিনি এক কথায় উত্তর দিলেন— না।
এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রামীণ পর্যায়ে বিস্তৃত ৯ হাজারেরও বেশি পোস্ট অফিসের এ বিশাল নেটওয়ার্ক যদি পুরোপুরি ই-কমার্স লজিস্টিকস হাব হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তবে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিতে এক যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারবে।




