রপ্তানির আড়ালে চাঞ্চল্যকর অর্থপাচার
- জড়িত বেস্ট লেদার কোম্পানি
- প্রতিষ্ঠানটির এমডি ছিলেন প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রপ্তানির আড়ালে অর্থ পাচারের ঘটনা দেশে অনেকটা ‘ওপেন সিক্রেট’। একশ্রেণির ব্যবসায়ী ব্যাংক, কাস্টমসসহ সরকারের সংশ্লিষ্টদের ‘ম্যানেজ’ করে নির্বিঘ্নে এ অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। এতে পণ্য রপ্তানির মোটা অঙ্কের অর্থ দেশে আসে না। অর্থাৎ পাচার হয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি এমন এক ঘটনার সত্যতা মিলেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) তদন্তে। বেস্ট লেদার কোম্পানি লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২৬ লাখ ৯৮ হাজার ৯০১ ডলার (৩৩ কোটি টাকার বেশি) মূল্যের চামড়া পণ্য রপ্তানি করে। ২০১৯ সালের ৫ ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংক পিএলসির মতিঝিলের লোকাল শাখার মাধ্যমে ১৬টি এলসির (লেটার অব ক্রেডিট) বিপরীতে এসব পণ্য রপ্তানি করা হয়। কিন্তু রপ্তানি আয় পাঁচ বছরেও দেশে ফেরেনি, যা ১২০ দিনের মধ্যে আসা বাধ্যতামূলক। ঘটনার সময় প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ছিলেন বর্তমান সরকারের বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন গতকাল রবিবার তার দপ্তরে আগামীর সময়কে বলেছেন, সব ধরনের অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে রয়েছি। কেউ অর্থ পাচার করে পার পাবে না। আর বেস্ট লেদার কোম্পানি লিমিটেডের তদন্ত শেষ করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কাছে পাঠানো হয়েছে। বিএফআইইউ যেহেতু কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে না, সেজন্য নিয়ম অনুযায়ী অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় প্রতিবেদনটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
আমরা কারও পরিচয় দেখি না, শুধু অপরাধ দেখি— এমন মন্তব্য করে তিনি বললেন, অপরাধী যে হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে বড় ১১টি গ্রুপের পাচার করা অর্থ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অনুসন্ধান ও ব্যবস্থা গ্রহণ দ্রুতগতিতে এগিয়েছে। পাচারের অর্থ ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন দেশে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় নীতিমালা অনুযায়ী, পণ্য রপ্তানির পর ১২০ দিনের মধ্যে আয় দেশে ফেরত আনতে হবে। তবে ক্ষেত্রবিশেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতিসাপেক্ষে সর্বোচ্চ ২১০ দিন করা যাবে। আর কোনো ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান যদি রপ্তানি আয় সময়মতো ফিরিয়ে না আনে, তা মানি লন্ডারিং আইনের সরাসরি লঙ্ঘন, যা দেশের প্রচলিত আইনে কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম গতকাল রাতে টেলিফোনে আগামীর সময়কে বলেছেন, বেস্ট লেদার আমাদের পারিবারিক প্রতিষ্ঠান, যেটি বর্তমানে বন্ধ। আমি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ছিলাম। এটি সত্য। তবে কখনো ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে ছিলাম না। আপনি নথিপত্র যাচাই-বাছাই করে নিতে পারেন। এটি আমার ভাইদের প্রতিষ্ঠান। তারা আমাকে পরিচালক করেছেন। আমি যতটুকু জানি, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে রপ্তানি করা পণ্যের আয় (এক্সপোর্ট প্রসিড) নিয়ম অনুযায়ী দেশে আনা হয়েছে। তবে আপনি যেহেতু নথিপত্র উল্লেখ করে বলছেন, সেজন্য আমি আরও খোঁজ নিচ্ছি— যোগ করেন শরীফুল আলম।
তবে বিএফআইইউর তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ঘটনার সময় বেস্ট লেদার কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ছিলেন শরীফুল আলম। তার ছোট ভাই মো. সাইছয়ুম মিয়া প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান এবং অন্য ভাই মো. নায়েম হোসেন, মো. আবুল কালাম আজাদ, মো. আবুল কাইউম প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক।
অর্থপাচার-সংক্রান্ত যৌথ কমিটির একাধিক সদস্য অভিন্ন তথ্য দিয়ে জানালেন, দেশে ব্যবসা পরিচালনার আড়ালে বেস্ট লেদার কোম্পানি ভারতীয় মালিকানাধীন দুবাইভিত্তিক বায়ারের মাধ্যমে সৌদি আরব ও দুবাইয়ে অর্থ পাচার করেছে। ঘটনার সত্যতা প্রমাণিত হওয়ায় বিএফআইইউ গত ২২ এপ্রিল অধিকতর তদন্তের জন্য সিআইডিতে পাঠিয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ২০১৯-এর ৫ ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ১৬টি এলসির মাধ্যমে তারা ২৬ লাখ ৯৮ হাজার ৯০১ ইউএস ডলার রপ্তানিমূল্য দেশে ফেরত আনেনি।
ইসলামী ব্যাংকের লোকাল অফিস শাখার প্রধান এবং সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট জাকির হোসাইন স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি বছরের ২২ এপ্রিল সিআইডিতে পাঠানো ইসলামী ব্যাংকের লোকাল অফিসে রপ্তানিকারী প্রতিষ্ঠান বেস্ট লেদারের রপ্তানিমূল্য প্রত্যাবাসন-সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য ও অর্থের পরিমাণ সিআইডির কাছে অনুসন্ধানের স্বার্থে পাঠানো হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আলতাফ হুসাইন গত শনিবার আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘আমি সম্প্রতি দায়িত্ব নিয়েছি। সবকিছু বলতে পারব না। তবে এই ব্যাংক নিয়ম মেনে এলসি করে। এটি ব্যবসার স্বাভাবিক কার্যক্রম। গ্রাহকের রপ্তানি আয় না আসার বিষয়টি এ মুহূর্তে বলা ঠিক হবে না। তবে শাখা ব্যবস্থাপক ভালো বলতে পারবেন।’
ইসলামী ব্যাংকের লোকাল অফিস শাখার প্রধান জাকির হোসাইন আগামীর সময়কে বলেছেন, বেস্ট লেদার কোম্পানিটি আমাদের ভালো গ্রাহক। তার সুনাম আছে। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির বিষয়ে সিআইডি তথ্য চেয়েছে। আমরা আইন মেনে তথ্য সরবরাহ করেছি। সরকারি সংস্থা তথ্য চাইলে নিয়ম অনুযায়ী না দিয়ে পারা যায় না।




