প্ল্যাটফর্মে শিশুমনে স্বপ্ন বোনেন শুভ

চাষাঢ়া রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়ান শুভ চন্দ্র। ছবি: আগামীর সময়
স্বপ্ন ছিল একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার এবং সেই বিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার। তবে অর্থাভাবে অষ্টম শ্রেণির গণ্ডিই পেরোতে পারেননি শুভ চন্দ্র (৩০)।
সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা যাতে পড়তে ও লিখতে পারে, তার সুযোগ করে দিতে তিনি গড়ে তুলেছেন পাঠশালা। এখান থেকে পাঠ নেওয়া অনেকে পড়াশোনা করছে বিভিন্ন স্কুলে।
নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে খোলা আকাশের নিচে এই পাঠশালা। শুভ এর নাম দিয়েছেন ‘লাল সবুজের পতাকা শ্রী শুভ চন্দ্র প্রাথমিক শিশু বিদ্যালয়’। গার্মেন্টসে কাজ করাকালে ২০১৬ সালের মার্চ থেকে রেলস্টেশনের পাশের বস্তির ১১ শিশুকে প্ল্যাটফর্মের মেঝেতে পড়ানো শুরু করেন শুভ।
বর্তমানে তিনি একটি আসবাবের দোকানে কাজ করেন, যা বেতন পান তার ৬০ ভাগ ব্যয় করেন এই শিশুদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে। শুরু থেকে এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ৩ শতাধিক শিশু তার পাঠশালায় পড়তে ও লিখতে শিখেছে। নারায়ণগঞ্জ শহরের উত্তর চাষাঢ়ার রাম বাবুর পুকুরপাড় এলাকায় ভাড়া বাড়িতে বসবাস করেন শুভ। চার ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট তিনি।
শুভ বলেছেন, ‘২০১৬ সালে গার্মেন্টসে চাকরিকালে এক বন্ধুর সঙ্গে প্রায়ই চাষাঢ়া রেলস্টেশনে ঘুরতে যেতাম। সেখানে দেখতাম, পথশিশু ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা ঘুরে বেড়াচ্ছে এদিক-সেদিক, মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে, মারামারি করছে। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, আগ্রহ থাকলেও পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় তারা পড়তে পারছে না।’
‘এর পর থেকে বই-খাতা, শার্ট-প্যান্ট, টিফিন কিনে দেওয়ার কথা বলে শিশুদের মনে লেখাপড়ার আগ্রহ তৈরি করি। তখন বেতনের টাকা থেকে বাচ্চাদের আদর্শলিপি কিনে দিতাম, প্ল্যাটফর্মের মেঝেতে বসেই পড়াতাম। এখনো শিশুদের ফ্রি পড়াই, বই-খাতা কিনে দিই’— যোগ করেন শুভ।
২০১৬ সালে প্রথমে ১১ শিশু নিয়ে শুরু হলেও বর্তমানে ৩৫ থেকে ৪০ শিশু পড়াশোনা করে এই পাঠশালায়। প্রতিদিন বিকাল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত চলে পাঠদান। এ পর্যন্ত পথশিশুসহ সুবিধাবঞ্চিত ৩ শতাধিক শিশু এখানে পড়তে ও লিখতে শিখেছে। এখন তারা পড়ছে আশপাশের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে। অভিভাবকরা শিশুদের লেখাপড়া বন্ধ করে দিতে চাইলে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন শুভ।
সম্প্রতি সরেজমিন দেখা যায়, শিশুদের নামতার তালে তালে সরগরম প্ল্যাটফর্ম।
আবুবকর নামে এক শিশু বলেছে, ‘এখানে এসে ইংরেজি অক্ষর, নামতা পড়তে শিখেছি।’ রোজি বলেছে, ‘দুই বছর ধরে এই স্কুলে পড়ি। আগে নিচে বসে পড়তাম, এখন বেঞ্চে বসে পড়ি। বৃষ্টি এলে ভিজে যাই, তখন পড়তে আসি না।’
নানা প্রতিকূলতার কথাও জানালেন শুভ, রোদ-বৃষ্টিতে পড়াতে সমস্যা হয়। রোদে প্ল্যাটফর্ম গরম হয়ে যায়। বছর দু-এক আগে এক ব্যক্তি কিছু বেঞ্চ দেন, আরেকজন করেন ছাউনির ব্যবস্থা।
শুভ বললেন, ‘বাচ্চাগুলোকে যেন কেউ মূর্খ না বলে, আমি শত কষ্টেও তাদের অন্তত এতটুকু শিক্ষা দিতে চাই।’ স্থায়ীভাবে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করে দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের পড়াতে চান শুভ।
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) আলী নূর খান আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। আমরা খোঁজ নিয়ে দেখব। শুভর এই কার্যক্রমকে আমরা অবশ্যই উপযুক্ত ও সুন্দর ব্যবস্থাপনায় নিয়ে আসব এবং তাদের সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দেওয়া উদ্যোগ নেব।’




