কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথে ট্রাম্পপন্থি এসপ্রিয়েলা

পেশায় আইনজীবী ও ব্যবসায়ী আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা নিজেকে ‘এল টাইগ্রে’ বা ‘বাঘ’ নামে পরিচয় দেন
ল্যাটিন আমেরিকান দেশ কলম্বিয়ার রাজনীতিতে এসেছে বড় পরিবর্তন। দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রাথমিক ফলাফলে স্বল্প ব্যবধানে বিজয় আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা।
দেশটির দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র সংঘাত ও সহিংসতা মোকাবিলার নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে তার এই বিজয়।
অবৈধ সশস্ত্র গোষ্ঠী, মাদক পাচার ও অপরাধ দমনে কঠোর সামরিক অভিযান চালানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়া এসপ্রিয়েলা রাজনীতির বাইরের মানুষ। তিনি পরাজিত করেছেন বামপন্থি নেতা এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ইভান সেপেদাকে।
ফলাফল ঘোষণার পর এসপ্রিয়েলা বলেছেন, ‘আজ আমাদের দেশের জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। লাখো নাগরিকের স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে একটি নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও সুযোগে ভরপুর কলম্বিয়া গড়ার পথ শুরু হয়েছে।’
৯৯ শতাংশের বেশি ভোট গণনা শেষে এসপ্রিয়েলা প্রায় ৪৯ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পান। অন্যদিকে সেপেদা পান ৪৮ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট।
তবে সেপেদা এখনো পরাজয় স্বীকার করেননি। তিনি বলেছেন, ‘প্রাথমিক ভোট গণনার ফলাফল এখনো চূড়ান্ত বা আইনি বাধ্যতামূলক নয়। আনুষ্ঠানিক যাচাই-বাছাই ও ফল প্রকাশের পরই তারা চূড়ান্ত ফলাফল মেনে নেবেন।’
এদিকে বর্তমান প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোও ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, ‘প্রাথমিক ফলাফলের ভিত্তিতে কাউকেই এখনো বিজয়ী ঘোষণা করা যায় না। তিনি ভোট গণনার সফটওয়্যার নিরীক্ষার দাবি জানিয়েছেন এবং কিছু ভোটকেন্দ্রের নিরপেক্ষতা নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন, যদিও এ দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।’
উপকূলীয় অঞ্চলে উচ্ছ্বাস
ক্যারিবীয় উপকূলীয় অঞ্চলে বেড়ে ওঠা এসপ্রিয়েলা ব্যাপক সমর্থন পেয়েছেন সেখানে। তার সমর্থকেরা বিজয় উদযাপনে রাস্তায় নেমে আসেন উপকূলীয় শহর বাররানকিয়ায়।
কলম্বিয়ার জাতীয় ফুটবল দলের হলুদ জার্সি পরে জাতীয় পতাকা হাতে গান, নাচ ও আতশবাজির মাধ্যমে আনন্দ প্রকাশ করেন তারা।
অনেক সমর্থক ডোনাল্ড ট্রাম্প সমর্থকদের ধাঁচের টুপি পরেছিলেন, যেখানে লেখা ছিল, ‘মেক কলম্বিয়া গ্রেট অ্যাগেইন’।
ট্রাম্প নিজেও সামাজিক মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে লিখেছেন, ‘এসপ্রিয়েলা বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন।’
এসপ্রিয়েলার এক সমর্থক প্যাট্রিসিয়া বলেছেন, ‘আমরা এই দেশের হত্যাকাণ্ডে ক্লান্ত। বর্তমান সরকারের আমলাতন্ত্রেও বিরক্ত। অবশেষে উপকূলীয় অঞ্চলের একজন প্রেসিডেন্ট পেলাম।’
আরেক সমর্থক বলেছেন, ‘আমরা দ্য টাইগারকে নিয়ে গর্বিত। আমরা আশা করি তিনি কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দেশকে নতুন পথে এগিয়ে নেবেন।’
কে এই আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা?
আগে কোনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছিল না পেশায় আইনজীবী ও ব্যবসায়ী এসপ্রিয়েলার। নিজেকে ‘এল টাইগ্রে’ বা ‘বাঘ’ নামে পরিচয় দেন তিনি।
আইনজীবী হিসেবে তিনি ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ঘনিষ্ঠ সহযোগী অ্যালেক্স সাব এবং কলম্বিয়ার কুখ্যাত প্রতারক ডেভিড মুরসিয়া গুজমানের পক্ষে আইনি লড়াই করেছেন। এ বিষয়ে তার বক্তব্য, এটি ছিল একজন প্রতিরক্ষা আইনজীবী হিসেবে তার পেশাগত দায়িত্বের অংশ।
নিরাপত্তা নীতির কারণে অনেকেই তার সঙ্গে এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলের তুলনা করেন। এমনকি তাদের দাড়ির ধরন নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
নির্বাচনী সমাবেশ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি এবং তার সমর্থকেরা প্রায়ই জাতীয় ফুটবল দলের জার্সি পরেন এবং সামরিক কায়দার সালাম দেন। সমালোচকদের অভিযোগ, তিনি জাতীয় প্রতীককে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছেন।
কঠোর নিরাপত্তা নীতির প্রতিশ্রুতি
কলম্বিয়ার সশস্ত্র সংঘাত কয়েক দশকের পুরোনো হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা আরও তীব্র হয়েছে। ফার্কের বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠী, ইএলএন এবং ক্লান দেল গলফোসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ও মাদকচক্রের সদস্যসংখ্যা গত পাঁচ বছরে দ্বিগুণ হয়েছে।
মাদক পাচারের রুট এবং অবৈধ খনির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষের ফলে সহিংসতা বেড়েছে। গত বছর কলম্বিয়া-ভেনেজুয়েলা সীমান্তে সংঘর্ষের কারণে হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। বিশ্বের বৃহত্তম কোকেন উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে কলম্বিয়ায় কোকেন উৎপাদনও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।
এসপ্রিয়েলা বর্তমান প্রেসিডেন্ট পেত্রোর সর্বাত্মক শান্তি নীতিকে ব্যর্থ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তার দাবি, যুদ্ধবিরতির সুযোগ নিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিজেদের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ বিস্তৃত করেছে।
তিনি ক্ষমতায় গেলে এসব গোষ্ঠীর সঙ্গে চলমান আলোচনা বন্ধ করে কঠোর সামরিক অভিযান চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদারের কথাও বলেছেন।
এ ছাড়া তিনি জঙ্গলে বৃহৎ কারাগার নির্মাণ, রাষ্ট্রীয় ব্যয় সংকোচন এবং স্বাস্থ্য খাত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
ট্রাম্পের সমর্থন ও আঞ্চলিক প্রভাব
মিয়ামিতে দীর্ঘদিন বসবাস ও কাজ করার পর ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব লাভ করেন এসপ্রিয়েলা।
ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে সমর্থন জানিয়ে বলেছিলেন, তিনি অবৈধ অভিবাসন বন্ধ করবেন, অপরাধ ও মাদকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন এবং দেশে আইন-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবেন।
ট্রাম্প আরও বলেছেন, এসপ্রিয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ সমর্থন পাবেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এসপ্রিয়েলার বিজয় লাতিন আমেরিকাজুড়ে ডানপন্থি রাজনীতির উত্থানের ধারাবাহিকতার অংশ। নিরাপত্তা সংকটকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশ ডানপন্থি নেতৃত্বের দিকে ঝুঁকেছে।
আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই এসপ্রিয়েলার বিজয়কে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, সমৃদ্ধি ও কঠোর নিরাপত্তা নীতির পক্ষে জনগণের রায় হিসেবে অভিহিত করেছেন।
অন্যদিকে চিলির ডানপন্থি নেতা হোসে আন্তোনিও কাস্ট বলেছেন, ‘কলম্বিয়ার জন্য স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির নতুন অধ্যায় শুরু হলো।’
সূত্র: বিবিসি






