৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণে জর্জরিত বিশ্ব, মাথাপিছু কত?

ঋণের চাপ এখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে স্পষ্ট। ছবি : সংগৃহীত
বিশ্বের মোট ঋণের পরিমাণ ছাড়িয়ে গেছে ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই এই ঋণ বেড়েছে ১০ ট্রিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক অর্থবিষয়ক গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের (আইআইএফ) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে এখন প্রত্যেক মানুষের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪৪ হাজার ডলার।
এই ঋণের মধ্যে রয়েছে সরকার, পরিবার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঋণ। ঋণের বোঝা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুদ বাড়ছে পরিশোধের খরচও। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো গত এক বছরে সরকারি বন্ডের সুদ বাবদই ব্যয় করেছে ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। এই অর্থ বিশ্বের সামরিক খাতে মোট ব্যয়ের চেয়েও বেশি।
ঋণের চাপ এখন ইউরোপের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে স্পষ্ট। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি, আবাসনের উচ্চমূল্য এবং শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত অর্থের অভাব নিয়ে ইউরোপের দেশে দেশে চলছে বিক্ষোভ।
এসব বিক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে সরকারের ব্যয় সামলানোর সংকট। ঋণের সুদ মেটাতে বেশি অর্থ খরচ হওয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পেনশনের মতো খাতে কমছে ব্যয়ের সুযোগ।
সরকার সাধারণত অর্থ ধার করে বন্ড বিক্রি করে। বিনিয়োগকারীরা এসব বন্ড কিনে সরকারকে অর্থ দেন। বিনিময়ে সরকার নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সুদ দেয় এবং মেয়াদ শেষে মূল অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।
যেমন, কোনো বিনিয়োগকারী ১০০ ইউরো দিয়ে ১০ বছর মেয়াদি একটি সরকারি বন্ড কিনলেন। সুদের হার ২ দশমিক ৫ শতাংশ হলে তিনি প্রতি বছর ২ দশমিক ৫০ ইউরো পাবেন। ১০ বছরে মোট সুদ হবে ২৫ ইউরো। আর সুদের হার ৫ শতাংশ হলে বছরে ৫ ইউরো করে ১০ বছরে মোট ৫০ ইউরো সুদ পাবেন তিনি। মেয়াদ শেষে মূল ১০০ ইউরোও ফেরত পাবেন।
সরকারি বন্ডের সুদের হার বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি দেশের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ও অর্থনীতি পরিচালনার ওপর আস্থার গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বন্ডের দাম কমলে সাধারণত এর সুদের হার বেড়ে যায়। ফলে সরকারের নতুন ঋণ নেওয়ার খরচও বাড়ে।
এর প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে। ঋণের সুদ পরিশোধে সরকারের বেশি অর্থ ব্যয় হলে স্কুল, হাসপাতাল, সড়ক ও পেনশনের মতো খাতে ব্যয়ের জন্য অর্থ কমে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে তখন কর বাড়াতে বা ব্যয় কমাতে হয়।
ইউরোপের বড় অর্থনীতিগুলোর ১০ বছর মেয়াদি সরকারি ঋণের সুদের হার দুই দশকের বেশি সময় ধরে ৫ শতাংশের নিচে ছিল। ইউরোজোনের ঋণসংকটের সময় ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে গ্রিস, ইতালি ও স্পেনের মতো সংকটে থাকা দেশগুলোকে এ হার বা তার বেশি সুদ দিতে হয়েছিল। সুদের হার ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ায় আয়ারল্যান্ড ও পর্তুগালকে আন্তর্জাতিক সহায়তা নিতে হয়।
এখন ফ্রান্সকে ১০ বছর মেয়াদি ঋণের জন্য প্রায় ৫ শতাংশ সুদ দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে জার্মানির ক্ষেত্রে এই হার ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। দুই দেশের সুদের হারের এই ব্যবধান থেকে বোঝা যায়, ফ্রান্সকে ঋণ দিতে বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলক বেশি মুনাফা চাইছেন।
বর্তমানে যুক্তরাজ্য ছাড়া ইউরোপের অন্য বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে ফ্রান্সের ঋণ নেওয়ার খরচ সবচেয়ে বেশি। যুক্তরাজ্য ইউরোজোনের সদস্য নয়।
ফ্রান্সে ঋণের খরচ বাড়ার পেছনে দেশটির সরকারি অর্থব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটির সরকারি ঋণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১২১ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এতে সরকারি অর্থব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই পর্যায়ে ফিরিয়ে আনা আরও কঠিন হতে পারে।
মোট সরকারি ঋণের হিসাবে বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ ৪১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির জিডিপির ১২৭ শতাংশ।
বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা ডলারে ঋণ নেওয়ার সুবিধা পায় যুক্তরাষ্ট্র। এ কারণে দেশটির ঋণের প্রতি বিশ্ববাজারে চাহিদা রয়েছে। তবে এই সুবিধারও সীমা আছে।
সরকারি ঋণের পরিমাণের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে চীন। দেশটির ঋণ ২২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১০৪ শতাংশ। জাপানের সরকারি ঋণ ৮ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে জাপানের ঋণ জিডিপি অনুপাত সবচেয়ে বেশি ১৯৯ শতাংশ।
যুক্তরাজ্যের সরকারি ঋণ ৪ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দেশটির জিডিপির ১০২ শতাংশ। বিশ্বে সরকারি ঋণের পরিমাণের হিসাবে পঞ্চম স্থানে রয়েছে ফ্রান্স। দেশটির ঋণ ৪ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১১৮ দশমিক ৫ শতাংশ। ইতালির সরকারি ঋণ ৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার হলেও জিডিপির তুলনায় দেশটির ঋণের বোঝা বেশি ১৩৮ শতাংশ।
অন্যদিকে জার্মানির সরকারি ঋণ ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ৬৫ শতাংশ।
এখানে মোট ঋণের পরিমাণ ও অর্থনীতির তুলনায় ঋণের বোঝার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কোনো দেশের ঋণের অঙ্ক বড় হলেই যে তার অর্থনীতির তুলনায় ঋণের চাপও সবচেয়ে বেশি হবে, তা নয়। এ কারণে ঋণ-জিডিপি অনুপাতও গুরুত্বপূর্ণ।
ঋণ নেওয়ার পর তা পরিশোধের পাশাপাশি সুদ মেটানোও সরকারের জন্য বড় ব্যয়। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো গত এক বছরে সরকারি বন্ডের সুদ বাবদ ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করেছে।
এই অর্থ বিশ্বের সামরিক খাতে ব্যয় হওয়া ৩ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারের চেয়েও বেশি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে বিশ্বব্যাপী ২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়ের হিসাবও এর চেয়ে কম।
সরকারের সুদের খরচ বেড়ে গেলে জনসেবায় ব্যয়ের সুযোগ কমে যায়। স্কুল, হাসপাতাল ও পেনশনের মতো খাত এতে চাপের মুখে পড়তে পারে। ব্যয় মেটাতে সরকারকে কর বাড়াতে বা অন্য খাতে বরাদ্দ কমাতে হয়।
এ ছাড়া সরকারি ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে গেলে বাড়ি কেনার ঋণ, গাড়ির ঋণ ও ক্রেডিট কার্ডের সুদের হারও বাড়তে পারে। ফলে ঋণের চাপ শুধু সরকারের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থাকে না, তা পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়েও প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্র : আলজাজিরা



