পাকিস্তানের ক্ষমতার দাবায় নতুন চালের জল্পনা
ইমরানকে আবার প্রয়োজন সেনাপ্রধানের?

ছবি: রয়টার্স
এক দিকে প্রায় তিন বছর ধরে কারাবন্দি ইমরান খান, অন্য দিকে পাকিস্তানের সবচেয়ে ক্ষমতাধর সামরিক কর্মকর্তা ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। কয়েক বছর ধরেই দু’জনের সম্পর্ক কার্যত যুদ্ধের পর্যায়ে। অথচ গত কয়েক দিনে ইসলামাবাদের রাজনৈতিক অলিন্দে হঠাৎই নতুন প্রশ্ন, ইমরানের প্রতি কি কিছুটা নরম হচ্ছেন মুনির? পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ইমরানকে কারাগার থেকে হাসপাতালে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়ার পর সেই জল্পনা আরও জোরালো হয়েছে। এমনকি ইমরানের ঘনিষ্ঠ সহযোগীও জানিয়েছেন, মুক্তি পেলে তিনি সেনাবাহিনী বা মুনিরের সঙ্গে সংঘাতের পথে যাবেন না। তবে এখনও মুনির-ইমরানের মধ্যে কোনও সমঝোতা বা সরাসরি আলোচনার প্রমাণ নেই। বরং হাসপাতালে কয়েক ঘণ্টা রেখেই ইমরানকে ফের জেলে পাঠানোর সর্বশেষ ঘটনা দেখাচ্ছে, ‘বরফ গলা’ নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর সময় এখনও আসেনি।
এই সম্ভাব্য পরিবর্তনের ব্যাখ্যাই দিয়েছেন পাকিস্তানের সামরিক-রাজনীতি বিশ্লেষক ও কিংস কলেজ লন্ডনের গবেষক আয়েশা সিদ্দিকা। ২০ আগস্ট ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্টে প্রকাশিত একটি মতামত নিবন্ধে তার যুক্তি, ইমরানের স্বাস্থ্য নিয়ে সাম্প্রতিক কিছু ‘ছাড়’ নিছক মানবিক সিদ্ধান্ত নাও হতে পারে; পাকিস্তানের রাজনৈতিক কাঠামো নতুন করে সাজানোর বৃহত্তর পরিকল্পনায় ইমরান এবং তার পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফকে আবার প্রয়োজন হতে পারে ক্ষমতার কেন্দ্রের। তবে এটি সিদ্দিকার বিশ্লেষণ—পাকিস্তান সেনাবাহিনী বা মুনির এমন কোনও পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা করেননি।
জল্পনার সূত্র ১৮ আগস্টের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ। আদালত ৭৩ বছরের ইমরানকে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা জেল থেকে ইসলামাবাদের শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসার নির্দেশ দেয়। তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকসহ বিশেষজ্ঞদের একটি বোর্ড দিয়ে পরীক্ষা এবং পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত সাক্ষাতের সুযোগও দিতে বলা হয়। চোখের দৃষ্টিশক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ জানাচ্ছিল তাঁর পরিবার ও দল।
দ্য প্রিন্টের নিবন্ধে সিদ্দিকার বক্তব্য, পাকিস্তানের ক্ষমতার বাস্তবতায় এমন একটি সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে। তার ধারণা, ইমরানকে সামান্য স্বস্তি দেওয়া এক দিকে তাকে আলোচনায় বসার সংকেত হতে পারে, অন্য দিকে ক্ষমতাসীন পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) এবং পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) উপর চাপ তৈরির অস্ত্রও হতে পারে। কারণ জনপ্রিয়তার বিচারে ইমরান এখনও পাকিস্তানের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের একজন; তুলনামূলক অবাধ রাজনৈতিক সুযোগ পেলে তার দল অন্য প্রধান দলগুলোকে বড় চ্যালেঞ্জে ফেলতে পারে, এমনটাই তার বিশ্লেষণ।
ইমরানের শিবির থেকেও বদলাচ্ছে ভাষা?
জল্পনাকে আরও উসকে দিয়েছে ইমরানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী জুলফিকার বুখারির মন্তব্য। রয়টার্সকে তিনি বলেছেন, ইমরান যদি মুক্তি পান, তবে সেনাবাহিনী কিংবা আসিম মুনিরের সঙ্গে এমন কোনও সংঘাতে যাবেন না যা দেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। মুনির চাইলে দেশের ক্ষত সারাতে ‘হিলিং হ্যান্ড’ বা সমঝোতার হাত বাড়াতে পারেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। কয়েক বছর ধরে মুনিরের বিরুদ্ধে পিটিআইয়ের অত্যন্ত কঠোর ভাষার তুলনায় এটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।
তবে বুখারি নিজেই স্বীকার করেছেন, বর্তমানে পিটিআই ও সেনাবাহিনীর মধ্যে কোনও আলোচনা চলছে না। আর দীর্ঘদিন কার্যত বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকা ইমরান নিজে তার সহযোগীর এই অবস্থানের সঙ্গে একমত কি না, সেটিও জানা যায়নি। পিটিআই আবার ২৭ সেপ্টেম্বর ইসলামাবাদমুখী লং মার্চের কর্মসূচিও বহাল রেখেছে। দলের বক্তব্য, মামলাগুলোর দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গত নিষ্পত্তি এবং ইমরানের চিকিৎসা ও মুক্তির প্রশ্নে ‘বাস্তব অগ্রগতি’ না হলে কর্মসূচি বদলাবে না।
নেপথ্যে কি পাকিস্তানের মানচিত্র বদলের অঙ্ক?
দ্য প্রিন্টের নিবন্ধের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশটি পাকিস্তানের প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে চলা নতুন বিতর্ক। সিদ্দিকার দাবি, ক্ষমতার অন্দরে পাকিস্তানকে অনেকগুলো ছোট প্রশাসনিক এককে ভাগ করার বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। তার সূত্রের দাবি, ২০টি প্রশাসনিক এককের একটি ধারণাও আলোচনায় রয়েছে, পাঞ্জাব ও সিন্ধে পাঁচটি করে, খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তানে চারটি করে এবং গিলগিট-বালতিস্তান ও পাকিস্তানশাসিত কাশ্মীরে একটি করে। তবে এই নির্দিষ্ট ‘২০’-এর ছক সরকারিভাবে নিশ্চিত নয়।
স্বাধীন পাকিস্তানি সূত্রে অবশ্য বৃহত্তর বিতর্কটির সত্যতা মিলছে। ডন জানিয়েছে, নতুন প্রদেশ বা প্রশাসনিক একক তৈরির বিষয়টি ক্ষমতার উচ্চপর্যায়ে ‘গুরুতর বিবেচনায়’ রয়েছে এবং তা ভবিষ্যতের প্রস্তাবিত ২৮তম সাংবিধানিক সংশোধনীর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। তবে কতটি নতুন একক হবে, তা এখনও স্থির হয়নি; বিভিন্ন প্রস্তাবে সংখ্যাও আলাদা। এমনকি করাচি ও গোয়াদরকে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়া অথবা পাঞ্জাব ও খাইবার পাখতুনখোয়া ভাগ করার মতো ধারণাও আলোচনায় এসেছে।
এই বিতর্কের সূত্র আরও আগে। ৩০ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি প্রকাশ্যে বলেছিলেন, পাকিস্তানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা কার্যত ‘ধসে পড়েছে’ এবং উন্নত প্রশাসনের জন্য নতুন প্রদেশ বা প্রশাসনিক একক নিয়ে সব রাজনৈতিক দলের আলোচনায় বসা উচিত। পরে সেনাবাহিনীর মুখপাত্রও শাসনব্যবস্থার একটি ‘রিসেট’-এর প্রয়োজনের কথা বলেন, যদিও সিদ্ধান্তটি রাজনীতিকদের এবং সাংবিধানিক পথেই হতে হবে বলে তিনি স্পষ্ট করেন।
কিন্তু এখানেই বাধা পিপিপি, বিশেষ করে সিন্ধের রাজনীতি। প্রদেশ ভাঙার ধারণা সেখানে তীব্র স্পর্শকাতর। করাচির নিয়ন্ত্রণ, সিন্ধি ও মুহাজির জনগোষ্ঠীর পুরনো রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং প্রাদেশিক সম্পদের ভাগ–সব মিলিয়ে নতুন প্রশাসনিক এককের পরিকল্পনায় পিপিপির বড় আপত্তি রয়েছে। পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমও জানিয়েছে, নতুন প্রদেশ তৈরির পরিকল্পনা রাজনৈতিক ভাবে অত্যন্ত কঠিন এবং বড় দলগুলোর ঐকমত্য ছাড়া তা কার্যত অসম্ভব।
সিদ্দিকার বিশ্লেষণ এখানেই ইমরানকে ফিরিয়ে আনে। তার যুক্তি, পিপিপি যদি ২৮তম সংশোধনী বা নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর বিরোধিতা করে, তবে সংসদ ও প্রাদেশিক রাজনীতিতে পিটিআইয়ের সমর্থন ক্ষমতার কেন্দ্রের জন্য মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইমরানের সঙ্গে সমঝোতার দরজা খানিকটা খোলা রাখার রাজনৈতিক কারণ তৈরি হয়। আবার পিপিপি শেষ পর্যন্ত সমঝোতায় এলে ইমরানকে অতটা ছাড় দেওয়ার প্রয়োজনও নাও থাকতে পারে। এটি অবশ্য সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, কোনও ঘোষিত চুক্তি নয়।
বিদেশে সাফল্য, ঘরে অস্বস্তি?
দ্য প্রিন্টের নিবন্ধে আর একটি যুক্তি, সাম্প্রতিক সময়ে মুনির আন্তর্জাতিক মঞ্চে পাকিস্তানের গুরুত্ব বাড়াতে সফল হলেও দেশের ভিতরে সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ কাটেনি। ২০২৫ সালে ভারতের সঙ্গে সংঘাতের পর তার আন্তর্জাতিক প্রোফাইল বেড়েছে; মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতেও পাকিস্তান সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে। কিন্তু অর্থনীতি, শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক দমন নিয়ে সমালোচনার অনেকটাই শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর দিকেই যায় বলে সিদ্দিকার বিশ্লেষণ।
তবে ‘মুনির নরম হচ্ছেন’ তত্ত্বটির সামনে ইতিমধ্যেই একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে। আদালত ইমরানকে বেসরকারি শিফা হাসপাতালে পাঠানোর নির্দেশ দিলেও সরকার সেই নির্দেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন করে। শেষ পর্যন্ত তাকে শিফার বদলে সরকারি পিমস হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং কয়েক ঘণ্টা পর চিকিৎসকেরা ‘মেডিক্যালি ফিট’ ঘোষণা করলে আবার আদিয়ালা জেলে ফেরত পাঠানো হয়। পিটিআই একে আদালতের নির্দেশ লঙ্ঘন বলে অভিযোগ করেছে; সরকার বলছে, নিরাপত্তাজনিত কারণেই হাসপাতাল বদলাতে হয়েছে এবং জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন পাওয়া যায়নি।
ইমরান ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে কারাগারে। তার বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা হয়েছে। কয়েকটি বড় মামলার সাজা বাতিল বা স্থগিত হলেও আল-কাদির ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ১৪ বছরের সাজা এখন তার বন্দিত্বের প্রধান ভিত্তি। ইমরান অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন; সরকার ও সেনাবাহিনী সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে।
তাই পাকিস্তানের রাজনীতিতে এখন দু’টি বিপরীত ছবি পাশাপাশি। এক দিকে ইমরানের শিবির থেকে মুনিরের সঙ্গে সংঘাত কমানোর ভাষা, অন্য দিকে তাকে কয়েক ঘণ্টার চিকিৎসার পরই আবার কারাগারে ফেরানো। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন প্রদেশ ও ২৮তম সংশোধনী নিয়ে ক্ষমতার অন্দরের তৎপরতা।
মুনির সত্যিই ইমরানের দিকে সমঝোতার হাত বাড়াচ্ছেন, নাকি পাকিস্তানের রাজনৈতিক দাবার বোর্ডে বন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে আবার একটি শক্তিশালী ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করার কথা ভাবা হচ্ছে—এখনও তার নিশ্চিত উত্তর নেই। তবে তিন বছরের প্রবল বৈরিতার পর ইসলামাবাদে যে প্রথমবার ‘ইমরান-মুনির সমঝোতা’ কথাটিই আবার উচ্চারিত হচ্ছে, সেটাই আপাতত পাকিস্তানের রাজনীতির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন।






