বেলুচিস্তান
পাকিস্তানের সাত দশকের বিষফোঁড়া

মানচিত্রে বেলুচিস্তানের অবস্থান- এআই
সাত দশক খুব অল্প সময় নয়। এত দীর্ঘ সময় ধরে চলা একটি সংঘাত আবারও এসেছে আলোচনার কেন্দ্রে। বেলুচিস্তান। পাকিস্তানের সাত দশকের বিষফোঁড়া। দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার অন্যতম জটিল ভূরাজনৈতিক সংকটের প্রতীক। প্রাকৃতিক গ্যাস, তামা, সোনা, রেকো ডিকের বিপুল খনিজ সম্পদ এবং আরব সাগরের গোয়াদর বন্দরের কারণে অঞ্চলটি বিশ্বশক্তিগুলোর নজরে।
সম্প্রতি ‘স্বাধীন বেলুচিস্তান’র ঘোষণা দিয়েছেন বিদেশে অবস্থান করা বেলুচ নেতারা। আর এর মাঝেই ভূখণ্ডটিতে চলছে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযান। থেমে নেই বেলুচ লিবারেশন আর্মিও (বিএলএ), একের পর এক হামলা চালাচ্ছে তারাও। বেলুচিস্তান কি কেবল পাকিস্তানের একটি অস্থির প্রদেশ নাকি পুরনো এক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু? এর উত্তর অবশ্য আছে ইতিহাসের পাতায়।
বিভক্ত এক ভূখণ্ডের ইতিহাস
বর্তমান পাকিস্তানের একটি প্রদেশে সীমাবদ্ধ ছিল না ঐতিহাসিক গ্রেটার বেলুচিস্তান। এটি বিস্তৃত ছিল আজকের পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, ইরানের সিস্তান–বেলুচিস্তান প্রদেশ এবং আফগানিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু অংশজুড়ে। ঔপনিবেশিক আমলে বিভিন্ন সীমান্ত চুক্তি এবং পরে ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারতের বিভাজনের ফলে এই অঞ্চল তিনটি রাষ্ট্রের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। বর্তমানে সবচেয়ে বড় অংশ পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশ, যেখানে অধিকাংশ বেলুচ জনগোষ্ঠীর বসবাস এবং স্বাধীনতার দাবিও সবচেয়ে শক্তিশালী।
এক সময় কালাত রাজ্যের অধীনে ছিল বর্তমান বেলুচিস্তানের বড় অংশ। এটি ব্রিটিশ ভারতের একটি রাজ্য থাকলেও, কর্তৃত্ব ছিল বেলুচ শাসকদের। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে। কালাতের শাসক মীর আহমেদ ইয়ার খান স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে থাকার ঘোষণা দেন। তবে ১৯৪৮ সালের ২৭ মার্চ পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত হয় কালাত। পাকিস্তানের মতে, বৈধভাবেই হয় এই অন্তর্ভূক্তি। তবে বেলুচ জাতীয়তাবাদীদের দাবি, এই অন্তর্ভূক্তি ছিল রাজনৈতিক ও সামরিক চাপের ফল। এই ভিন্ন দাবি থেকেই মূলত বেলুচিস্তান বিতর্কের উত্থান।
বন্দুকের ছায়ায় সাত দশক
১৯৪৮ সালেই প্রথম বিদ্রোহ হয় বেলুচিস্তানে। যদিও তা সফল হয়নি। পরবর্তীতে ১৯৫৮, ১৯৬২ থেকে ১৯৬৩ সালে বড় বিদ্রোহ হয়। ফলে বার বার বারুদের স্তুপে পরিণত হয় বেলুচিস্তান। তবে বিশেষ করে ১৯৭৩ সালে জুলফিকার আলী ভুট্টো বেলুচিস্তানের নির্বাচিত সরকার ভেঙে দিলে কয়েক বছর ধরে চলে ব্যাপক সংঘর্ষ। ১৯৭০ দশকের গোড়ার দিকে সক্রিয় হয়ে ওঠে সশস্ত্র গোষ্ঠি বেলুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)। ২০০৬ সালে বিএলএকে নিষিদ্ধ করে পাকিস্তান। একই বছর প্রভাবশালী বেলুচ নেতা নওয়াব আকবর বুগতি নিহত হন। এর পরই নতুন গতি পায় বিএলএ। পেতে থাকে আন্তর্জাতিক মনযোগও।
ভূরাজনীতির দাবার ছক
২০১৫ সালে চালু হয় চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর। বেলুচিস্তানের গওয়াদর বন্দর চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ফলে চীনের কাছে বেলুচিস্তানও গুরুত্বপূর্ণ।
এটিকে দুই দেশ উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে দেখলেও বেলুচ জাতীয়তাবাদীদের দাবি ভিন্ন। তাদের মতে, বেলুচ ভূখণ্ড ও সম্পদ ব্যবহার করলেও এর সুফল বঞ্চিত স্থানীয় জনগোষ্ঠি। ফলস্বরূপ চীনা প্রকৌশলী ও বিভিন্ন অবকাঠামো সশস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। বিএলএসহ বিভিন্ন গোষ্ঠির হামলা ও পাকিস্তানি নিরাপত্তাবাহিনীর অভিযানে উত্তপ্তই থাকে বেলুচিস্তান।
ইরান, আফগানিস্তান ও আরব সাগরের মধ্যবর্তী স্থলে অবস্থান বেলুচিস্তানের। জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালির খুব কাছে। ফলে এর কৌশলগত মূল্য অনেক। চীনের জন্য এটি ভারত মহাসাগরে প্রবেশদ্বার। পাকিস্তানের জন্য অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের অন্যতম ভিত্তি। রেকো ডিকের মতো বৃহৎ তামা ও সোনার খনি অঞ্চলটিকে করে তুলেছে আরও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এখানকার অস্থিতিশীলতা চীন, আফগানিস্তান, ইরান, ভারত এমনকি বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসেফিক কৌশলের সঙ্গেও জড়িয়ে।
এরপর কোন পথে বেলুচিস্তান?
বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বেলুচিস্তানের ভবিষ্যৎ অনুমান করা বেশ কঠিন। তবে তিনটি সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যেতে পারে অঞ্চলটি। প্রথমত, স্বাধীনতার দাবিতে সশস্ত্র হামলা আরও বিস্তৃতি পেতে পারে। যার ফলে পাকিস্তানের নিরাপত্তা অভিযান হতে পারে আরও কঠোর। যা দীর্ঘস্থায়ী করে তুলবে সংঘাতকে।
দ্বিতীয়ত, অধিকতর স্বায়ত্তশাসন, রাজনৈতিক সংলাপ এবং সম্পদের ন্যায্য বণ্টনের মতো বিষয়গুলোতে সমঝোতা হলে কমতে পারে উত্তেজনা। যা ধীরে ধীরে নিয়ে যেতে পারে শান্তির পথে।
তৃতীয়ত, যদি সংঘাত বিস্তৃতি লাভ করে এর প্রভাব হবে ব্যাপক। পাকিস্তানের স্থিতিশীলতার পাশাপাশি চীনে কৌশলগত বিনিয়োগ, আঞ্চলিক বাণিজ্য এমনকি দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও পড়বে এর গভীর প্রভাব।
শুধু পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই আটকে নেই বেলুচিস্তান ইস্যু। এই ভূরাজনৈতিক সমীকরণে ইতিহাস, জাতিগত পরিচয়, বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ, চীনের কৌশলগত বিনিয়োগ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন এসে মিলেছে এক বিন্দুতে। তাই কেবল ইসলামাবাদ বা বেলুচ বিদ্রোহীরাই বেলুচিস্তানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না। দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার বৃহত্তর কৌশলগত বাস্তবতাও প্রভাব ফেলবে বেলুচিস্তানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে।




