বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি হারাবে তক্ষশিলা!

সংরক্ষণ মানে ধ্বংসাবশেষকে নতুন করে সাজিয়ে তোলা নয়
পাকিস্তানের তক্ষশিলা কেবল প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের সমষ্টি নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক ভূদৃশ্য এবং এখানে বিকশিত প্রাচীন সভ্যতার অনন্য সাক্ষ্য। এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে মোহরা মোরাদু (গান্ধার যুগের সবচেয়ে ভালোভাবে সংরক্ষিত বৌদ্ধ বিহারগুলোর একটি) এবং সিরকাপ (একটি প্রাচীন নগর, যার গ্রিডভিত্তিক পরিকল্পনা ও স্থাপত্যে গ্রিক, পারস্য ও দক্ষিণ এশীয় প্রভাবের অসাধারণ সমন্বয় দেখা যায়)।
এসব স্থাপনার গুরুত্ব শুধু তাদের প্রাচীনত্বে নয়, বরং তাদের মৌলিক বৈশিষ্ট্য ও সত্যতায়। এই সত্যতাই তক্ষশিলাকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা এনে দিয়েছে। আর এখন সেই সত্যতাই প্রশ্নের মুখে।
খবরে বলা হয়েছে, ইউনেস্কোর মতে, এই দুই স্থানে সাম্প্রতিক কাজ সংরক্ষণের সীমা ছাড়িয়ে পুনর্নির্মাণে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আধুনিক গাঁথুনির মাধ্যমে মূল দেয়ালের অংশ প্রতিস্থাপন করা হয়েছে বা উঁচু করা হয়েছে।
ইউনেস্কোর সতর্কবার্তা, এই ক্ষতিকর হস্তক্ষেপ প্রত্যাহার না করা হলে তক্ষশিলাকে ‘ঝুঁকিতে থাকা বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায়’ অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। এমনকি চূড়ান্তভাবে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদাও হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা হারানো হবে সাংস্কৃতিক ও কূটনৈতিক উভয় দিক থেকেই এক বড় বিপর্যয়, বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন দেশটি আরও কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের চেষ্টা করছে
অবশ্য পাঞ্জাবের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, এসব কাজ ছিল সংরক্ষণমূলক উদ্যোগের অংশ, যার উদ্দেশ্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাগুলো স্থিতিশীল রাখা এবং আরও ক্ষয় রোধ করা।
স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়ন ছাড়া কোনো পক্ষের বক্তব্যই চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়া সমীচীন নয়। তবে ইউনেস্কো যে ঐতিহ্যগত প্রভাব মূল্যায়ন, সামঞ্জস্য যাচাই, পরীক্ষাগার পরীক্ষা, নকশা এবং কাজের আগে ও পরের নথিপত্র চেয়েছে, তা স্পষ্ট করে তাদের উদ্বেগ উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
পাকিস্তানের উচিত বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দেখা। ‘ঝুঁকিতে থাকা বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায়’ অন্তর্ভুক্ত হওয়াই হবে বড় ধরনের অস্বস্তিকর ঘটনা। আর বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা হারানো হবে সাংস্কৃতিক ও কূটনৈতিক উভয় দিক থেকেই এক বড় বিপর্যয়, বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন দেশটি আরও কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনের চেষ্টা করছে।
সংরক্ষণ মানে ধ্বংসাবশেষকে নতুন করে সাজিয়ে তোলা নয়। সংরক্ষণের মূল উদ্দেশ্য হলো মূল কাঠামোকে অক্ষুণ্ন রাখা, নতুন সংযোজন যতটা সম্ভব সীমিত রাখা, প্রতিটি কাজ যথাযথভাবে নথিভুক্ত করা এবং প্রয়োজনে সেগুলো অপসারণের সুযোগ রাখা।
সরকারের উচিত ইউনেস্কোর কাছে প্রয়োজনীয় সব নথি দ্রুত হস্তান্তর করা, নতুন কাজ আপাতত স্থগিত রাখা, স্বাধীন সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞদের দিয়ে স্থাপনাগুলো পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা এবং যেসব হস্তক্ষেপে ঐতিহাসিক সত্যতা ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে প্রমাণ মিলবে, সেগুলো প্রত্যাহার করা।
তক্ষশিলার অতীত একবার বদলে গেলে তা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তাই একে রক্ষা করা ইউনেস্কোর প্রতি কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি পাকিস্তানের নিজের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়িত্ব।
সম্পাদকীয় থেকে অনূদিত





