জাতিসংঘে কী ভাষণ দিলেন বালেন্দ্র শাহ, যা নিয়ে এত আলোচনা

জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। ছবি: জাতিসংঘ
দেড় বছর আগে বালেন্দ্র শাহ কি ভেবেছিলেন, নেপালের প্রধানমন্ত্রী হবেন তিনি? সেই প্রায় অসম্ভবকে সম্ভব করে দিয়েছে জেন জি প্রজন্মের এক অভ্যুত্থান। তা তাকে নিয়ে গেছে ক্ষমতার কেন্দ্রে; আর সেই হাওয়ায় তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল জাতিসংঘের মঞ্চে ।
গত বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে সর্বকনিষ্ঠ সরকারপ্রধান হিসেবে ৩৬ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ যে ভাষণ দিয়েছেন, তার প্রশংসা ঝরছে সবার কণ্ঠে। তার সেই ভাষণের সঙ্গে আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে লেখা সিয়াটল চিফের চিঠির সমরূপতা খুঁজে ফিরছেন অনেকে। যে চিঠিতে রেড ইন্ডিয়ানদের সর্দার প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন পিয়ার্সকে বলেছিলেন, ‘তোমরা আকাশও কেনা-বেচা করতে চাইছ! কেমন করে?’
১৮৫৫ সালে প্রেসিডেন্ট পিয়ার্স এমন কোনো চিঠি আসলে পেয়েছিলেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে; তবে তার প্রায় দুইশ বছর পর সেই যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বালেন্দ্র শাহর ভাষণে ছিল সেই সুর।
‘জলবায়ু পরিবর্তন কোনো সীমান্ত মানে না … হিমবাহ ও বন্যার পানির পাসপোর্ট-ভিসা লাগে না’- এমন বক্তব্যের মধ্যদিয়ে বিশ্বনেতাদের জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাকচ দিক সতর্ক করেছেন বালেন্দ্র শাহ।
তবে এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে দায় খুব কম থাকলেও নেপালের মতো দেশগুলোকেই যে ভুগতে হচ্ছে, তাও দেখিয়েছেন তিনি। জলবায়ু ন্যায়বিচারের দাবি তিনি তুলেছেন। আর সেই দাবি তুলতে গিয়ে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর নামও নিয়েছেন তিনি।
তরুণ প্রজন্মের পক্ষ থেকে সততা ও জবাবদিহির রাজনীতির দাবি বিশ্বমঞ্চে তুলেছেন বালেন্দ্র শাহ। যে বিশ্বব্যবস্থা দুর্বলদের আরো দুর্বল করে তুলছে, তার সংস্কারের কথাও তিনি বলেছেন।
নিজের দেশে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া দুর্যোগের ক্ষত দিয়েই ভাষণ শুরু করে বালেন্দ্র শাহ। তিনি বলেন, ‘আমি আপনাদের সামনে এসেছি হিমালয়কন্যা নেপাল থেকে, সঙ্গে নিয়ে এসেছি মানবজাতির জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা। আজ এখানে দাঁড়িয়ে যদি শুধু উন্নয়ন, গণতন্ত্র, শান্তি এবং নবীন একটি রাষ্ট্রের আশার কথা বলতে পারতাম, তাহলে ভালো লাগত। কিন্তু তার পরিবর্তে আমাকে বলতে হচ্ছে বিপুল মৃত্যু ও ধ্বংসের কথা।’
গত মাসে নেপালে হড়পা বানে ভেসে যায় বিস্তীর্ণ জনপদ। তাতে দেড় হাজার মানুষের সলিল সমাধি হয়, এখনো নিখোঁজ রয়েছে ৬ হাজার জন। সেখানে কাদা, পাথর ও পানির মধ্যে এখনো যে স্বজনের খোঁজ চলছে, সে কথাও তুলে ধরেন বালেন্দ্র শাহ।
তিনি বলেন, কয়েক মিনিটের এই ধ্বংসযজ্ঞ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের পথে থাকা নেপালকে যে থমকে দিয়েছে, তাও বলেন তিনি।
এই দুর্যোগ শুধু স্থানীয় কোনো ট্র্যাজেডি নয়, এটি গোটা বিশ্বের জন্য সতর্কবার্তা। কিন্তু আমরা কি সত্যিই সেই সতর্কবার্তা শুনেছি?’ বিশ্বনেতাদের প্রশ্ন ছোড়েন বালেন্দ্র শাহ।
প্রায় তিন বছর আগে মাউন্ট এভারেস্টের কোলে দাঁড়িয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস যে মানবজাতিকে আসন্ন জলবায়ু বিপর্যয়ের উন্মত্ততা সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন, তা মনে করিয়ে দিয়ে বালেন্দ্র শাহ বলেন, কিন্তু সেই সতর্কবার্তা মন দিয়ে শোনা হয়নি। নেপালে আমরা শুনেছিলাম, বিজ্ঞানীরাও তা শুনেছিলেন। তারা বারবার সতর্কও করেছিলেন। কিন্তু বিশ্বের রাজনৈতিক নেতারা সেই সতর্কবার্তাকে আমলে নিয়ে কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
নিজের দেশের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, উষ্ণ হয়ে ওঠা জলবায়ু হিমালয়ের প্রতিবেশব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। গলতে থাকা হিমবাহের নিচের পাহাড়ের ঢালগুলোতে ফাটল সৃষ্টি করছে এবং বরফ-পাথরের ধস, বন্যা, ভূমিধস ও অন্যান্য ধারাবাহিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
‘কিন্তু এই দুর্যোগ নেপালের সীমানার বাইরেও কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা আমাদের বুঝতে হবে। বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নেপালের অবদান ০.১ শতাংশেরও কম। আমরা এই সংকট তৈরি করিনি। অথচ এর জন্য আমাদেরই চরম মূল্য দিতে হচ্ছে,’ বলেন তিনি।
সড়ক, সেতু, স্কুল, ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও মানুষের জীবিকা ধ্বংস হওয়ায় নেপালেকে এখন ঋণ করতে হবে। কিন্তু এই ক্ষতির দায় নেপালের নয়, বলেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী।
সামগ্রিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরলেও কোনো দেশ বা মহাদেশকে দোষারোপ করার উদ্দেশ্য নয়, তা স্পষ্ট করেন বালেন্দ্র শাহ। তার ভাষায়, তিনি চাইছেন সবাইকে অভিন্ন দায়িত্ব ও সংহতির প্রতি নতুন করে অঙ্গীকার করার আহ্বান জানাতে।
সেই সঙ্গে মনে করিয়ে দেন, যারা ঐতিহাসিকভাবে এই সমস্যায় বেশি অবদান রেখেছে এবং যাদের সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বেশি, তাদের আরও বেশি দায়িত্ব নিতে হবে। জলবায়ু ন্যায়বিচার জাতিসংঘের কোনো নথির বোলচাল হয়ে থাকলে চলবে না।
হিমালয়কে পৃথিবীর ‘লাইফ-সাপোর্ট সিস্টেমের একটি অংশ’ হিসেবে নিয়ে জরুরি প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে নেপাল, ভারত ও চীনের নেতৃত্বে একটি ‘হিমালয়ান ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স মেকানিজম’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেন বালেন্দ্র শাহ।
তার দৃষ্টিতে, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে স্যাটেলাইট তথ্য ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞান ভাগাভাগি করে বিপজ্জনক হিমবাহ-হ্রদগুলো পর্যবেক্ষণ করা যায়। তাতে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে।
স্বল্পোন্নত দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দিলেও বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট মোকাবেলার কাজটি যে নেপাল একা এগিয়ে নিতে পারবে না, তা তুলে ধরেন তিনি।
সঙ্কট মোকাবেলায় ছয়টি শব্দ উচ্চারণ করে সেগুলোতে জোর দিতে সাধারণ পরিষদের প্রতি আহ্বান রাখেন নেপালি প্রধানমন্ত্রী। সেগুলো হলো- ত্রাণ, পুনর্বাসন, পুনর্গঠন, দায়িত্ব, ক্ষতিপূরণ ও স্থিতিস্থাপকতা।
বালেন্দ্র শাহ বলেন, জলবায়ু দুর্যোগ যখন একটি দরিদ্র দেশের অবকাঠামো ধ্বংস করে, তখন এর সমাধান শুধু আরেকটি বড় ঋণ বা খণ্ড খণ্ড ছোট অনুদান হতে পারে না।
জলবায়ু ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় কেন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা চান, তা ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় অসাম্যের বিষয়টি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন তিনি।
জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাকালীন প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে বালেন্দ্র শাহ বলেন, ‘প্রতিশ্রুতি ছিল সার্বভৌমত্ব গুরুত্বপূর্ণ হবে, আন্তর্জাতিক আইন গুরুত্বপূর্ণ হবে,
প্রতিটি মানুষের মর্যাদা গুরুত্বপূর্ণ হবে, আর শক্তিশালীরা যা সিদ্ধান্ত নেবে, দুর্বলদের তা শুধু মেনে নিতে হবে—এমনটা হবে না।
‘আজ সেই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা চাপের মুখে। প্রায়ই সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তিই নির্ধারণ করে কার কণ্ঠ শোনা হবে। নেপাল মনে করে, আমাদের আরও ন্যায়সংগত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রয়োজন।’
বিশ্বের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার নেপাল যে কতটা চাপে রয়েছে, তা তুলে ধরেন তিনি।
‘এই বর্ষায় নেপালের একজন দরিদ্র কৃষক যখন বীজ বপন করতে গেলেন, তখন সময়মতো সার পাননি। আমরা যখন নতুন মহাসড়ক নির্মাণ করতে চাইলাম, তখন বিটুমিন পাওয়া গেল না। একটি পরিবার যখন সন্ধ্যার খাবার খেতে বসল, তখন রান্নার জ্বালানির সংকট ছিল।’
বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা দরিদ্র মানুষকে এমন সব শাস্তি দিচ্ছে বলে মন্তব্য করে তার বিপরীত দিক দেখিয়ে বালেন্দ্র শাহ বলেন, অখচ আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র সময়মতো পৌঁছে যায়। রাইফেল ও গোলাবারুদ সীমান্ত পেরোয়, প্রতিটি বাধা অতিক্রম করে।
‘আমরা এমন একটি বিশ্ব তৈরি করেছি, যেখানে যুদ্ধের জন্য নিখুঁত সরবরাহব্যবস্থা আছে, কিন্তু খাদ্যের জন্য সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে,’ বলার পরই তিনি যোগ করেন, ‘এটি শুধু নেপালের নিজস্ব দুর্ভাগ্য নয়। বাংলাদেশকে জিজ্ঞাসা করুন, ভুটানকে জিজ্ঞাসা করুন, ভারতকে জিজ্ঞাস করুন, মালদ্বীপকে জিজ্ঞাস করুন, পাকিস্তানকে জিজ্ঞাসা করুন, শ্রীলঙ্কাকে জিজ্ঞাস করুন। আমাদের অঞ্চলের অন্য যেকোনো দেশকে জিজ্ঞাসা করুন। একই কথা শুনবেন—জলবায়ু আমরা উষ্ণ করিনি, সেই জলবায়ুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি; আবার যে যুদ্ধ আমরা শুরু করিনি, তারও আঘাত পেয়েছি।’
সাধারণ পরিষদে সবচেয়ে কম বয়সী সরকারপ্রধান হিসেবে তার আসার বিষয়টি আলোচনায় থাকুক, তা চান না বালেন্দ্র শাহ। তার চাওয়া, এই মঞ্চ থেকে যেন কিছু বিষয় স্পষ্ট করা হয়। যেমন যে দেশ মূল্য পরিশোধ করতে প্রস্তুত, তার যেন প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার সুযোগ থাকে।
তার মতে, এমন একটি জাতিসংঘ প্রয়োজন, যেখানে ছোট ও দরিদ্র দেশগুলো গুরুত্ব পাবে, সবাই মিলে ন্যায়সঙ্গত ফলাফলের অর্জনে কাজ করা যাবে।
বালেন্দ্র শাহ বলেন, গভীর বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে নেপালের তরুণরা সততা ও জবাবদিহির রাজনীতির দাবি তুলেছে। এই প্রজন্মগত পরিবর্তন শুধু জাতীয় কোনো ঘটনা নয়, এটি সংঘাত, বৈষম্য ও সুযোগের অভাবের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে জেগে ওঠারই একটি অংশ।
‘আসুন, আমরা সেই বৈশ্বিক ব্যবস্থা সংস্কার করি, যেখানে সবচেয়ে দুর্বলদের হাতেই সবচেয়ে কম ক্ষমতা থাকে … আর যখন পৃথিবীর ছাদ থেকে নতুন দুর্যোগের বিপদঘণ্টা আসে, আসুন, আমরা তা শুনে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্যও তৈরি থাকি,’ আহ্বান জানান তিনি।



