সমঝোতা প্রস্তাবের মধ্যেই ইরানে মার্কিন হামলা
- পরমাণু নীতি বদলের প্রস্তুতির ইঙ্গিত তেহরানের
- কাজ চলছে ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা বাড়ানোর

হরমুজের আকাশে আবার বিস্ফোরণের শব্দ। তেহরান থেকে এলো পরমাণু নীতি বদলের সম্ভাবনার বার্তা। আর দোহা জানাল, শান্তির আলোচনা ভেঙে পড়েনি। একই মানচিত্রে যেন পাশাপাশি দুটি ছবি। একটিতে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত। অন্যটিতে সমঝোতার খসড়া। যুদ্ধের গর্জন কি শেষ পর্যন্ত কূটনীতির কণ্ঠও রুদ্ধ করে দেবে?
গতকাল শনিবার ইরানের ফারস নিউজে প্রকাশিত বক্তব্যে ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ডের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেবি বলেছেন, ‘দেশের নেতৃত্ব পরমাণু নীতি সংশোধনের সিদ্ধান্ত নিলে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হবে।’ তবে এটি নীতি পরিবর্তনের ঘোষণা নয়। কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে, তাও জানাননি তিনি।
মোহেবির আরও দাবি, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা বাড়ানোর কাজ চলছেই। প্রতিপক্ষকে ভৌগোলিক সীমার বাইরে জবাব দেওয়ার নির্দেশের প্রেক্ষাপটে তিনি এ কথা বলেছেন। এর আগে সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজায়ি জানিয়েছেন, পরমাণু নীতিতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা বিবেচিত হচ্ছে। তবে সিদ্ধান্ত হয়নি।
এমন উত্তেজনার মধ্যেই নতুন মার্কিন হামলা। এদিনই রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় সীমিত হামলার কথা স্বীকার করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপের সুজা এলাকায় দুটি বিস্ফোরণ ঘটেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, উড়োজাহাজের শব্দের পর দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে।
এ হামলাকে ‘ছোট পরিসরের’ বলে বর্ণনা করেছেন ট্রাম্প। তার দাবি, একটি বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ‘১৫ মিনিটে, হয়তো ৫ মিনিটেই’ ধ্বংস করেছে মার্কিন বাহিনী। আগের রাতে কেশমের আকাশে মার্কিন চালকবিহীন উড়োজাহাজ ভূপাতিত করার দাবি করে ইরান। তবে স্বাধীনভাবে সে দাবি নিশ্চিত হয়নি। অথচ যুদ্ধের এই উত্তাপেও সমঝোতার চেষ্টা থামেনি বলে জানিয়েছে কাতার। আরব নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার খবরকে ‘মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর’ বলেছে দোহার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম দপ্তর। তাদের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ‘ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত’ করা হয়েছে। কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান আল থানি বলেছেন, ‘নিখুঁত চুক্তির অপেক্ষায় থাকা যায় না। আমরা একটি ভালো চুক্তি চাই।’ তার মতে, মধ্যস্থতায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ট্রাম্পও বলেছেন, ‘আমরা ইরানের সঙ্গে কথা বলছি।’ আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, কাতারের প্রস্তাবে প্রথমে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার ও জব্দ ইরানি অর্থের একাংশ ছাড়ের বিনিময়ে আক্রান্ত পরমাণু স্থাপনায় আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের প্রবেশাধিকারের কথা রয়েছে। এরপর সাময়িক ব্যবস্থায় হরমুজ প্রণালি খুলে বৃহত্তর আলোচনার পরিকল্পনা। তবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ক্ষতিপূরণ ও আঞ্চলিক হামলা বন্ধের শর্তে অনড় ইরান। যুক্তরাষ্ট্রও প্রস্তাবিত সব ব্যবস্থায় সম্মতি দেয়নি। আট মাসের বেশি সময়ের সংঘাতের কেন্দ্রে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার হিসাবে, দেশটির কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ৪৪০ দশমিক ৯ কিলোগ্রাম ইউরেনিয়াম রয়েছে। অস্ত্র তৈরির উপযোগী মাত্রা প্রায় ৯০ শতাংশ। তেহরান অবশ্য এই কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ বলে দাবি করে। প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খোমেনির পরমাণু অস্ত্র নিষিদ্ধের ধর্মীয় নির্দেশও স্মরণ করায় দেশটি। কেশমের আকাশে বিস্ফোরণ থামলেও অনিশ্চয়তা কাটেনি। দোহার হাতে সমঝোতার প্রস্তাব। তেহরানের সামনে পরমাণু নীতির প্রশ্ন। ওয়াশিংটনের হাতে হামলার সিদ্ধান্ত। এই তিন বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্য। শেষ পর্যন্ত কোন ভাষা জয়ী হবে? আলোচনার টেবিলে রাখা শান্তির প্রতিশ্রুতি, নাকি যুদ্ধের আকাশে ছুটে যাওয়া আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র?



