মহাবিশ্বের ‘বার্তাবাহক’ নিউট্রিনো

ফ্রান্সিস হ্যালজেন
মহাকাশের অনেক দূর থেকে ছুটে আসা এক অদৃশ্য কণার পেছনে ছুটতে ছুটতেই বদলে গেল মহাবিশ্বকে দেখার পদ্ধতি। চোখে দেখা যায় না, আলোতেও ধরা পড়ে না, অথচ প্রতি মুহূর্তে কোটি কোটি এমন কণা পৃথিবী পেরিয়ে যাচ্ছে। সেই অধরা কণা ‘নিউট্রিনো’কে ধরার স্বপ্ন দেখেছিলেন বেলজিয়ামে জন্ম নেওয়া পদার্থবিদ ফ্রান্সিস হ্যালজেন।
দক্ষিণ মেরুর বরফকে বিশাল এক ‘টেলিস্কোপ’ হিসেবে ব্যবহার করে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথ দেখিয়েছেন ফ্রান্সিস হ্যালজেন। তার এই বৈজ্ঞানিক দূরদর্শিতা এবং আইসকিউব নিউট্রিনো পর্যবেক্ষণকেন্দ্র গড়ে তোলায় নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন হ্যালজেন।
গতকাল মঙ্গলবার স্টকহোমে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস হ্যালজেনের নাম ঘোষণা করেছে। নোবেল কমিটির ভাষায়, তিনি পুরস্কার পেয়েছেন আইসকিউব নিউট্রিনো পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান এবং জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক উৎস থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো আবিষ্কারের জন্য।
৮২ বছর বয়সী হ্যালজেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসনের অধ্যাপক। ১৯৪৪ সালে বেলজিয়ামের টিয়েনেনে জন্ম তার। একক বিজয়ী হিসেবে তিনি পাবেন ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনার। নিউট্রিনোকে অনেক সময় বিজ্ঞানীরা ‘ঘোস্ট পার্টিকেল’ বা ‘ভুতুড়ে কণা’ বলে থাকেন। কারণ, এরা প্রায় কোনো কিছুর সঙ্গেই মিথস্ক্রিয়া করে না। বৈদ্যুতিক চার্জ নেই, ভর অত্যন্ত সামান্য এবং পদার্থের ভেতর দিয়ে প্রায় বাধাহীনভাবে চলে যেতে পারে।
সূর্য থেকে আসা বিপুলসংখ্যক নিউট্রিনো প্রতি মুহূর্তে পৃথিবী ও আমাদের শরীর ভেদ করে চলে যাচ্ছে। নোবেল প্রাইজের একটি ব্যাখ্যামূলক নিবন্ধে বলা হয়েছে, মানুষের একটি নখের সমান জায়গা দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১০০ বিলিয়ন সৌর নিউট্রিনো অতিক্রম করতে পারে। অথচ মানুষ তার কিছুই টের পায় না।
এই বৈশিষ্ট্যই আবার বিজ্ঞানীদের কাছে নিউট্রিনোকে এত মূল্যবান করে তুলেছে। আলো বা অন্য কণার তুলনায় নিউট্রিনো মহাবিশ্বের গভীরতম ও সবচেয়ে সহিংস অঞ্চল থেকেও প্রায় অক্ষত অবস্থায় পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারে। ফলে তারা যেন দূর মহাকাশের ঘটনাগুলোর সরাসরি বার্তাবাহক।
কিন্তু সমস্যা হলো— যে কণা অন্য সবকিছুকে প্রায় এড়িয়ে চলে, তাকে ধরা যাবে কীভাবে? ১৯৮৮ সালে ফ্রান্সিস হ্যালজেন ও জন লার্নড গভীর মেরু-বরফ ব্যবহার করে উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করার ধারণা দেন। তাদের ভাবনা ছিল অভিনব, প্রচলিত কোনো যন্ত্র দিয়ে নিউট্রিনোকে সরাসরি ধরার বদলে বরফকেই বানানো হবে বিশাল এক কণা শনাক্তকারী।
নিউট্রিনো খুব কম ক্ষেত্রেই বরফের পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। যখন এমন সংঘর্ষ ঘটে, তখন সৃষ্ট উচ্চশক্তির চার্জযুক্ত কণা বরফের ভেতর দিয়ে ছুটে গিয়ে এক ধরনের ক্ষীণ নীলচে আলো ‘চেরেনকভ আলো’ তৈরি করতে পারে। বরফের গভীরে বসানো আলোক-সংবেদী সেন্সর সেই আলোর ঝলক ধরে ফেলে। এরপর বিজ্ঞানীরা আলোর গতিপথ, সময় ও শক্তি বিশ্লেষণ করে অনুমান করতে পারেন, কোথা থেকে নিউট্রিনোটি এসেছে।
এ ধারণা থেকেই ধীরে ধীরে তৈরি হয় আইসকিউব নিউট্রিনো পর্যবেক্ষণকেন্দ্র। দক্ষিণ মেরুর বরফের প্রায় এক ঘনকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই বিশাল বৈজ্ঞানিক অবকাঠামোতে রয়েছে ৮৬টি স্ট্রিং এবং ৫ হাজার ১৬০টি আলোক-সেন্সর। এগুলো বরফের প্রায় ১ হাজার ৪৫০ থেকে ২ হাজার ৪৫০ মিটার গভীরে স্থাপন করা হয়েছে। অর্থাৎ, দক্ষিণ মেরুর বরফের বিশাল এক অংশই হয়ে উঠেছে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ নিউট্রিনো টেলিস্কোপ।



