পাদপ্রদীপের আলোয় দক্ষিণ কোরিয়ার ট্যাটুশিল্পীরা

ট্যাটু শিল্পী কিম তে-নামের ভাষ্য, তিনি বছরের পর বছর ধরে এই দিনটির অপেক্ষা করে আসছিলেন
দক্ষিণ কোরিয়ার রক্ষণশীল সমাজে এতদিন ‘ট্যাটু’ বা শরীরে নকশা আঁকাকে দেখা হতো অপরাধ বা গ্যাংস্টারদের কাজ হিসেবে। এমনকি গত ৩৪ বছর ধরে দেশটিতে সাধারণ কোনো মানুষের ট্যাটু আঁকার ওপর কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞা ছিল। কোরিয়ার আইন অনুযায়ী, ট্যাটু আঁকা ছিল একটি চিকিৎসাসংক্রান্ত কাজ অর্থাৎ শুধু সার্টিফাইড ডাক্তাররাই সুই দিয়ে শরীরে ট্যাটু আঁকতে পারতেন! কোনো সাধারণ ট্যাটুশিল্পী এই কাজ করলে তাকে মোটা অঙ্কের জরিমানা থেকে শুরু করে জেল খাটতে হতো।
কিন্তু দীর্ঘ কয়েক দশকের আন্দোলন এবং আইনি লড়াইয়ের পর অবশেষে কোরিয়ার সুপ্রিম কোর্ট এই পুরনো আইনকে বাতিল ঘোষণা করে সাধারণ ট্যাটুশিল্পীদের বৈধতা দিয়েছে। এই ঐতিহাসিক রায় উদযাপনে সিউলের একটি ভবনের ছাদে বসেছিল কোরিয়ার বিখ্যাত ‘ইঙ্ক বম্ব’ ট্যাটু উৎসব, যেখানে শত শত শিল্পী ও কোরিয়ান তরুণ-তরুণী কোনো আইনি ভয় ছাড়াই আনন্দ উল্লাসে মেতে ওঠেন।
আইনগতভাবে নিষিদ্ধ থাকায় কোরিয়ার ট্যাটুশিল্পীদের এতদিন সাইন বোর্ড ছাড়া গোপন বেসমেন্টে বা আন্ডারগ্রাউন্ডে লুকিয়ে কাজ করতে হতো। আর এই সুযোগ নিয়ে অনেক অসৎ গ্রাহক পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তরুণী ট্যাটুশিল্পীদের ব্ল্যাকমেইল, মারধর এমনকি যৌন হয়রানিও করত। ট্যাটু ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা ‘ডয়’ জানান, এই তীব্র মানসিক অত্যাচার ও আইনি মামলা সহ্য করতে না পেরে অতীতে বেশ কয়েকজন কোরিয়ান নারী ট্যাটুশিল্পী আত্মহত্যার পথও বেছে নিয়েছিলেন।
দেশটিতে নিষিদ্ধ থাকলেও কোরিয়ান শিল্পীদের আঁকা চিকন ও সূক্ষ্ম লাইনের রঙিন ট্যাটুস্টাইল বিশ্ব জুড়ে ‘কোরিয়ান ট্যাটু’ নামে তুমুল জনপ্রিয়। গত এক দশকে কোরিয়ার নামি তারকা, বিশেষ করে বিশ্ব কাঁপানো কে-পপ ব্যান্ড বিটিএসের সদস্য জাংকুক যখন জনসমক্ষে নিজের হাতের ট্যাটু প্রদর্শন করা শুরু করেন, তখন দেশটির তরুণ প্রজন্মের কাছে এটি একটি ট্রেন্ড বা ফ্যাশনে পরিণত হয়।
‘সবকিছু অবশেষে নিজের জায়গায় ফিরে এসেছে। আমরা এখন বুক ফুলিয়ে বলতে পারি ট্যাটু কোনো অপরাধ নয়, ট্যাটু একটি শিল্প!’ আবেগঘন কণ্ঠে বলেছেন ট্যাটু ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা ডয়, যিনি হলিউড তারকা ব্র্যাড পিটের শরীরেও ট্যাটু এঁকেছেন।
যদিও কোরিয়ার কিছু জিম বা অভিজাত এলাকায় এখনো ‘নো ট্যাটু জোন’ বা ট্যাটু থাকলে প্রবেশ নিষেধের মতো সামাজিক কুসংস্কার রয়ে গেছে, তবুও আদালতের এই রায়ের পর দেশটির ৩ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি ট্যাটুশিল্পীর জীবনে এক নতুন এবং স্বাধীন ভোরের সূচনা হলো।
সূত্র : বিবিসি










