যুক্তরাষ্ট্রে পরাজয়ের দহনে পরিবর্তনের ডাক

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
‘অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ’। কবি জীবনানন্দ দাশের সেই পঙ্ক্তি যেন নতুন অর্থে ফিরে এসেছে ওয়াশিংটনের ক্ষমতার অলিন্দে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধের আগুন। গাজায় মৃত্যুর মিছিল। ইরানে ধ্বংসের ক্ষত। অথচ বিশ্বশক্তির আঁধারের নাটের গুরু হোয়াইট হাউজের সেদিকে খেয়াল নেই। বরং শক্তির আস্ফালনে উন্মত্ত ছিল তারা। যুদ্ধের দামামায় চাপা পড়েছে সাধারণ মানুষের আর্তনাদ। তবু টনক নড়েনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কথা বলেছে ভোটের বাক্স। বারুদের গন্ধ ছাপিয়ে ব্যালটের ভাষা পড়ছে যুক্তরাষ্ট্র। যে ইরান যুদ্ধকে শক্তির প্রদর্শন হিসেবে তুলে ধরেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, সেই যুদ্ধই এখন তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। দলীয় শিবিরের কথা তো বাদই দিলাম; মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান দলের ভরাডুবির একমাত্র কারণ হিসেবে পররাষ্ট্রনীতির ‘ইসরায়েল আগে’ নীতি কিংবা ট্রাম্পের মুখে ‘নেতানিয়াহু জিকির’কেই সামনে এনেছেন তারই ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। শুধু তা-ই নয়, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সাম্রাজ্যের ৭৮ বছরের পুরনো সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি ইসরায়েলের সঙ্গে সীমাছাড়া ঘনিষ্ঠতার বিষয়টিও পুনর্বিবেচনার দাবি তুলেছেন তিনি। পরাজয়ের দহন থেকেই যে এই পরিবর্তনের ডাক, তা শুধু মার্কিন মুলুকই নয়, হাজার মাইল দূরে মুখ লুকিয়ে থাকা বন্ধু ইসরায়েলেরও বুঝতে বাকি নেই।
যে ইসরায়েলকে ঘিরে দশকের পর দশক মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের হিসাব কষেছে ওয়াশিংটন, সেই মিত্রতার রাজনৈতিক মূল্য নিয়েই আজ প্রশ্ন উঠছে আমেরিকার অন্দরে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের ভরাডুবিতে কি নিষ্ঠুর বোধোদয় ঘটেছে? বন্ধুকেই শত্রু ভাবতে শুরু করেছে পুরো ট্রাম্প শিবির। ইরান যুদ্ধ আর ইসরায়েল নীতির কারণেই ভোটাররা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। ৩ নভেম্বর দেশের বুথে বুথে গিয়ে সেই বার্তাই দিয়েছেন তারা। ব্যালটের সেই চাবুকেই আজ ভ্রম ভেঙেছে ট্রাম্প প্রশাসনের। ভুল শুধরাতে তাই মরিয়া হয়ে উঠেছেন দলের শীর্ষ নেতারা। ভোটের দিন শেষে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে খোদ ভাইস প্রেসিডেন্টের বক্তব্যেই।
স্থানীয় সময় গত বুধবার ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ভ্যান্স লিখেছেন, ‘আমরা হেরেছি যুদ্ধের কারণে।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘আমাদের পরাজয়ের কারণ সবার জানা। এখন ভুল শুধরে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য যেকোনো আলোচনা এ সত্য স্বীকার করার মাধ্যমেই শুরু হওয়া উচিত।’ তার দাবি, ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া অনেকেই এবার ডেমোক্র্যাটদের বেছে নিয়েছেন। তাদের অসন্তোষের কেন্দ্রে রয়েছে চারটি বিষয়— ইরান যুদ্ধ বন্ধ, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, আমেরিকার স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের পরিবর্তন। তবে এসব দাবিকে ভোটারদের মনোভাব হিসেবে তুলে ধরেছেন ভ্যান্স।
গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে কংগ্রেসের দুই কক্ষেই আসন হারিয়েছে রিপাবলিকানরা। গতকাল বৃহস্পতিবার রয়টার্স জানিয়েছে, সিনেটে অন্তত ৫৪টি আসন নিশ্চিত করেছে ডেমোক্র্যাটরা। প্রতিনিধি পরিষদেও অন্তত ৩০টি আসন বেড়েছে তাদের। ট্রাম্পের শক্ত ঘাঁটিতেও দেখা গেছে পরিবর্তনের হাওয়া। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি শুল্ক, অভিবাসন অভিযান এবং সংসারের খরচ মেটানোর সংকটে ক্ষুব্ধ ভোটারদের একাংশ। পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্তের মূল্য যে দেশের মানুষকেও দিতে হয়, ব্যালটেই মিলেছে তার বার্তা।
কিন্তু সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্নটি ইসরায়েলকে ঘিরে। ১৯৪৮ সালের ১৪ মে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাত্র ১১ মিনিটের মধ্যে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান। পরের বছর প্রতিষ্ঠিত হয় পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক। ১৯৬২ সালে কেনেডি প্রশাসন অনুমোদন দেয় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির। ১৯৮১ সালে স্বাক্ষরিত হয় কৌশলগত সহযোগিতার সমঝোতা। এরপর অস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক সহযোগিতার মাধ্যমে আরও গভীর হয় সম্পর্ক। মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র হয়ে ওঠে ইসরায়েল।
২০১৬ সালে বারাক ওবামার প্রশাসন ২০১৯ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলকে ৩ হাজার ৮০০ কোটি ডলার সামরিক সহায়তা দেওয়ার অঙ্গীকার করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন বৈদেশিক সহায়তার সবচেয়ে বড় প্রাপক দেশ ইসরায়েল। অথচ গাজায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ এবং ইরানে যৌথ সামরিক অভিযানের পর সেই সহায়তার নৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য নিয়ে প্রশ্ন বেড়েছে। ফিলিস্তিনিদের দুর্দশা উপেক্ষা করে ইসরায়েলকে অব্যাহত অস্ত্রসহায়তার সমালোচনা এখন আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এর মধ্যেই নির্বাচনের দিন ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ২০২৭ সাল থেকে ইসরায়েলকে বার্ষিক প্রায় ৪০০ কোটি ডলার সহায়তা বন্ধ করতে চান তিনি। তবে অস্ত্র বিক্রি চলবে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও দাবি করেন ট্রাম্প। বিদ্যমান চুক্তি এবং কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রশ্ন থাকায় এ ঘোষণা কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা অনিশ্চিত। তবু দীর্ঘদিনের সামরিক অংশীদারত্ব নিয়ে এমন আলোচনা নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ।
ভ্যান্সের অবস্থানের পেছনেও রাজনৈতিক হিসাব দেখছেন পর্যবেক্ষকরা। গত বুধবার নিউ ইয়র্ক পোস্টের এক মতামত নিবন্ধে বলা হয়েছে, শুল্কনীতি ও অর্থনৈতিক ব্যর্থতার দায় আড়াল করে ইসরায়েল প্রসঙ্গ সামনে আনতে চাইছেন তিনি। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান মনোনয়নের সম্ভাব্য দাবিদার হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরির চেষ্টাও থাকতে পারে তার। ট্রাম্প নিজে যুদ্ধের নির্বাচনী প্রভাব স্বীকার করলেও সিদ্ধান্তের পক্ষে অনড় রয়েছেন।
এবারের ভোটে মূলত ট্রাম্পপন্থীদের ক্ষমতার বাইরে ঠেলে দিয়েছেন দেশটির নারী ও সংখ্যালঘু ভোটাররা। ক্ষমতার পুরনো পরিচয়ের পাশাপাশি বদলেছে প্রতিনিধিত্বের চেহারাও।
এই নির্বাচনের অভিঘাত আমেরিকার সীমানা ছাড়িয়েছে। ইরানের সঙ্গে সংঘাত থামাতে ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়তে পারে। ইসরায়েলের গাজা ও লেবানন অভিযান এবং অস্ত্রসহায়তা নিয়েও কংগ্রেসে নজরদারি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা আবার বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে পারে ডেমোক্র্যাটরা। রাশিয়ার প্রতি ট্রাম্পের নীতি, ইউরোপের ওপর শুল্কচাপ এবং আটলান্টিক মহাসাগরের দুই তীরের মিত্রতার ভবিষ্যৎও আলোচনায় আসতে পারে। তবে প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা ও ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা থাকায় পরিবর্তন সহজ হবে না।
কিন্তু এই বোধোদয় কি শুধু নির্বাচনী বিপর্যয়ের ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া? নাকি সত্যিই বদলাবে যুদ্ধ আর মিত্রতার পুরনো হিসাব? যে ক্ষমতা এতদিন মানুষের কান্নার চেয়ে যুদ্ধের মানচিত্রকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে, সে কি এবার ব্যালটের ভাষা বুঝবে? পৃথিবীর অদ্ভুত আঁধার কাটাতে শুধু নেতৃত্ব বদল যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নীতির পরিবর্তন। প্রয়োজন মানুষের জীবনের মূল্যকে ক্ষমতার হিসাবের ঊর্ধ্বে রাখা। এখন দেখার, ওয়াশিংটন সেই পথে হাঁটে, নাকি আবারও শান্তির প্রতিশ্রুতি হারিয়ে যায় বারুদের গর্জনে।




