হুতিরা লোহিত সাগরের মায়ুন দ্বীপের দখল ধরে রাখতে পারবে?

ইয়েমেনের মায়ুন দ্বীপের একটি স্যাটেলাইট চিত্র। ছবি: রয়টার্স
ইয়েমেনের মায়ুন দ্বীপ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে হুতি বাহিনী। পারিম নামেও পরিচিত এই দ্বীপটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল-মানদাব প্রণালির মাঝখানে অবস্থিত এই দ্বীপ।
দ্বীপটি দখলের ফলে হুতিদের সামরিক শক্তি ও নৌপথে প্রভাব আরও বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে বাব আল-মানদাব প্রণালিতে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে তারা।
তবে প্রশ্ন হলো, সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর পাল্টা আক্রমণ ঠেকিয়ে দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে কি হুতিরা?
স্থানীয় সময় শুক্রবার ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা এবং একজন হুতি কর্মকর্তা মায়ুন দ্বীপ দখলের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) এ তথ্য জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মায়ুন দ্বীপ দখল হুতিদের জন্য বড় ধরনের সামরিক অগ্রগতি। দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর বিরুদ্ধে চলমান সংঘাতে নতুন সুবিধা পাবে গোষ্ঠীটি। একই সঙ্গে হুতিদের মিত্র ইরানও আঞ্চলিক রাজনীতিতে কৌশলগত সুবিধা পেতে পারে।
মায়ুন দ্বীপ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
মায়ুন দ্বীপ ১৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের একটি আগ্নেয় দ্বীপ। এটি লোহিত সাগরে প্রবেশের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত সরু বাব আল-মানদাব প্রণালির মাঝখানে রয়েছে। ফলে এর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে সরাসরি অবস্থান তৈরি করেছে হুতিরা।
বাব আল-মানদাব বিশ্ব নৌবাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ। লোহিত সাগরের উত্তর প্রান্তে রয়েছে সুয়েজ খাল।
ফ্রেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। এর প্রভাবে আরব উপদ্বীপের অপর পাশে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যায়। এতে বৈশ্বিক নৌবাণিজ্যে বাব আল-মানদাবের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। এ পথ দিয়ে এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন হয়।
২০২১ সালে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াই করা সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছিল, মায়ুন দ্বীপে তাদের উপস্থিতি রয়েছে। এর আগে সেখানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বিমানঘাঁটি নির্মাণের খবরও প্রকাশিত হয়েছিল। গত বছরের শেষ দিকে ইউএই ইয়েমেন থেকে সেনা প্রত্যাহার করে। তবে দ্বীপটির বিমানঘাঁটির বর্তমান অবস্থা স্পষ্ট নয়।
ইয়েমেনে হুথিরা বাব আল-মানদাবের আশপাশের এলাকাও নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। এর মধ্যে হানিশ দ্বীপ এবং ইয়েমেনের পুরো লোহিত সাগর উপকূল রয়েছে। আল-জাজিরার ইয়েমেন প্রতিনিধি ইউসুফ মাওরি শনিবার এ তথ্য জানিয়েছেন। এর আগে বৃহস্পতিবার হুতি বাহিনী বন্দরনগরী মোখাও দখল করে।
নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুস্তাইয়ের মতে, ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ফলে বাব আল-মানদাব দিয়ে নৌযান চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার বাস্তব সক্ষমতা এখন হুতিদের হাতে এসেছে। এতে ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে তারা বড় সুবিধা পাবে। একই সঙ্গে ইরানও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আঞ্চলিক সংঘাতে বাড়তি চাপ তৈরির সুযোগ পাবে।
কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে তেহরান আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক নৌপথের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পাবে। এতে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধও আরও কার্যকর হতে পারে বলে মনে করেন পুস্তাই।
চ্যাথাম হাউসের গবেষক ফারেয়া আল-মুসলিমি বলেছেন, এই অগ্রগতি হুতিদের অভ্যন্তরীণ লক্ষ্য পূরণের পাশাপাশি ইয়েমেনের বাইরের বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের অবস্থান শক্তিশালী করবে।
বাব আল-মানদাব দিয়ে জাহাজ চলাচলে কী প্রভাব পড়বে?
হুতিরা জানিয়েছে, লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদাব দিয়ে সাধারণ নৌযান চলাচল নিরাপদ থাকবে। তবে সৌদি আরবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজের ক্ষেত্রে তারা অবরোধ আরোপ করবে।
হুতি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি জানিয়েছেন, সৌদি আরব হুতি-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলো অবরোধ করায় তারাও অবরোধের জবাবে অবরোধ নীতি চালিয়ে যাবে।
তবে অতীতে সৌদি আরবের সঙ্গে সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই এমন জাহাজেও হামলা চালিয়েছে হুতিরা। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত লোহিত সাগরে শতাধিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালায় তারা।
হুতিরা দাবি করেছিল, ইসরায়েল বা তার মিত্রদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজ এবং গাজায় ফিলিস্তিনিদের সমর্থন করাই এসব হামলার উদ্দেশ্য ছিল। তবে রয়টার্স ও বিবিসি ভেরিফাইয়ের নৌপরিবহন সূত্র বলছে, কিছু হামলার লক্ষ্যবস্তু এমন জাহাজও ছিল যেগুলোর সঙ্গে ইসরায়েল বা তার মিত্রদের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
হুতিরা যদি আবার সৌদি জাহাজের বাইরে অন্য জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করে, তাহলে মায়ুন ও আশপাশের নতুন অবস্থান থেকে চলাচলকারী জাহাজে হামলা চালানো তাদের জন্য সহজ হবে।
উলফগ্যাং পুস্তাইয়ের মতে, হুতিরা এখন জাহাজে হামলার জন্য দূরপাল্লার কামানের পরিবর্তে স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে পারবে। এতে হুতিরা অনুমতি না দিলে বাব আল-মানদাব দিয়ে নৌযান চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অর্থনীতিবিদ জাভেদ হাসান বলেছেন, লোহিত সাগরে নৌযান চলাচলে নতুন করে বিঘ্ন সৃষ্টি হলে এর বড় প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। পণ্য পরিবহন আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হওয়ার আগেই যুদ্ধঝুঁকি বীমা ও জাহাজ ভাড়ার খরচ বেড়ে যেতে পারে।
এর প্রভাব তেল ছাড়াও কনটেইনার পরিবহন, শুকনো পণ্য পরিবহন এবং সামগ্রিক বাণিজ্যিক পণ্যের দামের ওপর পড়বে।
মায়ুন দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে হুতিরা?
তবে মায়ুন দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা হুতিদের জন্য সহজ হবে না বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
লন্ডনের কিংস কলেজের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনী দ্বীপটি পুনর্দখলে কতটা চেষ্টা চালায়, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। হুতিদের অগ্রযাত্রার সময় সরকারি বাহিনী দ্রুত সরে গেছে বলে জানা গেছে।
ক্রিগের মতে, আশপাশের এলাকা নিয়ন্ত্রণে থাকায় স্বল্পমেয়াদে মায়ুন দ্বীপ ধরে রাখার ক্ষেত্রে হুতিরা শক্ত অবস্থানে রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে উভচর সামরিক অভিযানের মাধ্যমে দ্বীপটি পুনর্দখল করা সম্ভব। যদিও এ ধরনের অভিযানও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হবে।
তার মতে, মূল বিষয় হবে ইয়েমেনের মূল ভূখণ্ডের উপকূলীয় এলাকা ও তার আশপাশের অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে রাখা।
চ্যাথাম হাউসের গবেষক ফারেয়া আল-মুসলিমি বলেছেন, লোহিত সাগরের উপকূল ধরে হুতিদের দ্রুত অগ্রগতি এবং মায়ুন দ্বীপ দখল অপ্রত্যাশিত নয়। সরকারি বাহিনীর মধ্যে দুর্বল সমন্বয় ও অস্ত্রের ঘাটতির কারণে এমনটি ঘটেছে বলে তিনি মনে করেন। সৌদি আরব এক বছর ধরে সরকারি বাহিনীকে কার্যকর যুদ্ধশক্তিতে পরিণত করার চেষ্টা করলেও তা পুরোপুরি সফল হয়নি। অন্যদিকে হুতিরা দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
এদিকে আয়ারল্যান্ড সফরের সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যেন হস্তক্ষেপ না করে, সে অনুরোধ হুতিরা করেছে।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, হুতিরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লড়াই করতে চায় না। বেশির ভাগ জাহাজকে হুতিরা চলাচলের সুযোগ দিচ্ছে। তবে একটি দেশের জাহাজ নিয়ে তারা সন্তুষ্ট নয় এবং বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র সমাধান করবে।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে ভালো বন্ধু উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেছেন, শেষ পর্যন্ত সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।
সূত্র: আলজাজিরা








