লোহিত সাগরে নতুন রণকৌশল
বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধের প্রস্তুতি হুথিদের!
- বাব আল-মান্দেব এবং হরমুজ—এই দুই জলপথ ইতিহাসে কখনোই একসঙ্গে বন্ধ হয়নি
- হুতিদের সক্ষমতা নিয়ে এখন আর কারও সংশয় নেই।

লোহিত সাগরের কৌশলগত এ জলপথটি বন্ধের চূড়ান্ত ছক কষছে হুতিরা- রয়টার্স
বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ধমনী বাব আল-মান্দেব প্রণালী অচল করে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরানের ঘণিষ্ঠ মিত্র ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ (হুতি) গোষ্ঠী। ইয়েমেনের বেশ কিছু সূত্রের বরাতে ব্রিটিশ দৈনিক ‘দ্য টেলিগ্রাফ দাবি করেছে , বিশ্বজুড়ে চলমান অস্থিরতার মধ্যেই লোহিত সাগরের কৌশলগত এ জলপথটি বন্ধের চূড়ান্ত ছক কষছে হুথিরা।
বিশ্ব বাণিজ্যে অশনি সংকেত
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক বাণিজ্য এক নতুন সংকটের মুখোমুখি। হর্ন অব আফ্রিকার এই গুরুত্বপূর্ণ শিপিং রুটটি বিচ্ছিন্ন করে বিশ্ব অর্থনীতির ভারসাম্য নষ্ট করতে চাইছে হুথিরা । হুথিদের ‘তেহরানের সবচেয়ে শক্তিশালী আঞ্চলিক প্রক্সি’ হিসেবে অভিহিত করে টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, গোষ্ঠীটি অত্যন্ত গোপনে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে হর্ন অব আফ্রিকায় ।
আল-শাবাবের সঙ্গে গোপন আঁতাত?
প্রতিবেদনটির সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দাবি হলো হুথি এবং সোমালিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠী আল-শাবাবের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সহযোগিতার বিষয়টি। টেলিগ্রাফের দাবি, এই দুই গোষ্ঠী মিলে বাব আল-মান্দেবের উভয় তীর নিয়ন্ত্রণে নিতে চায়। এর মাধ্যমে তারা বিশ্ব অর্থনীতিতে চরম আঘাত হানা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর প্রবল চাপ প্রয়োগ করতে চায়। গোয়েন্দা তথ্যের বরাতে পত্রিকাটির দাবি, হুথিরা ইরানের প্রযুক্তি ব্যবহার করে আল-শাবাবকে ড্রোন সক্ষমতা দিচ্ছে, যা তাদের ওই অঞ্চলের প্রধান শক্তিতে রূপান্তরিত করছে।
হরমুজের আদলে নতুন কৌশল
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যেভাবে হরমুজ প্রণালীর ওপর নিজের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলে, হুথিরা বাব আল-মান্দেবের ক্ষেত্রেও একই পথ অনুসরণ করতে চায়। লোহিত সাগরের এই প্রণালীটি সুয়েজ খালের প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে, যেখানে বিশ্বের বার্ষিক সমুদ্র বাণিজ্যের ১০ থেকে ১২ শতাংশ পরিবাহিত হয়। অতীতের হরমুজ সংকটের সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে টেলিগ্রাফ লিখেছে, তখন তেহরান যেভাবে এই জলপথ বন্ধ করে তেল ও সারসহ নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী করেছিল এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে দরকষাকষিতে বড় ধরনের সুবিধা আদায় করেছিল, তেমনটিই হতে পারে এবারও ।
বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব
বন্ধ হলে তা বিশ্ব অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিতে পারে বাব আল-মান্দেব । জাহাজগুলোকে তখন বাধ্য হয়ে আফ্রিকার উত্তাল দক্ষিণাঞ্চল দিয়ে কয়েক সপ্তাহের দীর্ঘ পথে পাড়ি দিতে হবে, যা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে পণ্যের দাম।
উল্লেখ্য, বাব আল-মান্দেব এবং হরমুজ—এই দুই জলপথ ইতিহাসে কখনোই একসঙ্গে বন্ধ হয়নি। তবে গাজা যুদ্ধের পর থেকে হুথিরা যেভাবে লোহিত সাগরে একের পর এক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে মার্কিন নেতৃত্বাধীন নৌ-জোটকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে, তাতে তাদের এই সক্ষমতা নিয়ে এখন আর কারো সংশয় নেই।
প্রতিরোধ অক্ষের নতুন শক্তি
লেবাননের হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলের হামলার পর থেকে হুথিরা ইরানের ‘প্রতিরোধ অক্ষ’র সবচেয়ে স্বাধীন ও শক্তিশালী ইউনিটে পরিণত হয়েছে। টেলিগ্রাফ তাদের রিপোর্টে যদিও দাবি করেছে যে, হুথিদের স্বার্থ সবসময় ইরানের সঙ্গে পুরোপুরি এক হয় না, তবুও লোহিত সাগরের অপর প্রান্ত পর্যন্ত প্রভাব বিস্তারের এই প্রচেষ্টা যে মূলত তেহরানের বৃহত্তর পরিকল্পনারই অংশ, তা প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশ্বের শিপিং রুট ও জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থে এই জলপথের ভূমিকা অপরিসীম। এমতাবস্থায়, হুথিদের এই কথিত প্রস্তুতি যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে তা বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তার জন্ম দেবে।




