আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে এবার নির্বাচন ‘চুরির’ অভিযোগ নেতানিয়াহুর

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ফাইল ছবি / রয়টার্স
ইসরায়েলের পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার মিত্ররা নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি, ঘুষ, বিদেশি অর্থায়ন ও জালিয়াতির মাধ্যমে আরব দলগুলো নির্বাচন ‘চুরি’ করেছে। এ ঘটনায় তদন্ত, গ্রেপ্তার এবং এমনকি নির্বাচন বাতিল করে নতুন করে ভোট আয়োজনের দাবিও উঠেছে।
তবে এখন পর্যন্ত এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি নেতানিয়াহু ও তার মিত্ররা। বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের দীর্ঘতম সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা এই নেতার মূল লক্ষ্য হলো আরব দলগুলোর রাজনৈতিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করা। একই সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আরব দলগুলোর সম্ভাব্য জোট গঠনের পথ বন্ধ করা।
গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। তবে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটও এককভাবে সরকার গঠনের মতো আসন পায়নি। ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন।
নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন জোটের আসনসংখ্যা ৪৮। তবে আরব দলগুলোর ১৯টি আসনের সমর্থন পেলে বিরোধী জোটের আসন দাঁড়ায় ৬৭টিতে। ফলে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে আরব দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০২১ সালে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে সক্ষম হয়েছিল বেনেট-লাপিদ সরকার। সেই সরকারে আরব দল রামও ছিল। প্রায় এক বছর পর ওই সরকারের পতন ঘটে। নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের বরাতে সিএনএন জানিয়েছে, এবারের নির্বাচনের পর তার প্রধান লক্ষ্য হলো ইহুদি ও আরব রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা ঠেকানো, যাতে তার ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার পথ সহজ হয়।
নির্বাচনের আগেই আরব ভোটারদের লক্ষ্য করে প্রচার শুরু করেন নেতানিয়াহু। অক্টোবরের মাঝামাঝি তিনি ও রিলিজিয়াস জায়নিস্ট পার্টির প্রধান বেজালেল স্মোট্রিচ আরব অধ্যুষিত এলাকায় ভোটকেন্দ্রগুলোতে প্রায় দুই হাজার পর্যবেক্ষক মোতায়েনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। এসব কেন্দ্রকে সম্ভাব্য জালিয়াতির স্থান হিসেবে তুলে ধরা হয়।
নির্বাচনের দিন সকালে ভোটের বিনিময়ে অর্থ দেওয়ার অভিযোগে রাম দলের তিন কর্মীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ইসরায়েলের চ্যানেল ১২ নিউজ পরে জানায়, গ্রেপ্তারের বিষয়ে পুলিশের কাছে প্রাথমিক তথ্য পৌঁছেছিল নেতানিয়াহুর চিফ অব স্টাফের কাছ থেকে।
তিনি প্রচলিত প্রক্রিয়া এড়িয়ে সরাসরি পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। পরে আদালত পুলিশের অধিকাংশ কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের আবেদন নাকচ করেন। কয়েকজন সন্দেহভাজনকে মুক্তিও দেওয়া হয়। তবে নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারশিবির ঘটনাটিকে নির্বাচন চুরির প্রচেষ্টা হিসেবে প্রচার করে।
ভোট গণনার সময়ও অভিযোগের প্রচার অব্যাহত থাকে। বুধবার নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি জানায়, রাম ও জয়েন্ট লিস্টের বিরুদ্ধে ঘুষ, হুমকি, সহিংসতা ও জালিয়াতির অভিযোগে শত শত সাক্ষ্য জমা দেওয়া হয়েছে। এদিকে নেতানিয়াহুপন্থী চ্যানেল ১৪ বিদেশি একটি উৎস থেকে কয়েক মিলিয়ন শেকেল অর্থ আসার সন্দেহের কথা জানায়।
এরপর ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্টের উপপ্রধান বিচারপতি নোয়াম সোলবার্গ দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেতের প্রধান ডেভিড জিনিকে চিঠি লিখে বিদেশি অর্থায়নের অভিযোগ তদন্তের অনুরোধ জানান।
পরে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম জানায়, নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকের পর জিনি নিজেই ওই চিঠির অনুরোধ করেছিলেন। তবে সোলবার্গ চিঠিতে উল্লেখ করেন, অভিযোগের প্রমাণ কতটা গুরুতর, তা তিনি যাচাই করতে পারেননি।
অন্যদিকে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি ব্যাপক জালিয়াতির অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের ভাষ্য, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় পরিকল্পিতভাবে কারচুপি করা হয়েছে, এমন অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই।
রবিবার শিন বেত প্রধান ও অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে এক যৌথ বিবৃতিতে সোলবার্গ বলেন, নির্বাচন যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বিদেশি অর্থায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হলেও তাতে নির্বাচনের ফল পরিবর্তন হবে না। তিনি বলেন, ‘ভোটকেন্দ্রে আপনাদের দেওয়া সিদ্ধান্তকে সম্মান জানানো হবে।’
বিরোধী নেতা আইজেনকট নেতানিয়াহুর অভিযোগকে ‘জঘন্য ও বিদ্বেষপূর্ণ প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা’ বলে অভিহিত করেছেন। বামপন্থি ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান বলেছেন, ‘ভোটের মাধ্যমে পরাজয় মেনে নিতে অস্বীকার করা একজন স্বৈরশাসক এভাবেই আচরণ করেন।’
অভিযোগের লক্ষ্যবস্তু জয়েন্ট লিস্টও পাল্টা বিবৃতি দিয়েছে। দলটি বলেছে, ‘কোনো অপপ্রচার আরব জনগণের অর্জন মুছে দিতে পারবে না। আমাদের ভোটের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো চেষ্টাই ভোটারদের ইচ্ছা পরিবর্তন করতে পারবে না। আপনারা আমাদের ছোট ও দুর্বল দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আপনারা পেয়েছেন শক্তিশালী ও বড় এক শক্তিকে।’
সূত্র: সিএনএন




