রেকর্ড আসনের পরও আরব দলগুলো কেন ইসরায়েলের সরকার গঠনে ‘কিংমেকার’ নয়

ইসরায়েলের নির্বাচনের বুথফেরত জরিপের ফল প্রকাশের পর প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন আরব নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট লিস্টের ফিলিস্তিনি প্রার্থী ইউসেফ জাবারিন। ছবি: রয়টার্স
ইসরায়েলের নির্বাচনে কোনো পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে না। বিষয়টি মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে গেছে। তবে সবাইকে অবাক করে দিয়ে রেকর্ডসংখ্যক আসন পেতে যাচ্ছে আরব ইসরায়েলি দলগুলো। সংখ্যার হিসাবে সরকার গঠনে তাদের ভূমিকা হয়ে উঠতে পারে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ইসরায়েলে ১২০ আসনের নেসেটে সরকার গড়তে প্রয়োজন ৬১ আসন। প্রায় ৮০ শতাংশ ভোট গণনা শেষে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোট পেতে যাচ্ছে ৫৪ আসন। সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের আসন হতে যাচ্ছে ৪৯।
অন্যদিকে আরব নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম মিলে ১৭টি আসন পেতে পারে। এটি হলে ইসরায়েলের পার্লামেন্টে আরব দলগুলোর সম্মিলিত আসনের নতুন রেকর্ড হবে।
হিসাব বলছে, আরব দলগুলোকে সঙ্গে পেলে আইজেনকোটের শিবির সহজেই প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের সীমা পার হতে পারে। সর্বশেষ আংশিক ফল অনুযায়ী, দুই পক্ষের সম্মিলিত আসন দাঁড়াতে পারে ৬৬।
তারপরও আরব দলগুলোকে ‘কিংমেকার’ বলা যাচ্ছে না। কারণ নেতানিয়াহু ও আইজেনকোট— দুজনই তাদের সঙ্গে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন।
আরব ভোটের উত্থান
ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল শেক মনে করেন, এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি আরবদের উত্থান।
তিনি বলেছেন, ‘সম্ভবত এই নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা আরব ভোটের উত্থান ও পুনরুজ্জীবন।’
তার মতে, এত বড়সংখ্যক ভোটারকে এখন আর ইসরায়েলের রাজনৈতিক হিসাব থেকে বাদ দেওয়া সম্ভব নয়।
কিন্তু ভোটের এই শক্তি সরকার গঠনের ক্ষমতায় কতটা রূপ নেবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
অধিকাংশ ইহুদি নেতৃত্বাধীন দল আরব দলগুলোকে নিয়ে সরকার গঠনে রাজি নয়। নেতানিয়াহু ও আইজেনকোট দুজনই বলেছেন, আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে তাদের মূল্যবোধের মিল নেই।
অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লাভিত্তিক প্যালেস্টাইনিয়ান ফোরাম ফর ইসরায়েলি স্টাডিজের মহাপরিচালক হোনাইদা ঘানাম এটিকে আরব দলগুলোর ওপর কার্যত একটি ‘রাজনৈতিক ভেটো’ হিসেবে দেখছেন।
তার ভাষায়, এই বাধার মূলে এমন একটি কাঠামো রয়েছে, যেখানে আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশীদার হিসেবে গ্রহণ করা হয় না।
সংখ্যার হিসাব কী বলছে
আইজেনকোটের সামনে সংখ্যার হিসাব বেশ পরিষ্কার।
তার বিরোধী জোটের ৪৯ আসনের সঙ্গে আরব দলগুলোর সম্ভাব্য ১৭ আসন যোগ হলে মোট দাঁড়ায় ৬৬। অর্থাৎ সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যার চেয়ে পাঁচটি বেশি।
ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আহমেদ নাজারের মতে, আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট না করার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা আসনের হিসাব নয়, রাজনৈতিক অবস্থান।
তিনি বলেছেন, আইজেনকোট আরব দলগুলোর জন্য কিছু শর্ত রেখেছেন। অথচ নির্বাচনের হিসাব বলছে, নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে তাদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
আইজেনকোট জানিয়েছেন, ইসরায়েলকে ‘ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মূল্যবোধ সমর্থন করে এবং সব ইসরায়েলির জাতীয় সেবায় অংশ নেওয়ার নীতিতে সম্মত— এমন যেকোনো দলের সঙ্গে তিনি কাজ করার কথা বিবেচনা করবেন।
তবে রা’আম এসব শর্ত পূরণ করে কি না, তা স্পষ্ট করেননি তিনি।
আরব দলগুলো কী চায়
আরব দলগুলোর পক্ষ থেকে অবশ্য আইজেনকোটের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহের ইঙ্গিত এসেছে।
রা’আম নেতা মনসুর আব্বাস জানিয়েছেন, আইজেনকোট নির্বাচিত হলে তার সরকারে যোগ দিতে তিনি প্রস্তুত। তবে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিষয়গুলোয় তার দলের ভূমিকা থাকার শর্ত দিয়েছেন তিনি।
এবার রা’আম তাদের প্রার্থী তালিকায় ইহুদি আইনপ্রণেতা ইয়োভ সেগালোভিৎজকে দ্বিতীয় স্থানে রেখেছে।
জয়েন্ট লিস্ট নেতা ইউসেফ জাবারিনও বুধবার জানিয়েছেন, নেতানিয়াহুর অতি-ডানপন্থী জোটকে ক্ষমতা থেকে সরাতে তার দল দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত।
তিনি বলেছেন, বর্তমান সরকার ‘প্রত্যেক আরব নাগরিকের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে’। নির্বাচনে পাওয়া রাজনৈতিক শক্তিকে নিজেদের মূল্যবোধ এগিয়ে নিতে কাজে লাগানো হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
জয়েন্ট লিস্টের আরেক নেতা আহমেদ তিবিও নেতানিয়াহুকে সরাতে বিরোধী জোটের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন।
তবে জয়েন্ট লিস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারে যোগ দিতে প্রস্তুত কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
আইজেনকোটের সামনে বাধা কোথায়
আরব দলগুলো রাজি হলেও আইজেনকোট একা সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। তাকে নিজের সম্ভাব্য মিত্রদেরও রাজি করাতে হবে।
এর মধ্যে রয়েছেন টুগেদার জোটের নাফতালি বেনেট এবং ইসরায়েল বেইতেনু দলের আভিগদর লিবারম্যান।
বিশ্লেষক ওমর শাবানের মতে, ইসরায়েলি সমাজের একটি অংশ এমন সরকার চায় না, যা আরব দলগুলোর ভোটের ওপর নির্ভরশীল হবে।
নাজারের মতে, আইজেনকোটকে এমন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, যেখানে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা ভোট দিতে পারলেও তাদের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোকে সরকার পরিচালনার বৈধ অংশীদার হিসেবে সহজে গ্রহণ করা হয় না।
তবে বিরোধী শিবিরের সবাই আরব দলগুলোর সঙ্গে জোটের বিরোধী নন।
আইজেনকোটের জোটে থাকা মধ্য-বামপন্থী ডেমোক্র্যাটস দলের নেতা ইয়ার গোলান আরব দলগুলোর সঙ্গে কাজ না করার অবস্থান বদলানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, ‘ইহুদি ভোট ও আরব ভোটের মধ্যে নেতানিয়াহুর বর্ণবাদী বিভাজন আর মেনে নেওয়া উচিত নয়।’
নেতানিয়াহু ও বেনেট কী বলছেন
আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের তীব্র বিরোধিতা করেছেন নেতানিয়াহু।
মঙ্গলবার তিনি বলেছেন, আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর ওপর নির্ভর করে সরকার গঠন করা হবে ‘লজ্জা ও অসম্মানের’।
সমর্থকদের উদ্দেশে নেতানিয়াহু বলেছেন, ‘ইসরায়েলকে বিপদে ফেলে জায়নবাদবিরোধী আরব দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল সরকার গঠন করা নিষিদ্ধ— একেবারেই নিষিদ্ধ।’
অন্যদিকে নির্বাচনে তৃতীয় অবস্থানে থাকা নাফতালি বেনেটও আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। তিনি জানিয়েছেন, এবার সরকারে কেবল ‘জায়নবাদী’ দল চান। আরব দলগুলোকে সরকারে রাখতে চান না তিনি।
আগেও কি আরব দল সরকার গঠনে ভূমিকা রেখেছে
এর নজির রয়েছে।
২০২১ সালের নির্বাচনের পর মনসুর আব্বাসের রা’আম সরকার গঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দলটির সমর্থন নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের স্বল্পস্থায়ী সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
রা’আম ২০২১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সেই ক্ষমতাসীন জোটে ছিল।
এরও আগে আরব দলগুলো সরকারে যোগ না দিয়েও বাইরে থেকে সরকারকে সমর্থন করেছে। বিশেষ করে ১৯৯০-এর দশকে ইৎজাক রবিনের সরকারের সময় এমন নজির দেখা গেছে।
নাজারের মতে, তাই আরব দলগুলোর অংশগ্রহণে আইনগত বা সাংবিধানিক বাধা নেই। তার মতে, মূল বাধা রাজনৈতিক ও আদর্শিক।
তাহলে সরকার গঠনের পথ কোন দিকে
হোনাইদা ঘানামের হিসাবে বর্তমান পরিস্থিতি থেকে চারটি সম্ভাব্য পথ তৈরি হতে পারে।
প্রথমত, কোনো পক্ষ সরকার গঠন করতে না পারলে আবার নির্বাচন হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, আরব দলগুলো সরকারে সরাসরি যোগ না দিয়ে বাইরে থেকে সমর্থন দিলে আইজেনকোটের নেতৃত্বে সংখ্যালঘু সরকার হতে পারে।
তৃতীয়ত, বিরোধী শিবিরের কিছু সদস্য নেতানিয়াহুর দিকে চলে যেতে পারেন। তাতে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যেতে পারে তার জোট।
চতুর্থ সম্ভাবনা হলো, বড় দলগুলোর সমন্বয়ে একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার।
আরব দলগুলোর রেকর্ড আসন তাই ইসরায়েলের নির্বাচনী রাজনীতিতে তাদের শক্তি বাড়িয়েছে। কিন্তু সেই শক্তি সরকার গঠনের ক্ষমতায় রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করছে মূলত ইহুদি নেতৃত্বাধীন দলগুলোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর।
সংখ্যার হিসাবে আরব দলগুলো সরকার গঠনের সমীকরণ বদলে দিতে পারে। কিন্তু সেই হিসাব বাস্তবে কাজে লাগাতে হলে ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভাজনের একটি বড় বাধা পার হতে হবে।
সূত্র : রয়টার্স



