নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় পাল্টা জবাবের হুঁশিয়ারি ইরানের
- ‘প্রতিরোধ চলবে’ বার্তা তেহরানের

যদিও পরিস্থিতি উত্তপ্ত, একই সময়ে কূটনৈতিক যোগাযোগের চেষ্টাও চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিল ইরান। সোমবার মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের অর্থনৈতিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পর, মঙ্গলবার ইরানের অর্থমন্ত্রী আলী মাদানিজাদেহ জানিয়েছেন, তেহরান এই চাপের বিরুদ্ধে প্রস্তুত এবং প্রয়োজন হলে পাল্টা জবাব দেবে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে মাদানিজাদেহ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাকে ইরান “অর্থনৈতিক সন্ত্রাসী হামলা” হিসেবে দেখছে। তার কথায়, “আমাদের প্রতিরক্ষা আর শুধু প্রতিরক্ষামূলক নয়; শত্রুদের আক্রমণের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।”
তবে ইরান কী ধরনের পাল্টা ব্যবস্থা নেবে, তা স্পষ্ট করেননি তিনি। তার দাবি, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার অভিজ্ঞতা থেকে তেহরান জানে কী ভাবে অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করতে হয়।
৬০ ব্যক্তি, সংস্থা ও জাহাজের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা
ঘটনার সূত্রপাত সোমবার, যখন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের সঙ্গে যুক্ত ৬০টি ব্যক্তি, সংস্থা ও জাহাজকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনে।
ওয়াশিংটনের অভিযোগ, এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ইরানের তেল বাণিজ্য, আর্থিক লেনদেন এবং নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত।
বেসেন্ট জানান, যেসব দেশ বা সংস্থা ইরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাবে, তাদের মার্কিন ডলারভিত্তিক আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করার ঝুঁকি রয়েছে। তবে তিনি নির্দিষ্ট কোনও দেশের নাম বা সময়সীমা ঘোষণা করেননি।
চীন ও রাশিয়ার সমর্থনের আশা তেহরানের
নতুন মার্কিন পদক্ষেপের পর ইরান জানিয়েছে, তারা একা নয়। দেশটির অর্থমন্ত্রী আলী মাদানিজাদেহ বলেছেন, চীন ও রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা মেনে নেয়নি এবং অন্যান্য দেশও ওয়াশিংটনের চাপ প্রতিরোধ করবে বলে তেহরান আশা করছে।
ইরানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারগুলোর একটি হল চীন। দীর্ঘদিন ধরে চীন ইরানের সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে। ফলে ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞার প্রধান লক্ষ্যগুলির একটি হল ইরানের এই বাণিজ্যিক পথ বন্ধ করা।
এর আগে চীনও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞা তারা সমর্থন করে না এবং নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
আইআরজিসির কড়া হুঁশিয়ারি
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন মোহেবি আরও কঠোর বার্তা দিয়েছেন।
তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো বা স্বার্থ আক্রান্ত হলে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং জ্বালানি সরবরাহের পথগুলোতে “ভারী আঘাত” আসতে পারে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহণ পথ এই জলপথ নিয়ে ইরান আগেও সতর্কবার্তা দিয়েছে।
হরমুজ ঘিরে নতুন উত্তেজনা
নতুন নিষেধাজ্ঞার দিনেই হরমুজ প্রণালির কাছে একটি তেলবাহী জাহাজ অজ্ঞাত হামলার শিকার হয় বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস। ওমানের আশ শিশাহ এলাকার কাছে জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি সরবরাহ এই পথ দিয়ে যায়। ফলে হরমুজে উত্তেজনা বাড়লে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ও সরবরাহে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
সামরিক সংঘাত থেকে অর্থনৈতিক লড়াই?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাতের পর ওয়াশিংটন এখন অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানের সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতার অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল করাই লক্ষ্য।
অন্যদিকে তেহরানের বক্তব্য, নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তাদের নীতি বদলানো যাবে না। ইরান বলছে, দীর্ঘদিনের চাপের মধ্যেও তারা নিজেদের অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা ধরে রেখেছে।
কূটনীতির পথও খোলা?
যদিও পরিস্থিতি উত্তপ্ত, একই সময়ে কূটনৈতিক যোগাযোগের চেষ্টাও চলছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনির তেহরান সফর করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানের ভূমিকা পালন করেছেন বলে জানা গেছে।
ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওই আলোচনায় উত্তেজনা কমানো ও হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা এখন শুধু দুই দেশের দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে চীন, রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বিশ্ব অর্থনীতির ভারসাম্য।
ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক চাপ যত বাড়ছে, তেহরানের পাল্টা প্রতিরোধের ভাষাও তত কঠোর হচ্ছে। ফলে ইরান সংকট এখন আবারও বড় ভূরাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রে উঠে এসেছে।






