ইরানে বন্দিশালায় বসে লিখে তা যেভাবে বাইরে পাঠাতেন নার্গিস মোহাম্মাদি

নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী ইরানের অধিকারকর্মী নার্গিস মোহাম্মাদি। ফাইল ছবি/ সংগৃহীত
তেহরানের কুখ্যাত এভিন কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় টুকরো টুকরো করে নিজের অভিজ্ঞতা লিখতেন নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী নার্গিস মোহাম্মাদি। বন্ধু ও সহবন্দিদের সাহায্যে সেই লেখা গোপনে কারাগারের বাইরে পাঠাতেন তিনি।
ঝুঁকি ছিল অনেক। ৫৪ বছর বয়সী মোহাম্মাদি গত দুই দশকের বড় একটি সময় কারাগারে কাটিয়েছেন। ইরানের কট্টর ইসলামি শাসকদের বিরুদ্ধে সরব থাকার কারণে তাকে বারবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
কারাগারে তাকে মারধর করা হয়েছে। গুরুতর অসুস্থও হয়েছেন। এ সময় সন্তানদের থেকেও দূরে থাকতে হয়েছে তাকে।
সম্প্রতি সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মোহাম্মাদি বলেছেন, একবার তার এক বন্ধু কারাগার থেকে মাত্র তিন পৃষ্ঠা লেখা বাইরে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কারাগারের নিরাপত্তাকর্মীরা তা কেড়ে নেন।
তার দাবি, আরেকবার তাকে মারধরের পর অন্য একটি কারাগারে পাঠানো হয়। এ সময় তার ২০টির বেশি নোটবুক হারিয়ে যায়। কিন্তু লেখা থামাননি তিনি।
কারাগারে লেখা সেই টুকরো টুকরো কথাই পরে রূপ নিয়েছে তার স্মৃতিকথায়। বইটির নাম ‘এ ওম্যান নেভার স্টপস ফাইটিং’। চলতি মাসে ইউরোপের কয়েকটি দেশে বইটি প্রকাশিত হচ্ছে।
বইটিতে কারাগারে তার সঙ্গে কী ঘটেছে, তার আরও বিস্তারিত তুলে ধরেছেন মোহাম্মাদি। নির্যাতনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিষয়েও লিখেছেন তিনি।
মোহাম্মাদি বলেছেন, ‘এসব ঘটনা নথিবদ্ধ করতে হলে তাদের পদ্ধতি নিয়ে খোলাখুলি কথা বলা, তাদের নির্যাতন প্রকাশ করা এবং সামনে নিয়ে আসাই ভালো।’
কথা বলার সময় তার সামনে তখন ইরান পুলিশের হেফাজতে মারা যাওয়া মাশা আমিনির একটি ছবি ছিল। আমিনির মৃত্যুর পর ২০২২ সালে ইরান জুড়ে বড় বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল।
এ ধরনের একটি বই প্রকাশ করা ঝুঁকিপূর্ণ— এ কথা মোহাম্মাদি জানেন। তবু তিনি বলেছেন, এর পরিণতি হতে পারে। কিন্তু তার মতো মানুষদের জন্য এটাই বাস্তবতা।
সিএনএনের সঙ্গে কথা বলার কারণেও প্রতিশোধের ঝুঁকি আছে বলে স্বীকার করেছেন তিনি। তবে এ নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন নন। বরং কথা বলাকে নিজের ‘দায়িত্ব’ বলে মনে করেন।
সাক্ষাৎকারে সাম্প্রতিক ইরানের পরিস্থিতির বদলে তার স্মৃতিকথা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নিয়েই কথা বলেছে সিএনএন। এতে মোহাম্মাদির ওপর বাড়তি ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
নিজের সংগ্রামের শুরুতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পেলে কী করতেন— এ প্রশ্নে মোহাম্মাদি বলেছেন, সব পরিণতি জানা থাকলেও তিনি একই সিদ্ধান্ত নিতেন।
তিনি বলেছেন, ‘আমি যদি আমার সংগ্রাম শুরুর সেই মুহূর্তে ফিরে যেতে পারতাম, গ্রেপ্তারের প্রতিটি মুহূর্তে ফিরতে পারতাম, তারপরও কী ঘটবে তা জেনেও আমি অবশ্যই একই সিদ্ধান্ত নিতাম।’
কিন্তু সন্তানদের কথা ভাবলে তার মনে প্রশ্ন জাগে।
তার যমজ সন্তান আলী ও কিয়ানা এখন ১৯ বছরের। তারা ফ্রান্সে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছে। সন্তানদের কথা উল্লেখ করে মোহাম্মাদি বলেছেন, ‘আমি যখন আলী ও কিয়ানার দিকে তাকাই, তখন আমার মনে প্রশ্ন জাগে। তাদের কি খুব সাধারণ একটি জীবন থেকে বঞ্চিত করার অধিকার আমার ছিল? তাদের মায়ের সঙ্গে থাকার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার অধিকার কি আমার ছিল?’
‘এটাই সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন। এর উত্তর আমি নিশ্চিতভাবে দিতে পারি না,’ বলেছেন তিনি।
মোহাম্মাদির ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, মানবাধিকারকর্মী হিসেবে তাকে মোট ৪৪ বছরের বেশি কারাদণ্ড এবং ১৫৪টি বেত্রাঘাতের সাজা দেওয়া হয়েছে।
গত ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত সর্বশেষ কারাবাসেও তার ওপর মারধর ও মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি করে এমন নির্যাতন চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে নরওয়ের নোবেল কমিটি। কমিটি এ বিষয়ে ‘বিশ্বাসযোগ্য’ প্রতিবেদন পাওয়ার কথা জানিয়েছে।
ওই প্রতিবেদনগুলোয় বলা হয়েছে, ডিসেম্বরে গ্রেপ্তারের সময় তাকে কাঠের লাঠি ও ব্যাটন দিয়ে বারবার পেটানো হয়। চুল ধরে মাটিতে টেনে নেওয়া হয়। এতে তার মাথায় গভীর ক্ষত তৈরি হয়।
তার যৌনাঙ্গের কাছেও বারবার লাথি মারা হয়। এতে প্রচণ্ড ব্যথায় স্বাভাবিকভাবে বসতে বা কাজ করতে পারছিলেন না তিনি। নরওয়ের নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান জর্গেন ওয়াটনে ফ্রাইডনেস ফেব্রুয়ারিতে সিএনএনকে এসব তথ্য জানিয়েছিলেন।
মোহাম্মাদি বলেছেন, ‘আমি দুই মাস একই অবস্থায় একাকী বন্দি ছিলাম। ফোনে কথা বলতে পারিনি। পরিবার বা আইনজীবীদের সঙ্গেও দেখা করতে দেওয়া হয়নি।’
মার্চে তার হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তার ওজন কমে যায় ২০ কেজি। এপ্রিলে তার ফাউন্ডেশন সতর্ক করে বলেছিল, তার জীবন ‘তাৎক্ষণিক ঝুঁকির’ মধ্যে রয়েছে।
কর্তৃপক্ষের অবহেলার পর তাকে ১৮ দিন হাসপাতালে থাকতে হয়। তার ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, দীর্ঘদিনের উদ্বেগ ও মানসিক চাপের কারণে তার হৃদ্রোগ দেখা দিয়েছিল। পরে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে সাময়িকভাবে বাড়ি ফেরার অনুমতি পান তিনি। এখনো চিকিৎসা চলছে বলে জানিয়েছেন মোহাম্মাদি।
তার মতে, বন্দিদের একাকী করে রাখা ইরান সরকারের একটি ‘হাতিয়ার’। এর উদ্দেশ্য শুধু কাউকে হত্যা করা নয়, বরং তাকে মানসিক, আবেগগত ও শারীরিকভাবে ভেঙে দেওয়া।
মোহাম্মাদি বলেছেন, ‘তাদের লক্ষ্য হলো একজন মানুষকে মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়া, তার পরিচয় কেড়ে নেওয়া, তার মানবিকতা কেড়ে নেওয়া এবং নিজের সম্পর্কে তার ধারণাকে বিকৃত ও দুর্বল করে দেওয়া।’
সময়ে চিকিৎসা না দেওয়াকেও নির্যাতনের আরেকটি পদ্ধতি হিসেবে দেখেন তিনি। তার ভাষায়, এটি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। কখনো কখনো এর পরিণতি হয় মৃত্যু।
‘এসব মৃত্যু এক ধরনের নীরব মৃত্যুদণ্ড,’ বলেছেন মোহাম্মাদি।
ইরান সরকার ও দেশটির সরকারি গণমাধ্যম মোহাম্মাদির নির্যাতনের অভিযোগকে গুরুত্ব কমিয়ে দেখিয়েছে। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিবাদ জারি আছে।
ইরানে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দুটি বড় বিক্ষোভ আন্দোলন হয়েছে। এর একটি জানুয়ারিতে এবং অন্যটি ২০২২ সালে। ২২ বছর বয়সী মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর দ্বিতীয় আন্দোলনটি শুরু হয়। দুই আন্দোলনই কর্তৃপক্ষের কঠোর দমন-পীড়নের মুখে পড়ে।
তবু মোহাম্মাদির চোখে রাস্তায় নামা নারীদের সাহস গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেছেন, ‘আপনি তেহরানের রাস্তায় তাকালে, এমনকি দেশের অন্য শহরগুলোর দিকেও তাকালে দেখবেন, নারীরা কতটা সাহসের সঙ্গে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন।’
তার মতে, ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিক্ষোভকারীরা নিজেদের শক্তি বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে পেরেছেন।
তিনি বলেছেন, ‘যে মানুষ রাস্তায় নেমেছে, তাকে মারধর করা হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে, কারাগারে পাঠানো হয়েছে, মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তারপরও তার মধ্যে শক্তির অনুভূতি ছিল। নিজের অবস্থানের বৈধতার অনুভূতি ছিল। সেটিই সরকারকে পিছু হটতে বাধ্য করেছে।’
মোহাম্মাদির কাছে তার বই শুধু একজন অধিকারকর্মীর কারাজীবনের গল্প নয়। এটি গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করা মানুষদের প্রতিও এক ধরনের শ্রদ্ধা। একই সঙ্গে এটি একজন মায়ের কথাও— যিনি কারাগারে বসে বইটি লিখেছেন, আর যার সন্তানরা তখন ফ্রান্সে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছিল।
আলী ও কিয়ানা তার জীবনে কীভাবে আশা জাগিয়ে রেখেছে, সেটিও বলেছেন মোহাম্মাদি।
‘আলী ও কিয়ানা সবসময় আমাকে আবার জীবনে ফিরিয়ে আনার শক্তি দিয়েছে। আমাকে আশাবাদী রেখেছে,’ বলেছেন তিনি।
তার ভাষ্য, ‘আমি আশা করি, তাদের দেখতে পাব। তাদের জড়িয়ে ধরতে পারব। তারা কতটা বড় হয়েছে, তা দেখতে পারব। এখন আমি তাদের কাঁধ পর্যন্ত পৌঁছাই, নাকি তারা আমার কাঁধ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে— সেটিও দেখতে চাই। আবার তাদের পাশে দাঁড়াতে চাই।’








