রণক্ষেত্র হরমুজ : আবারও মুখোমুখি সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান

হরমুজ প্রণালিতে সংঘাত (প্রতীকী ছবি)
মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি এখন আক্ষরিক অর্থেই এক উত্তপ্ত রণক্ষেত্র। এই জলপথকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে সংঘাত এখন এক চরম ও ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে ইরানের ওপর ওয়াশিংটন তৃতীয় দফায় বড় ধরনের বিমান হামলা চালিয়েছে। জবাবে তেহরানও অঞ্চলের একাধিক দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে মুহুর্মুহু পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করায় বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে তীব্র সংকটের পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে।
নতুন করে মার্কিন হামলার নেপথ্য কারণ
বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর মতে, সাম্প্রতিক সময়ের এই সংঘাতের মূল কারণ শুধু আকস্মিক কোনো সামরিক উত্তেজনা নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে গভীর ভূ-রাজনৈতিক চাল। কিছুদিন আগেই ইরান ও আমেরিকার মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওই) স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যার ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ থাকবে ইরানের হাতে এবং ইরানই এই জলপথে জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করবে।
কিন্তু রয়টার্স ও সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওমান ও কাতারের মধ্যস্থতায় মাস্কাটে একটি বিশেষ কূটনৈতিক আলোচনা চলছিল, যেখানে ওমান একটি দ্বিপক্ষীয় প্রস্তাব তৈরি করেছিল। প্রস্তাব ছিল—ওমানের জলসীমা বা 'দক্ষিণ করিডর' দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজগুলো মুক্তভাবে চলাচল করবে এবং ইরানের জলসীমা বা 'উত্তর করিডর' দিয়ে যেতে হলে ইরানের পূর্বানুমতি লাগবে। কিন্তু আমেরিকা গোপনে ওমানের পাশ দিয়ে হরমুজের এই অংশটি ব্যবহার করে আলাদা একটি বিকল্প 'করিডর' বা জলপথ চালুর চেষ্টা করে, যাতে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক বাণিজ্যে ইরানের ওপর কৌশলগত নির্ভরশীলতা এড়ানো যায়।
মার্কিন উসকানিতে কাতার, সৌদি আরব এবং আরব আমিরাতের জাহাজ এই নতুন অবৈধ করিডর ব্যবহার করার চেষ্টা করলে ইরান ও আন্তর্জাতিক ট্র্যাকিং ব্যবস্থা ফাঁকি দেওয়া এক সাইপ্রাসের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক কনটেইনার জাহাজ 'M/V GFS Galaxy'-তে আঘাত হানে। এর জবাবেই মূলত মার্কিন সামরিক বাহিনী (সেন্টকম) ইরানের মূল ভূখণ্ডে হামলা শুরু করে। সর্বশেষ গত শনিবার রাতেও আরেকটি জাহাজ ওই করিডর পার হওয়ার চেষ্টা করলে যুক্তরাষ্ট্র আবার ইরানের প্রায় ১৪০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়।
উভয়পক্ষের হামলা ও ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ
১. ইরানে মার্কিন হামলা ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ : মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন বাহিনী সেন্টকমের দাবি অনুযায়ী স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক যুদ্ধবিমান, ড্রোন এবং যুদ্ধজাহাজ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণস্থল, গোলাবারুদের গুদাম এবং যোগাযোগ নেটওয়ার্ককে আঘাত করা হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা (আইআরআইবি) এবং 'দ্য গার্ডিয়ান'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী মার্কিন হামলায় ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় শহর বন্দর আব্বাস, জাস্ক, সিরিক, চাবাহার এবং আসালুয়েহতে তীব্র বিস্ফোরণ ঘটেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মার্কিন বিমান হামলাগুলো ইরানের একমাত্র বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র 'বুশেহর'-এর সীমান্ত ঘেঁষে আঘাত হেনেছে। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাও (আইএইএ) সতর্ক করেছে যে, পারমাণবিক কেন্দ্রের এত কাছাকাছি হামলা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
২. ইরানের বিধ্বংসী পাল্টা আঘাত : যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরানের সেনাবাহিনী এবং আইআরজিসি অঞ্চলের ৪টি দেশে (জর্ডান, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইন) অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে সমন্বিত ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের ঢেউ আছড়ে ফেলেছে।
জর্ডান : প্রিন্স হাসান বিমানঘাঁটিতে মার্কিন কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার এবং এমকিউ-৯ (MQ-9) রিপার ড্রোন রাখার হ্যাঙ্গারগুলো ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ধ্বংস করার দাবি করেছে ইরান। মার্কিন সামরিক বিশেষজ্ঞ কর্নেল ম্যাক গ্রেগরের মতে, ইরানে হামলা চালানো মার্কিন যুদ্ধবিমানের একটি বড় অংশ জর্ডান থেকেই উড়ছিল।
কাতার : কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আল-উদেইদ মার্কিন বিমানঘাঁটির যুদ্ধবিমান রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত কেন্দ্র এবং প্রধান কমান্ড সেন্টার ব্যালাস্টিক মিসাইল দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যদিও কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, তারা তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দিয়ে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।
ওমান : ওমানের দুকম বন্দরে মার্কিন বিমানবাহী রণতরীগুলোর লজিস্টিক সাপোর্ট সেন্টার এবং জ্বালানি সরবরাহ প্ল্যাটফর্ম আকস্মিক ভারী হামলায় সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়েছে।
কুয়েত ও বাহরাইন : কুয়েতে মার্কিন বাহিনীর একটি 'প্যাট্রিয়ট' আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, রাডার ও গোলাবারুদ গুদামে এবং বাহরাইনে মার্কিন যোগাযোগ ব্যবস্থায় আত্মঘাতী ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা এই ড্রোনগুলো প্রতিহত করার চেষ্টা করছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা এবং বৈশ্বিক প্রভাব
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি এক বিবৃতিতে ইরানকে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিতে বলেছেন, যেন ‘হরমুজ প্রণালি সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়।’ কারণ হিসেবে জানা যায়, আমেরিকার তৈরি নতুন করিডরটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে এবং বিশ্বের কোনো দেশ ওই ঝুঁকিপূর্ণ পথে জাহাজ পাঠাতে রাজি হয়নি। ওমান সরকারও এই পরিস্থিতিতে বিবৃতি দিয়ে বলেছে, ‘আলোচনা চলাকালীন হরমুজের দুই দিকই জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত।’
ট্রাম্পের এই আহ্বানের জবাবে ইরান উল্টো 'হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ' ঘোষণা করেছে। আইআরজিসি জানিয়েছে, এ অঞ্চলে মার্কিন অবৈধ হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো জাহাজকে এই পথ দিয়ে চলতে দেওয়া হবে না।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক রবার্ট পেপ এই পরিস্থিতিকে আমেরিকার ‘সবচেয়ে বড় বোকামি’ বলে অভিহিত করেছেন। কারণ ইরান পুরো পশ্চিম ইউরোপের সমান বড় একটি দেশ এবং এর যেকোনো প্রান্ত থেকে হরমুজে আঘাত করা সম্ভব। ফলে ইরানের অনুমতি ছাড়া এই রুট সচল করা ওয়াশিংটনের পক্ষে অসম্ভব।
এদিকে, মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, ইরান তাদের পারমাণবিক ক্ষেত্রগুলো নতুন করে চালু করছে। প্রখ্যাত ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক পেপ এস্কোবারের সূত্রমতে, ইরান যেকোনো মুহূর্তে পারমাণবিক বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ফেলতে পারে, যা পশ্চিমাদের জন্য সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ।
আমেরিকা-ইরান সমঝোতার ভবিষ্যৎ :
এই যুদ্ধ মূলত সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ইরানের টিকে থাকার লড়াই। দশকের পর দশক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে অভ্যস্ত ইরানি জনগণের মধ্যে জাতীয় ঐক্য ইস্পাতকঠিন। চলমান যুদ্ধের মধ্যেও দেশের কোটি কোটি মানুষ সর্বোচ্চ নেতার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে রাজপথে শামিল হয়েছে। অন্যদিকে স্পেনসহ অনেক পশ্চিমা রাষ্ট্রও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী নীতির তীব্র সমালোচনা করছে।
বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। পূর্ববর্তী সমঝোতা চুক্তির সময় স্বয়ং ট্রাম্প স্বীকার করেছিলেন যে, আর মাত্র চার সপ্তাহ যুদ্ধ চললে আমেরিকার তেলের রিজার্ভ শেষ হয়ে যেত। বর্তমান পরিস্থিতিতে হরমুজ বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে মার্কিন জনগণের ওপর।
মার্কিন অধ্যাপক মেইর শেইমারের ভাষায়, ‘যুদ্ধ এখন হরমুজকেন্দ্রিক। আর এটাই প্রমাণ করে আমেরিকা এই যুদ্ধে সম্পূর্ণ হেরে গেছে।’
কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা
যদিও পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে, তবুও বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, শেষ পর্যন্ত উভয়পক্ষকেই আলোচনার টেবিলে ফিরতে হতে পারে। কারণ দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি ইরানের জন্যও অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করবে।
অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, চরম উত্তেজনার মধ্যেও ওমান, কাতার কিংবা অন্যান্য মধ্যস্থতাকারী দেশের মাধ্যমে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যোগাযোগের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ফলে বর্তমান সংকটও শেষ পর্যন্ত নতুন কোনো সমঝোতার পথ তৈরি করতে পারে।




