ইসরায়েলের লতায়-পাতায় যুদ্ধ
- চিন্তা-চেতনা, ধর্ম, পণ্যের বিজ্ঞাপন, সামাজিক মর্যাদা নির্ধারণ— সবখানেই সামরিক মেজাজ

ইসরায়েলি বিজ্ঞাপনেও সামরিকায়ন। ছবি: সংগৃহীত
যুদ্ধই জীবন, যুদ্ধই সর্বজনীন— জার্মানির একনায়ক অ্যাডলফ হিটলারের এই উক্তিই বর্তমানে ফুটে উঠছে ইসরায়েলের সমাজের সর্বস্তরে। যুদ্ধকেই দেশটির নাগরিকরা নিজেদের জীবনের ধ্যান-জ্ঞান ভাবা শুরু করেছেন। চিন্তা, ধর্ম, পণ্যের বিজ্ঞাপন, সামাজিক মর্যাদা নির্ধারণ— কোথায় নেই অতিসামরিকায়ন। নাগরিক জীবনের সব কর্মকাণ্ডে পড়েছে এর ছোঁয়া। দেশটির লতায়-পাতায় ছড়িয়ে পড়েছে যুদ্ধের আবহ। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে যুদ্ধকেই একমাত্র পাথেয় হিসেবে দেখছেন ইসরায়েলিরা।
ইসরায়েলি সমাজে বর্তমানে লক্ষ করা যাচ্ছে অতিরিক্ত সামরিকায়ন। এ ধরনের সামরিকায়ন শুধু একটি রাজনৈতিক দর্শন নয়; বরং এক ধরনের অস্তিত্বগত অবস্থা। এটি মৌলিকভাবে মানুষের সত্তা, কল্পনা, চিন্তা, আকাঙ্ক্ষা, সম্পর্ককে গঠন করে। পাশাপাশি ইসরায়েলি হিসেবে নাগরিকদের সমষ্টিগত সত্তার অনুভূতিকে করে প্রভাবিত। দেশটিতে প্রায় সবকিছুই সামরিক পরিভাষা, মূল্যবোধ এবং চিত্রকল্পের মাধ্যমে দেখা ও বোঝা হয়। আর যখন-তখন জরুরি অবস্থা জারি ও যুদ্ধ যেন হয়ে উঠেছে স্বাভাবিক নিয়ম।
আপস না ফের যুদ্ধ?
২২ এপ্রিল ২০২৬
এই মতাদর্শ ইসরায়েলি সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। মতাদর্শের মধ্যে রয়েছে পাহাড়ের তরুণ ও ধর্মীয় বসতি স্থাপনকারীদের আধ্যাত্মিক এবং ধর্মতাত্ত্বিক সামরিকায়ন। বুর্জোয়াদের প্রচলিত ধর্মনিরপেক্ষ, উদার সামরিকায়নসহ অনেক ধরনের সামরিকায়ন। জীবনের প্রায় প্রতিটি পর্যায়ে ইসরায়েলিরা নিজেদের এবং তাদের চারপাশের মানুষকে দেখে সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে। যেমন— ভবিষ্যৎ সৈনিক (সেবার পূর্ববর্তী তরুণ এবং পরে সম্ভাব্য রিজার্ভ সদস্য), সক্রিয় দায়িত্বে থাকা সৈনিক, অথবা সাবেক সৈনিক হিসেবে।
অনেক নাগরিক সেনাবাহিনীতে যোগ দেন না বা জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে রিজার্ভ দায়িত্ব থেকে পান অব্যাহতি। তাদেরও সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক থাকা না থাকার ভিত্তিতে করা হয় মূল্যায়ন। যোগ না দেওয়াদের ইসরায়েলি সমাজে দেখা হয় অপাঙ্তেও হিসেবে। অনেক সময় তারা সম্মুখীন হন কারাদণ্ড, শত্রুতা ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের। এমনকি অনেক রাজনীতিবিদ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে না চাওয়াদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার হুমকি দেন।
ইসরায়েলে উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা নিয়মিত হয়ে ওঠেন সফল রাজনীতিবিদ । সাংবাদিকরা সামরিক মিডিয়া ইউনিটে পান প্রশিক্ষণ। ক্যাফে, বার ও ট্রেন সাঁজোয়া সৈনিক এবং সাধারণ মানুষের ভিড়ে পূর্ণ থাকে। সামরিকায়নের বিস্তারে শিক্ষাব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে একটি বিষয় প্রায়ই নজরের বাইরে থেকে যায়। তা হলো সামরিকায়ন কীভাবে ইসরায়েলের দৈনন্দিন জীবনে আরও সাধারণ, একঘেয়ে রূপে প্রবেশ করে।
ইসরায়েলের পুঁজিবাদী সমাজে পণ্যায়ন ঘটেছে সামরিকায়নের । কখনো কখনো এটি সরাসরি বিক্রি করা হয়। যেমন— তরুণদের সাইবার বা গোয়েন্দা সামরিক ভূমিকার জন্য বাছাই পরীক্ষার প্রস্তুতি দেওয়ার কোর্স, এলিট ইউনিটের জন্য কমব্যাট ফিটনেস প্রশিক্ষণ। সমুদ্রসৈকতে বেড়াতে যাওয়া কিশোরদের টার্গেট করে সম্প্রতি সাঁটানো হয় একটি নিয়োগ পোস্টার। সেখানে সমুদ্রের প্রতি আকর্ষণ থাকা কিশোরদের নৌবাহিনীর শারীরিক ও মানসিক প্রশিক্ষণ সেমিনারে অংশ নিতে করা হয় প্রলুব্ধ।
এ ছাড়া প্রায়ই সামরিকায়ন বিভিন্ন পণ্য বিক্রির একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে। অসংখ্য বিজ্ঞাপনে সৈন্যদের সংশ্লিষ্ট পণ্য ব্যবহার করতে দেখা যায়। পাশাপাশি ইসরায়েলি সমাজে কাজে লাগানো হয় সামরিকায়নের আবেগগত মূল্যকেও। এর মধ্যে রয়েছে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সৈন্যদের বীরত্ব, দেশপ্রেম, পরিবারের সঙ্গে মিলন, এমনকি তাদের যৌন আকর্ষণও।
উদাহরণ হিসেবে একটি ইসরায়েলি লুব্রিকেন্ট কোম্পানির সাম্প্রতিক বিজ্ঞাপনের কথা বলা যায়। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে তারা প্রকাশ করে একাধিক ছবি। সেখানে নারী সৈন্যদের দেখানো হয়েছে প্রত্যেকের হাতে একটি বোতল। ক্যাপশনে লেখা— ‘হে বেব, ইউ আর এ সুপারহিরো।’ বিজ্ঞাপনের নারী সেনাদের মধ্যে একজন ফাইটার পাইলট এবং একজন ইউনিফর্ম পরা সৈন্য।
ডেটিং অ্যাপগুলোতে অসংখ্য প্রোফাইল (মূলত পুরুষদের) দেখা যায়। সেখানে থাকে সামরিক ইউনিফর্ম পরা ছবি। কখনো ধ্বংসপ্রাপ্ত গাজার পটভূমিতে। এমনই একটি প্রোফাইলে একজন রিজার্ভ স্নাইপারকে দেখা যায় গাজা বা লেবাননের একটি বিধ্বস্ত বাড়ির জানালা থেকে রাইফেল তাক করা অবস্থায়।
সম্প্রতি ইসরায়েলের বার্ষিক ধর্মীয় উৎসব পাসওভার পালিত হয়। এ সময় ইসরায়েলি সুপার মার্কেটগুলোয় পণ্যসামগ্রীর মোড়কে দেখা যায় সৈনিক, বি-২ বোমারু বিমান, এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের ছবি। গত বছর ও চলতি বছর ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের বিষয়টিই মূলত এখানে তুলে ধরা হয়েছে।
তেল আবিবের একটি ক্যাফেতে নিহত এক সৈন্যের নামে একটি খাবারের নামকরণ করা হয়েছে। ইসরায়েলে সম্প্রতি ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে এই প্রবণতা। সাধারণত মৃতদের ‘সম্মান’ জানাতে তার নামে খাবার ও পানীয়ের নামকরণ করা হয়।
ইসরায়েলের যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত সেপ্টেম্বরে সামরিক শক্তি বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে যুক্তি দেন, ইসরায়েলকে হতে হবে একটি ‘সুপার-স্পার্টা’। অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করতে এবং বাড়তে থাকা কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা মোকাবিলায় বাড়াতে হবে দেশীয় অস্ত্র উৎপাদন।
ভাষান্তর : জুয়েল জনি





