ভোটের আগে প্রবাসী ইসরায়েলিদের দেশে ফেরা কেন ঠেকাতে চান নেতানিয়াহু

ইসরায়েলের তেল আবিবে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির নির্বাচনী বিলবোর্ড। ফাইল ছবি / রয়টার্স
ইসরায়েলের নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই উত্তপ্ত হচ্ছে রাজনৈতিক লড়াই। এবার সেই লড়াই শুধু দেশটির মাটিতে নয়, ছড়িয়ে পড়ছে আকাশেও।
বিদেশে থাকা হাজার হাজার ইসরায়েলি দেশে ফিরতে বিমানের টিকিট কাটছেন। উদ্দেশ্য একটাই—২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে ভোট দেওয়া।
কিন্তু তাদের দেশে ফেরার এই উদ্যোগ নিয়েই আপত্তি তুলেছে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টি। দলটি ‘ফ্লাই অ্যান্ড ভোট’ নামে একটি উদ্যোগ বন্ধ করতে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটিতে আবেদন করেছে।
কেন এই উদ্যোগ এত গুরুত্বপূর্ণ
ইসরায়েলে সাধারণ নাগরিকদের বিদেশ থেকে ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। কেবল কূটনীতিক ও সরকারি প্রতিনিধিরা দেশের বাইরে থেকে ভোট দিতে পারেন।
অন্যদের ভোট দিতে হলে দেশে ফিরতে হবে। এই সুযোগটিই কাজে লাগাতে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘আমেরিকা-ইসরায়েল ডেমোক্রেসি কোয়ালিশন’ শুরু করেছে ‘ফ্লাই অ্যান্ড ভোট’ নামে বিশেষ এক উদ্যোগ।
তাদের দাবি, তারা কাউকে সরাসরি বিমানের টিকিটের টাকা দেয় না। বরং কম দামের টিকিট, দলগত ছাড় এবং যাতায়াতের ব্যবস্থা খুঁজে দিতে সহায়তা করে।
আগস্টের শেষ দিকে সংগঠনটি জানিয়েছিল, ৩৩ হাজারের বেশি ইসরায়েলি দেশে ফিরতে আগ্রহ দেখিয়েছেন।
এখন তাদের সংখ্যা আরও বাড়ছে। অর্থাৎ, বিদেশে থাকা একটি বড় ভোটার গোষ্ঠী নির্বাচনের দিন দেশে ফিরতে পারে।
আর এখানেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক হিসাব।
লিকুদ পার্টির ভয় কোথায়
ইসরায়েলের রাজনীতিতে অল্প ব্যবধানেই সরকার গঠন হয়ে যেতে পারে। এবারের নির্বাচনেও কোনো পক্ষ এখন পর্যন্ত ৬১ আসনের স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেনি। সাম্প্রতিক জরিপগুলোতেও দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যাচ্ছে।
ক্ষমতাসীন লিকুদ পার্টির আশঙ্কা, বিদেশে থাকা ইসরায়েলিদের বড় একটি অংশ দেশে ফিরলে নির্বাচনের ফল বদলে যেতে পারে।
এই কারণেই ‘ফ্লাই অ্যান্ড ভোট’ উদ্যোগের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই শুরু করেছে দলটি।
দলটির অভিযোগ, এটি কোনো নিরপেক্ষ উদ্যোগ নয়। তাদের দাবি, এর সঙ্গে বিদেশি অর্থ ও ইসরায়েলের সরকারবিরোধী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সম্পর্ক রয়েছে।
দলটি এমনকি বিমানের টিকিটে ছাড় ও অগ্রাধিকার পাওয়ার সুযোগকে নির্বাচনী আইনের আওতায় ‘অবৈধ সুবিধা’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে।
তবে ‘ফ্লাই অ্যান্ড ভোট’ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য, তারা কাউকে জিজ্ঞেসও করে না কে কাকে ভোট দেবে।
তাদের ভাষায়, বিষয়টি কোনো দলের পক্ষে নয়। বিষয়টি শুধু ভোট দেওয়ার অধিকার নিয়ে।
ভোটের লড়াই এবার এত গুরুত্বপূর্ণ কেন
২৭ অক্টোবরের নির্বাচনটি হবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর প্রথম জাতীয় নির্বাচন।
এর মধ্যে তিন বছর ধরে গাজা, লেবানন ও ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ হয়েছে। দেশের ভেতরেও বড় রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
নেতানিয়াহুর সরকার বিচারব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগ নিলে রাস্তায় নেমেছিলেন হাজার হাজার ইসরায়েলি। এরপর আসে ৭ অক্টোবরের হামলা এবং দীর্ঘ যুদ্ধ।
এখন ভোটারদের সামনে প্রশ্ন—নেতানিয়াহু আবার ক্ষমতায় ফিরবেন, নাকি নতুন কোনো রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হবে?
সাম্প্রতিক জরিপে কোনো পক্ষই ৬১ আসনের নিশ্চিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে না। ফলে কয়েক হাজার ভোটও শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই বিদেশে থাকা ভোটাররাও হয়ে উঠেছেন গুরুত্বপূর্ণ।
বিদেশে থাকা ইসরায়েলিদের ভোট এখন পর্যন্ত মোট ভোটের তুলনায় বড় অংশ নয়। কিন্তু ব্যবধান যদি খুব কম হয়, তাহলে কয়েক হাজার ভোটও বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
এই কারণেই বিদেশ থেকে ভোটারদের দেশে ফেরার উদ্যোগ নিয়ে এত তর্ক।
লিকুদ পার্টি বলছে, এতে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অন্যদিকে উদ্যোগটির সমর্থকেরা বলছেন, ভোটারকে ভোট দিতে দেশে ফিরতে সাহায্য করা কোনো অপরাধ নয়।
বরং বিদেশে থাকার কারণে যেন কেউ নিজের ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, সেটিই তাদের লক্ষ্য।
আকাশপথ নিয়েও শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক
এর মধ্যে বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে আরেকটি আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
পরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের ওপর লিকুদ পার্টির প্রভাব রয়েছে। তাই নির্বাচনের সময় বিদেশ থেকে ইসরায়েলে আসা-যাওয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে।
ইসরায়েলের নাগরিক অধিকার সংগঠন ও বিরোধী রাজনীতিকেরা নির্বাচন কমিশনের কাছে আকাশপথ খোলা রাখার নিশ্চয়তা চেয়েছেন।
তবে পরিবহনমন্ত্রী মিরি রেগেভ এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যুদ্ধের সময়ও তিনি আকাশপথ খোলা রেখেছেন। নির্বাচনের দিন তা বন্ধ করার কোনো প্রশ্নই নেই।
শেষ পর্যন্ত লড়াইটা কোথায়
এই লড়াই এখন শুধু বিমানের টিকিট নিয়ে নয়।
এটি ভোটার কারা, কে ভোট দিতে পারবে এবং নির্বাচনের মাঠে কাদের কণ্ঠ শোনা যাবে—সেই প্রশ্নেও পৌঁছে গেছে।
বিদেশে থাকা ইসরায়েলিরা যদি সত্যিই বড় সংখ্যায় দেশে ফেরেন, তাহলে তারা শুধু বিমানবন্দরে নামবেন না। তারা ব্যালট বাক্সের সামনেও দাঁড়াবেন।
আর সেই ভোটগুলো শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যায়, তা এখনই বলা সম্ভব নয়।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—ইসরায়েলের এবারের নির্বাচনে প্রতিটি ভোটের গুরুত্ব এতটাই বেড়েছে যে, ভোটারদের দেশে ফেরার বিমানও এখন রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হয়ে গেছে।
সূত্র : সিএনএন







