নির্বাচনের আগে বিতর্কিত আইন, রাজনৈতিক আনুগত্য কিনছেন নেতানিয়াহু

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে নেতানিয়াহু- রয়টার্স
অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচনের আগে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেট ভেঙে যাওয়ার আগে একের পর এক বিতর্কিত আইন পাস করেছে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোট সরকার। এ সময় পার্লামেন্টে বিরোধী আইনপ্রণেতাদের তীব্র বিক্ষোভের মুখে পড়েন নেতানিয়াহু।
মঙ্গলবারের অধিবেশনে বিরোধী সদস্যরা বারবার ‘লজ্জা, বের হয়ে যান, চলে যান’ বলে স্লোগান দেন। হট্টগোলের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভোটের আগেই পার্লামেন্ট কক্ষ ত্যাগ করেন নেতানিয়াহু।
তবে তার অনুপস্থিতিতেই সরকারি জোটের সমর্থনে আইনগুলো পাস হয়ে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে জোটসঙ্গীদের সন্তুষ্ট রাখাই ছিল নেতানিয়াহুর মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে অতি-রক্ষণশীল ইহুদি ও কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর সমর্থন ধরে রাখতে এই আইনগুলো পাস করিয়েছেন তিনি।
প্রায় চার বছর ধরে গণবিক্ষোভ, ৭ অক্টোবরের হামলা এবং দীর্ঘস্থায়ী বহুমুখী যুদ্ধের পর নেতানিয়াহুর সরকার পূর্ণ মেয়াদ শেষ করেছে। ১৯৮৮ সালের পর এটিই প্রথম কোনো ইসরায়েলি সরকার, যারা পুরো মেয়াদ ক্ষমতায় থাকতে পেরেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কঠিন নির্বাচনী লড়াইয়ের আগে রাজনৈতিক জোট অটুট রাখতেই শেষ মুহূর্তে এই আইন পাস করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক নাদাভ আইয়াল বলেছেন, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক টিকে থাকা অনেকটাই অতি-রক্ষণশীল হারেদি দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল।
তার মতে, হারেদিদের দীর্ঘদিনের দাবিগুলো পূরণ করতে সক্ষম একমাত্র নেতা হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে চেয়েছেন নেতানিয়াহু।
সবচেয়ে বিতর্কিত আইনটি হারেদি ইহুদি পুরুষদের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি নিয়ে।
ইসরায়েলে সাধারণত ১৮ বছর বয়সে অধিকাংশ নাগরিকের জন্য সামরিক সেবা বাধ্যতামূলক। তবে দীর্ঘদিন ধরে হারেদি পুরুষরা ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের অজুহাতে এই বাধ্যবাধকতা থেকে ছাড় পেয়ে আসছেন।
ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্ট একাধিকবার এই ব্যবস্থা বাতিল করেছে। যুদ্ধের সময় এই ইস্যু আরও বিতর্কিত হয়ে উঠেছে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তাদের অন্তত ১২ হাজার অতিরিক্ত সেনার প্রয়োজন। অন্যদিকে প্রায় ৭২ হাজার সামরিক সেবার উপযুক্ত হারেদি পুরুষ এখনো সেনাবাহিনীর বাইরে রয়েছেন।
জোটসঙ্গীদের সন্তুষ্ট রেখে একই সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ অব্যাহতির আইন এড়াতে সরকার একটি মৌলিক আইন পাস করেছে। এতে তোরাহ অধ্যয়নকে রাষ্ট্রের মৌলিক মূল্যবোধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
সমালোচকদের মতে, ভবিষ্যতে সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতির সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি করতেই নেওয়া হয়েছে এই পদক্ষেপ।
আরেকটি আইনে ২০২৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সামরিক সেবা এড়িয়ে যাওয়া কয়েক দশক হাজার হারেদি ব্যক্তিকে সাময়িক আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।
এই আইন নিয়ে বিরলভাবে প্রকাশ্যে আপত্তি জানান ইসরায়েলি সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আইয়াল জামির।
তিনি বলেছেন, এটি সেনাবাহিনীর বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং কর্মরত সেনাসদস্যদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে।
এতে জোটের শরিকরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায়। কয়েকজন আইনপ্রণেতা সেনাপ্রধানকে অপসারণেরও দাবি জানান।
আইনটি পাস হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিরোধী দলগুলো ইসরায়েলের উচ্চ আদালতে আবেদন করে। পরে আদালত আইনটির বাস্তবায়ন সাময়িকভাবে স্থগিত করে এবং বিচারিক পর্যালোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
সামরিক সেবা-সংক্রান্ত আইন ছিল বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতার একটি অংশ। এর বিনিময়ে হারেদি দলগুলো নেতানিয়াহুর আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগকে সমর্থন দেয়।
এর মধ্যে অ্যাটর্নি জেনারেলের ক্ষমতা সীমিত করার আইন রয়েছে, যা সরকারের বৃহত্তর বিচার বিভাগ সংস্কার পরিকল্পনার অংশ।
এ ছাড়া সম্প্রচারব্যবস্থা সংস্কারের একটি আইনও পাস হয়েছে। সমালোচকদের দাবি, এই আইনের মাধ্যমে গণমাধ্যমের ওপর সরকারের প্রভাব আরও বাড়বে।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় ও নারীর অধিকারবিষয়ক সংগঠনগুলোর আপত্তি উপেক্ষা করে লিঙ্গভিত্তিক পৃথক একাডেমিক কর্মসূচির পরিধি বাড়ানোর আইনও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।




