কেউ পায়নি সংখ্যাগরিষ্ঠতা, ইসরায়েলে এখন সরকার হবে কীভাবে

ইসরায়েলের জেরুজালেমে একটি ভোটকেন্দ্র, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
ইসরায়েলের নির্বাচন শেষ হয়েছে। চূড়ান্ত ফলও এসেছে। কিন্তু কে সরকার গঠন করবে, সেই প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাননি। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের বিরোধী শিবিরও সরকার গঠনের মতো আসন পায়নি।
১২০ আসনের নেসেটে সরকার গঠনের জন্য অন্তত ৬১টি আসন প্রয়োজন। নেতানিয়াহুর ডানপন্থী লিকুদ নেতৃত্বাধীন জোট কিংবা মধ্যপন্থী ইয়াশার পার্টির নেতা আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবির—কোনোটির হাতেই সেই সংখ্যা নেই।
ফলে ইসরায়েল এখন দীর্ঘ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সামনে। নতুন সরকার গঠনে কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাসও লেগে যেতে পারে।
সমাধানের কয়েকটি পথ অবশ্য রয়েছে। কিন্তু প্রতিটি পথেই বড় রাজনৈতিক ও আদর্শিক বাধা আছে। শেষ পর্যন্ত কোনো সমাধান না হলে আবারও নির্বাচনে যেতে হবে ইসরায়েলকে।
প্রথম পথ: আরব দলগুলোর সমর্থনে বিরোধীদের সরকার
হিসাবের দিক থেকে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর সবচেয়ে সহজ পথ হলো আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে বিরোধীদের সমঝোতা।
কিন্তু এটিই আবার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বাধা।
বিরোধী শিবিরের ডানপন্থী দুই নেতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আভিগদর লিবারম্যান আরব নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আমের ওপর নির্ভরশীল কোনো সরকার চান না।
আরব দলগুলো সরাসরি সরকারে যোগ দিক কিংবা বাইরে থেকে সংখ্যালঘু সরকারকে সমর্থন দিক—দুই ক্ষেত্রেই আপত্তি রয়েছে তাদের। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর তাদের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে।
তবে এমন জোটের নজির রয়েছে। ২০২১ সালে আট দলের জোটে যোগ দিয়েছিল রা’আম। ইসরায়েলের ইতিহাসে কোনো আরব দলের পূর্ণাঙ্গভাবে সরকারে অংশ নেওয়ার সেটিই একমাত্র ঘটনা। ওই জোট নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরিয়েছিল। তবে সরকারটি এক বছরের কিছু বেশি সময় পরই ভেঙে পড়ে।
এবারও আরব দলগুলোর সমর্থন পেলে বিরোধীরা সরকার গঠনের পথে এগোতে পারে। কিন্তু বেনেট ও লিবারম্যানের অবস্থানের কারণে সেই পথ এখন কঠিন।
সরকার গঠন করতে না পারলেও বিরোধীরা আরব দলগুলোর সঙ্গে মিলে নেসেটে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে লাগাতে পারে। বর্তমান স্পিকারকে সরিয়ে নতুন স্পিকার নির্বাচনসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে তাদের। এতে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়া নেতানিয়াহুর ওপর চাপ বাড়ানো সম্ভব হবে।
দ্বিতীয় পথ: জাতীয় ঐক্যের সরকার
দ্বিতীয় সম্ভাবনা হলো দুই শিবির ভেঙে একটি জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন।
সেই সরকারে নেতানিয়াহুর লিকুদ থাকবে। তার বর্তমান জোটের কয়েকটি দলও থাকতে পারে। তবে সরকার গঠনের জন্য বিরোধী শিবির থেকে অন্তত একটি দলকে নেতানিয়াহুর সঙ্গে যেতে হবে।
এ ক্ষেত্রে নেতানিয়াহু উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরকে বাদ দিতে রাজি হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোতরিচ ও অতি-রক্ষণশীল ইহুদি দলগুলোকে ছাড়তে চান না তিনি।
সবচেয়ে বড় বাধা আইজেনকোট। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, নেতানিয়াহুর সঙ্গে সরকারে যাবেন না।
নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চাওয়া অনেক ভোটারের কাছেও এমন সমঝোতা গ্রহণযোগ্য না-ও হতে পারে। ফলে আইজেনকোট অবস্থান বদলালে তাকে রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে।
তৃতীয় পথ: বিরোধী শিবির ভাঙবেন নেতানিয়াহু
নেতানিয়াহুর সামনে আরেকটি পথ হলো বিরোধী শিবিরে ভাঙন ধরানো।
তিনি বিরোধী কোনো দলকে নিজের জোটে আনার চেষ্টা করতে পারেন। পুরো দলকে পাওয়া সম্ভব না হলে আলাদাভাবে কয়েকজন আইনপ্রণেতাকে নিজের দিকে টানার চেষ্টা হতে পারে।
কিন্তু এই পথও সহজ নয়।
আইজেনকোট, বেনেট, লিবারম্যান ও ইয়ার গোলান—বিরোধী শিবিরের চার প্রধান নেতাই জানিয়েছেন, তারা নেতানিয়াহুর সঙ্গে সরকারে যাবেন না।
তার ওপর নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে আট আসন দূরে রয়েছে। অর্থাৎ আলাদাভাবে আইনপ্রণেতাদের নিজের দিকে টানতে হলেও অন্তত আটজনকে রাজি করাতে হবে। বর্তমান রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যে সেটি কঠিন কাজ।
চতুর্থ পথ: আবার নির্বাচন
আগের তিনটি পথের কোনোটিই সফল না হলে শেষ পর্যন্ত আবার নির্বাচনে যেতে হবে ইসরায়েলকে।
তার আগে অবশ্য সরকার গঠনের পুরো প্রক্রিয়া শেষ হবে।
প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ প্রথমে নেসেটে জায়গা পাওয়া দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। তারা কাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান, তা জানবেন তিনি।
এরপর সরকার গঠনের জন্য একজন নেতাকে দায়িত্ব দেবেন প্রেসিডেন্ট।
আরব দলগুলো আইজেনকোটকে সমর্থন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে ইয়াশার নেতা প্রথমে সরকার গঠনের সুযোগ পেতে পারেন।
যিনি প্রথম দায়িত্ব পাবেন, তিনি সরকার গঠনের জন্য ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন সময় দেওয়া যেতে পারে।
তিনি ব্যর্থ হলে দ্বিতীয় একজন নেতাকে সুযোগ দেবেন প্রেসিডেন্ট। তিনি পাবেন ২৮ দিন।
সেই চেষ্টাও ব্যর্থ হলে নেসেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য তৃতীয় একজনকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার অনুরোধ করতে পারবেন। তিনি সময় পাবেন ১৪ দিন।
এরপরও সরকার না হলে নতুন নির্বাচনই হবে শেষ পথ।
অপেক্ষা করেও লাভ হতে পারে নেতানিয়াহুর
এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় একটি সুবিধা রয়েছে নেতানিয়াহুর। নতুন সরকার না হওয়া পর্যন্ত তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকবেন।
আইজেনকোট প্রথমে সরকার গঠনের সুযোগ পেয়ে ব্যর্থ হলে এরপর নেতানিয়াহুর হাতে দায়িত্ব যেতে পারে। তিনিও ব্যর্থ হলে আবার নির্বাচনের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যাবে।
আর নতুন নির্বাচন হলেও সেটি আগামী বসন্তের আগে হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তত দিন তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকতে পারেন।
ফলে নির্বাচনে স্পষ্ট জয় না পেলেও এখনই ক্ষমতা ছাড়তে হচ্ছে না তাকে।
ইসরায়েলের সামনে তাই কয়েকটি পথ খোলা। কিন্তু কোনোটিই সহজ নয়। আরব দলগুলোর সঙ্গে বিরোধীদের সমঝোতা, জাতীয় ঐক্যের সরকার অথবা বিরোধী শিবিরে ভাঙন—এর কোনো একটি না ঘটলে দেশটিকে আবার ভোটকেন্দ্রে ফিরতে হতে পারে।
সেটি হলে আট বছরের মধ্যে সপ্তমবারের মতো সাধারণ নির্বাচন হবে ইসরায়েলে।
সূত্র : আলজাজিরা







