খামেনির শেষ বিদায় আজ
বিপ্লবের শিশু থেকে রাষ্ট্রের বাতিঘর

মাশহাদ শহরে তার শেষ বিদায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে- রয়টার্স
কোনো কোনো মানুষ ইতিহাসের পাতায় শুধু একজন মানুষ, এক পিতা, একজন প্রতিরোধ যোদ্ধা, রাষ্ট্রপ্রধান এবং সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নন বরং যুগের প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকেন। তাদের জীবন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের কাহিনি নয়;বরং একটি জাতির সংগ্রাম, আদর্শ,বিশ্বাস ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গে মিশে যায়। ইরানের শহীদ সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সৈয়দ ইমাম আলী খামেনি তেমনই এক ব্যক্তিত্ব। যার নাম উচ্চারিত হলে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা ইরানের ইসলামী বিপ্লবের ধারাবাহিকতা, প্রতিরোধের রাজনীতি এবং জাতীয় আত্মমর্যাদার প্রশ্ন একসঙ্গে সামনে আসে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই গৌরবজ্জল ইতিহাস— ত্যাগ ,আদর্শ,নেতৃত্ব আর বিচক্ষণতায় দিনে দিনে কিভাবে বাতিঘর হয়ে ওঠেন পুরো একটি জাতির, একটি রাষ্টের, একটি মুসলিম বিশ্বের। একটি বিপ্লব কিভাবে পাল্টে দেয় পুরো একটি মানুষকে; জন্ম দেয় এক নতুন সত্তার!
আজ পবিত্র মাশহাদ শহরে তার শেষ বিদায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ইমাম রেজার পবিত্র নগরীতে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে শেষবারের মতো তাকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানানো জানাচ্ছে ইরানি জাতি। এর আগে তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্রান্ড মোসাল্লা,পবিত্র কোম, ইরাকের পবিত্র নাজাফ ও কারবালা-প্রতিটি শহরেই মানুষের অশ্রুসিক্ত ঢল নেমেছিল। যেন এক শহর থেকে আরেক শহরে,একদেশের সীমানা পেরিয়ে অন্যদেশের পবিত্র শহরে শেষ যাত্রার আলোকরেখায় সঞ্চারিত হয়েছে, ইতিহাস নিজেই তার বিদায়যাত্রার সাক্ষী হয়ে এগিয়ে এসেছে।
কেউ হাতে সবুজ-সাদা ও লাল রংয়ের মিশ্রণে জাতীয় পতাকা,কেউ কেউ শোকের কালো পতাকা, কেউ কারবালার ও নেতার রক্তে রঞ্জিত লাল পতাকা, কেউ কোরআন শরিফ,কারো হাতে তজবি, কেউ আবার শুধু নীরবে তাকিয়ে আছেন সেই কফিনের দিকে-যেখানে এমন এক নেতা,যাঁর কণ্ঠস্বর বহু দশক ধরে ইরানের রাজনৈতিক অভিধানকে প্রভাবিত করেছে। যার জীবন দর্শন ও পথ নির্দেশনাকে নিয়ে ইরানি জাতি আগামীর সমস্ত স্বপ্নকে সফল করার দৃঢ়প্রত্যয় গ্রহণ করেছে আজ।
বিপ্লবের সন্তান থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে
আলী খামেনির জন্ম ১৯৩৯ সালে মাশহাদে। ধর্মীয় শিক্ষা ও ইসলামী চিন্তার পরিবেশেই তাঁর বেড়ে ওঠা। তরুণ বয়সেই তিনি শাহবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হন এবং একাধিকবার গ্রেপ্তার, কঠোর নির্যাতন ও কারাবরণের শিকার হন। এমনকি তাঁকে নির্বাসনেও পাঠানো হয়েছিল।
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর তার রাজনৈতিক জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। তিনি সংসদ সদস্য, প্রতিরক্ষা পরিষদের সদস্য এবং পরে ইরানের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯ সালে ইমাম আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনীর ইন্তেকালের পর তিনি ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এমন এক রাষ্ট্রকাঠামো পরিচালনা করেন, যা একদিকে ধর্মীয় নেতৃত্ব,অন্যদিকে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জটিল সমন্বয়ে পরিচালিত।
তার রাজনৈতিক মিশন
আলী খামেনির রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল তিনটি মৌলিক বিষয়-স্বাধীনতা,সার্বভৌমত্ব এবং প্রতিরোধ।
তিনি বিশ্বাস করতেন, কোনো সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তির রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক আধিপত্যের কাছে মাথা নত না করেই একটি রাষ্ট্র তার নিজস্ব সক্ষমতার ভিত্তিতে এগিয়ে যেতে পারে।
এই চিন্তা থেকেই তিনি বারবার ‘প্রতিরোধের অর্থনীতি, বৈজ্ঞানিক স্বনির্ভরতা,দেশীয় প্রযুক্তি উন্নয়ন,আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং জাতীয় আত্মবিশ্বাস-এর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
তিনি পারমাণবিক প্রযুক্তি থেকে শুরু করে মহাকাশ গবেষণা, চিকিৎসাবিজ্ঞান, ন্যানোপ্রযুক্তি কিংবা প্রতিরক্ষা শিল্প—সব ক্ষেত্রেই দেশীয় সক্ষমতা গড়ে তোলাকে রাষ্ট্রনীতির অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেন।
যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের ১৪ হাজারেরও বেশি নিষেধাজ্ঞাকে উপেক্ষার বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি তার দিক নির্দেশনায় ও দর্শনে ইরানি জাতিকে আজকের একটি বিশেষ অবস্থানে নিয়ে এসেছেন যেখানে গত ৪০ দিনের যুদ্ধে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বলাচলে পরাজিত হয়ে যুদ্ধবিরতি এবং সমঝোতা চুক্তি করতে বাধ্য হয়। যদিও এখনও তার সমাপ্তি ঘটেনি।
তার ভিশন: শুধু ইরানের জন্য নয়
শহীদ ইমাম আলী খামেনির রাজনৈতিক দর্শন কেবল ইরানের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনীতিতে ফিলিস্তিন প্রশ্নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে জেরুজালেম, গাজা, লেবানন, ইরাক, সিরিয়া ও অঞ্চলের বিভিন্ন প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রতি সমর্থনের কথা।
তার দৃষ্টিতে এটি ছিল কেবল একটি ভূখণ্ডের প্রশ্ন নয়; বরং নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নৈতিক দায়িত্ব।
সমর্থকদের কাছে এই অবস্থান ছিল ন্যায়বিচারের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান। সমালোচকদের কাছে এটি ছিল আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের কৌশল। কিন্তু উভয় পক্ষই একমত - মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ইতিহাসে তার ভূমিকা ছিল গভীর ও সুদূরপ্রসারী।
বিদায়ের পথে মানুষের অশ্রু, শেষ যাত্রার আলোকরেখা
একজন নেতার জনপ্রিয়তা অনেক সময় তার জীবদ্দশায় মাপা যায় না; বিদায়ের মুহূর্তে মানুষের উপস্থিতিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় ভাষ্য।
তেহরানের মোসাল্লা থেকে কোম, তারপর নাজাফ ও কারবালা-প্রতিটি শহরেই মানুষের দীর্ঘ সারি, স্রোতের মতো ভেসে চলা, একটি ঘর থেকে রাজপথে জনসমুদ্রে পরিণত হওয়া যেন একটি কথাই বলেছে, একটি অধ্যায় শেষ হচ্ছে! কিন্তু থেকে যাচ্ছে তার পুরো দর্শন, সরলপথ যা আগামীর নির্দেশনা।
আজ মাশহাদেও সেই একই দৃশ্য। ভোর থেকেই মানুষের ঢল। নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ-সব বয়সের মানুষ শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হয়েছেন। অনেকের চোখে অশ্রুর জোয়ার, অনেকের ঠোঁটে দোয়া, আবার কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে আছেন, কেউবা বুক ফাটা কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। এযেন ইতিহাসের এক ভারী মুহূর্তকে নিজের ভেতরে ধারণ করছেন!
মানুষের অনুভূতিতে এক নেতার প্রতিচ্ছবি
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বেশিরভাগ মানুষের কাছে আলী খামেনি কেবল একজন ধর্মীয় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রনেতা নন;বরং বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্রপরিচয়ের প্রতীক।
অনেকে তাকে দেখেছেন আত্মনির্ভরতার আহ্বানদাতা হিসেবে,কেউ ধর্মীয় পথপ্রদর্শক হিসেবে, আবার কেউ প্রতিরোধের দর্শনের ধারক হিসেবে।
একজন প্রবীণ শোকাহত মানুষের কণ্ঠে যেন ফুটে ওঠে সেই অনুভূতি, ‘নেতারা আসেন, নেতারা চলে যান। কিন্তু কিছু মানুষ একটি জাতির স্মৃতির অংশ হয়ে থাকেন। তারাও একদিন চলে যান, কিন্তু তাদের উচ্চারিত বিশ্বাস মানুষের ভেতরে কালোত্তীর্ণ হয়ে বেঁচে থাকে। ইরানের শহীদ নেতা আলী খামেনেয়ী আমাদের সেই নেতা ছিলেন। যিনি শহীদ হলেও আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন।’
এক তরুণের চোখে ছিল অন্যরকম অনুভূতি, ‘আমরা তাকে শুধু ইতিহাসের বইয়ে পড়ব না;আমাদের বাবা-মায়ের স্মৃতিতেও তাকে খুঁজে পাব। আমাদের শৈশব কৈশরের ইতিহাস ও গল্পের যিনি নায়ক।
ইতিহাসের পাতায় শেষ নয়
মানুষের জীবন সীমিত। কিন্তু আদর্শ,দর্শন ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার প্রায়ই সময়ের সীমানা অতিক্রম করে।
মাশহাদের এই শেষ বিদায় তাই কেবল একজন নেতার দাফনের আনুষ্ঠানিকতা নয়;এটি একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের প্রতীকী সমাপ্তি এবং একই সঙ্গে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা।
আজ যখন লাখ লাখ মানুষ শেষবারের মতো শ্রদ্ধাভরে তার জানাজায় অংশ নিচ্ছেন,তখন হয়তো ইতিহাস নীরবে লিখে রাখছে-কোনো কোনো মানুষের প্রস্থান একটি জাতির ক্যালেন্ডারে শুধু একটি তারিখ নয়;সেটি হয়ে ওঠে স্মৃতি,অনুভূতি এবং সময়ের প্রবাহে অমর হয়ে থাকা এক আলোকরেখা।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক আইআরআইবি




