মাশহাদে শোকের সাগর, ইমাম রেজার রওজার পাশেই শায়িত হচ্ছেন খামেনি

মাশহাদে শোকের সাগর- রয়টার্স
ইরাকের সীমানা পেরিয়ে স্বদেশের মাটিতে ফিরলেন ইরানের বিপ্লবের ‘শহীদ নেতা’ আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ি। নাজাফ ও কারবালার ঐতিহাসিক এবং আবেগঘন বিদায় পর্ব শেষ করে তার পবিত্র মরদেহ এখন ইমাম রেজার স্মৃতিবিজড়িত পুণ্যভূমি মাশহাদ শহরে। গতকাল সকাল থেকেই মাশহাদের প্রতিটি সড়ক পরিণত হয়েছে এক অভূতপূর্ব জনসমুদ্রে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা লাখো মানুষের হৃদয়বিদারক আর্তনাদ, শোক আর আকাশ-বাতাস কাঁপানো প্রতিশোধের স্লোগানে মুখর এখন পুরো খোরাসান প্রদেশ।
খামেনির দাফন সম্পন্ন হতে যাচ্ছে ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র মাজার শরিফের রওজা মোবারকের ঠিক সন্নিকটে।
মাজারের তথ্য ও গণমাধ্যম বিভাগের প্রধান হুজ্জাতুল ইসলাম মোসলেম হুশাঙ্গী আজ সাংবাদিকদের কাছে এই দাফন প্রক্রিয়ার বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে জানান, দেশ ও বিদেশের মাটিতে দীর্ঘ ও ঐতিহাসিক জানাজার আনুষ্ঠানিকতা শেষে শহীদ নেতার এবং তার পরিবারের সদস্যদের পবিত্র মরদেহ মাজারের মূল কক্ষের নিকটবর্তী একটি বিশেষ এবং মর্যাদাপূর্ণ বারান্দায় নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে কেবল তার পরিবার এবং কোরআনে বর্ণিত ‘বাইত’ তথা ঘনিষ্ঠজনদের উপস্থিতিতে দাফনের মূল ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হবে।
পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী সকালেই মাশহাদে বিদায় অনুষ্ঠান সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। তবে ইরাকের সাধারণ মানুষের বাঁধভাঙা উপস্থিতি এবং মরদেহের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের তীব্র আকুলতার কারণে সময় কিছুটা পিছিয়ে স্থানীয় সময় দুপুর ২টায় নির্ধারণ করা হয় (বাংলাদেশ সময় সাড়ে ৪টা)। কিন্তু সময় পরিবর্তনের এই ঘোষণা কোটি মানুষের আবেগ ও উপস্থিতিকে বিন্দুমাত্র দমাতে পারেনি। বরং ভোর হতেই মাশহাদের কেন্দ্রস্থল এবং ইমাম রেজা (আ.)-এর পবিত্র মাজার অভিমুখে যাওয়ার প্রতিটি রাস্তা কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। রাজপথে জোহরের নামাজ ও রক্তের প্রতিশোধের লাল পতাকা শোকযাত্রা শুরু হতে যখন দুই ঘণ্টারও কম সময় বাকি, তখন মাশহাদের ঐতিহাসিক ইমাম রেজা সড়কে অবস্থান নেওয়া লাখো শোকগ্রস্ত মানুষ রাস্তার ওপরই কাতারবন্দি হয়ে জোহরের নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে পুরো জনতা মেতে ওঠে এক অভূতপূর্ব বিক্ষোভে। ইসরায়েলের বর্বর গণহত্যা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে সমবেত জনতা। আকাশে উত্তোলিত হয় শত শত লাল পতাকা। বাতাসে পতপত করে উড়তে থাকা এই লাল পতাকায় লেখা ছিল ‘ইয়া লাসারাতিল হোসেন’ (হে ইমাম হোসেনের রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণকারীরা) এবং ‘ইয়া লাসারাতিল খামেনেই’। শিয়া ঐতিহ্যে এই লাল পতাকা শুধু শোকের প্রতীক নয়; বরং এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রতিশোধের অমোঘ অঙ্গীকার। মাশহাদ প্রশাসনের তথ্যমতে, দূর-দূরান্ত থেকে আসা এই বিশাল জনসমুদ্রের সেবা ও নিরাপত্তার জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। খোরাসানে রাজাভী প্রদেশের গভর্নর জানিয়েছেন, জিয়ারতকারী ও সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে মাশহাদ জুড়ে ৩ হাজার ‘মোকেব’ বা সেবা শিবির স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া যেকোনো জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে ৭৫০টি মেডিকেল টিম।
কড়া সামরিক পাহারায় বিমানবন্দরে অবতরণ
এর আগে শহীদ নেতার মরদেহ এবং তার পরিবারের সদস্যদের বহনকারী বিশেষ বিমানটি মাশহাদের হাশেমি নেজাদ বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানটিকে আকাশপথে সর্বোচ্চ নিরাপত্তায় পাহারা দিয়ে নিয়ে আসে ইরানের বিমানবাহিনীর একঝাঁক অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান। বিমানবন্দরে মরদেহ গ্রহণের সময় এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সেখানে শহীদ পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন কুদস ফোর্সের প্রধান কমান্ডার সরদার ইসমাইল কাআনি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংহতি প্রকাশ করে এই বিদায় অনুষ্ঠানে অংশ নিতে মাশহাদে উপস্থিত হয়েছেন নাইজেরিয়ার প্রখ্যাত শিয়া নেতা শেখ ইব্রাহিম জাকজাকি।
তবে এই রাষ্ট্রীয় শোকের আবহকে বিঘ্নিত করতে শত্রুপক্ষ অপচেষ্টা চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গতকাল ভোরে তেহরান-মাশহাদ রেলপথের একটি অংশে ইহুদিবাদী ও মার্কিন অক্ষের পক্ষ থেকে কাপুরুষোচিত হামলার ঘটনা ঘটে। এতে কিছু সময়ের জন্য ট্রেন চলাচলে বিঘ্ন ঘটলেও রেল ও নিরাপত্তা বাহিনীর দ্রুত তৎপরতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। ট্রেন লাইনের ক্ষতিগ্রস্ত অংশের যাত্রীদের বিশেষ বাসের মাধ্যমে দ্রুত অনুষ্ঠানস্থলে নিয়ে আসা হয়। শত বাধা ও প্রতিবন্ধকতা এড়িয়ে এরই মধ্যে শত শত যাত্রী মাশহাদের এই মূল শোকযাত্রায় যোগ দিতে সমর্থ হয়েছেন।
মাশহাদে পবিত্র মাজারে জানাজার প্রস্তুতি বিষয়ে ট্রাফিক কর্তৃপক্ষ এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ইমাম রেজা সড়ক ধরে বিশাল শোকযাত্রাটি অগ্রসর হয়ে মাজার প্রাঙ্গণে পৌঁছাবে। এরপর শহীদদের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে পবিত্র মাজারের প্রধান চত্বর ‘সাহনে পেয়াম্বারে আজমে (সা.)’। তবে মাজারের ভেতরের মূল চত্বরগুলো এরই মধ্যে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় শিরাজি, নওয়াব সাফাভি এবং তোবারসি সড়কগুলো থেকেও সাধারণ মানুষ জানাজার কাতারে শামিল হতে পারবেন। নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার স্বার্থে বাবুর রেজা (আ.) এবং বাবুল জাওয়াদ (আ.)-এর প্রবেশদ্বারগুলো এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ট্রাফিক পুলিশের প্রধান জানিয়েছেন, মাশহাদের
সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ও ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে বিশেষ পুলিশি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সব ধরনের জরুরি সেবা সংস্থাকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে। আজকের এই মাশহাদের
জনসমুদ্র প্রমাণ করে, এই বিয়োগান্তক ঘটনা ইরান তথা মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিরোধকামী মানুষের
চেতনাকে স্তব্ধ করতে পারেনি; বরং তা যেন এক নতুন প্রতিরোধ ও ঐক্যের জন্ম দিয়েছে।




